প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিশ্বসভায় বাংলাদেশের আরেকটি অর্জন

ড. রাশিদ আসকারী : ৩০ অক্টোবর ২০১৭, রোজ সোমবার ইউনেস্কো হেডকোয়ার্টার, আলোকনগরী হিসেবে খ্যাত প্যারিসে বাঙালি ও বাংলাদেশের আরেকটি বিজয় অর্জিত হয়েছে। ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভার কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে বিশ্বের প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা এবং তা বিশ্ব আন্তর্জাতিক রেজিস্টারের স্মৃতি তালিকায় অন্তর্ভুক্তকরণ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের বিজয় মুকুটে একটি নতুন পালক। ইউনেস্কোর মেমরি অন দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার বস্তুত বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ দালিলিক ঐতিহ্যসমূহের এক তালিকা। এধরনের আন্তর্জাতিক তালিকা পুস্তক প্রণয়নের উদ্দেশ্য হলো বিশ্বের বিভিন্ন অংশের প্রামাণিক ঐতিহ্যসমূহ সংরক্ষণ এবং তাতে সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে সঙ্গত কারণেই ইউনেস্কোর এই আন্তর্জাতিক নিবন্ধপুস্তকে অন্তর্ভুক্তকরণের যোগ্য মনে করে ২৪ অক্টোবর থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা কমিটি— আই.এ.সি চূড়ান্ত সুপারিশ করে। বিশ্ব প্রামাণিক ঐতিহ্যসমূহের তালিকায় বিশ্বের সকল মহাদেশ থেকে অদ্যাবধি ৪২৭টি দলিল স্থান পেয়েছে। ৭ মার্চের ভাষণের এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মাধ্যমে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান প্রেরণা ও নির্দেশনা জাতির পিতার এই জ্বালাময়ী ভাষণ সর্বোচ্চ উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত হলো। এ অর্জন নিশ্চয়ই অনেক গৌরবের। এ স্বীকৃতি নিশ্চয়ই সমগ্র দেশ ও জাতির জন্য অনেক সম্মানের।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রমনার রেসকোর্স ময়দানের যে স্থানে বিশ লক্ষাধিক মানুষের সমাবেশে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির স্বাধীনতা ও মুক্তির মহাসনদ হিসেবে ১৮ মিনিটের এই ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেছিলেন তাঁর ভাষণের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পর সেই একই স্থানে, গতকাল এক সুবিশাল নাগরিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এই নাগরিক সমাবেশ নানা কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গবন্ধুর জাতীয় গুরুত্বকে যারা কূটতর্কের চাতুরী দিয়ে আক্রমণ করে বিকৃত আনন্দ পেত তাদের মুখে ছাই দিয়ে ইউনেস্কোর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা স্বপ্রণোদিত হয়ে বিশ্বে বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ মুখপাত্র বঙ্গবন্ধুকে এক সীমাহীন উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করল। নাগরিক সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বঙ্গবন্ধুর রক্ত ও রাজনীতির সুযোগ্য উত্তরাধিকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইউনেস্কোর এই যুগান্তকারী পদক্ষেপের তারিফ করে ইতিহাস বিকৃতকারীদের বিরুদ্ধে পরবর্তী ইতিহাসের প্রতিশোধ গ্রহণের কথা বলেন এবং তাদের অপতত্পরতার বিরুদ্ধে জনগণকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে তিনি মেঘাচ্ছন্ন আকাশে নতুন সূর্যোদয়ের সঙ্গে তুলনা করেন এবং সে সূর্যোদয়ের আলোকে বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। নাগরিক সমাবেশে অংশগ্রহণকারী বিশিষ্ট নাগরিকেরা বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংক্ষিপ্ত মহাকাব্য বলে অভিহিত করেছেন। মহাকাব্য একটি জাতির কিংবা জাতীয় বীরের বীরত্বগাথার আলঙ্কারিক বয়ান। কিন্তু ৭ মার্চের ভাষণ একটি জীবন্ত মহাকাব্য। একটি জাতির আত্মদর্শন, আত্মোপলব্ধি এবং আত্মোন্নয়নের মহা ইশতেহার। স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতায় উত্তরণের বীজমন্ত্র। এই ভাষণের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি উচ্চারণ স্বাধীনতাকামী মুক্তিপাগল মানুষের ধমনীতে রক্তের নাচন তুলেছিল। দেশমাতৃকার জন্য আত্মোত্সর্গের প্রেরণা জুগিয়েছিল। পরাধীন-শৃঙ্খলিত মানবগোষ্ঠীর স্বাধীনতা ও মুক্তির মহাসনদ এই ভাষণের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, মানবজাতির জন্যও এক বিরাট অর্জন বটে।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ এর আগেও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ভাষণসমূহের সাথে তালিকাভুক্ত হয়েছিলো ইংরেজ ঐতিহাসিক জ্যাকব এফ.ফিল্ডের বিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থ ”we shall Fight on the beaches: The Speeches that inspired history”-এ। এই গ্রন্থে সিসেরো থেকে চার্চিল পর্যন্ত, লিংকন থেকে মাও সেতুং পর্যন্ত মানবেতিহাসের বিগত ২৫০০ বছরের যুদ্ধকালীন সর্বোচ্চ উদ্দীপনামূলক এবং প্রেরণাদায়ক বক্তৃতাসমূহের উদ্ধৃতি সংকলিত হয়েছে। ২০১৩ সালের ১ ডিসেম্বর প্রকাশিত ২২৪ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থের শিরোনাম: ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভাষণ থেকে উদ্ধৃত হয়েছে এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের ”Tears down this wall” শীর্ষক বক্তৃতা দিয়ে সমাপ্ত হয়েছে। এ গ্রন্থের ২০১ পৃষ্ঠায় “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” শিরোনামে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সংকলিত হয়েছে। ফিল্ডের গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ অন্তর্ভুক্ত হওয়াও প্রমাণ করে যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বিশ্বের সেরা ঐতিহাসিক ভাষণগুলোর অন্যতম প্রধান যা বাঙালি জাতির ইতিহাসকে অনুপ্রাণিত করেছিলো। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের নির্যাস— “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”— বিশ্বের শোষিত নির্যাতিত নিপীড়ত মানুষের মুক্তির শাশ্বত শ্লোগানে পরিণত হয়েছে এবং বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর সাথে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। ১৮৬৫ সালের ৪ মার্চ তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ ভাষণে গৃহযুদ্ধ উপদ্রুত আমেরিকার মুক্তির কথা শুনি:“আন্তরিকভাবে আমরা আশা করি, ঐকান্তিকভাবে প্রার্থনা করি যে, যুদ্ধের এই শক্তিশালী চাবুক দ্রুত শেষ হয়ে যাবে”। ১৯৪০ সালের ৪ জুন হাউজ অব কমনসের ভাষণে তত্কালীন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল তার ঐতিহাসিক ভাষণে বলেন: “আমরা সমুদ্রে এবং মহাসমুদ্রে যুদ্ধ চালিয়ে যাবো…. আমরা আমাদের দেশকে রক্ষা করবোই— তা যে কোনো মূল্যেই হোক না কেন।” ১৯৬৩ সালের ২৮ আগষ্ট ওয়াশিংটন ডিসির লিংকন মেমোরিয়ালে কালো মানুষের অধিকার রক্ষা আন্দোলনের মহান নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র আধুনিক কালের সবচাইতে শক্তিশালী ভাষণগুলোর একটি প্রদান করেন। এক বিশাল জনতার উদ্দেশ্যে তিনি বলেন: “আমি স্বপ্ন দেখি যে একদিন এই জাতি জেগে উঠবে এবং তার মতাদর্শ অনুযায়ী বাঁচবে”। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কিংয়ের এই ভাষণের কয়েক বছর পর তিনি আততায়ীর হাতে নিহত হন। কিন্তু ঘাতকেরা তার স্বপ্নভঙ্গের কারণ হতে পারেনি। ভাষণের সময় তার স্বপ্নগুলো নিছকই স্বপ্ন ছিল— কিন্তু কালক্রমে সেগুলো দৃশ্যমান বাস্তবতা হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে বিধৃত স্বপ্নগুলোও বাস্তব হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। মুক্তির জন্য তার সেনারা বাংলা বিনির্মাণের স্বপ্ন— ডিজিটাল বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান বাস্তবতা হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক সকল উন্নয়নের পেছনেই প্রেরণা হিসেবে কাজ করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নগুলো— যা বাঙময় হয়ে উঠেছিলো তার ভাষণে।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কেবল একজন শেখ মুজিবুর রহমানকে নয়—পুরো একটি জাতিকে বৈশ্বিক মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। রবীন্দ্রনাথ নোবেল বিজয়ের মাধ্যমে যেমন বাঙালি জাতিকে এক সুমহান উচ্চতায় তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন—বঙ্গবন্ধুও তেমনি জীবদ্দশায় তার ভাষণের মাধ্যমে মানুষকে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেন এবং মরণোত্তরকালেও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভের মধ্য দিয়ে দেশ ও জাতিকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ আজ সমার্থক। পরস্পরের পরিপূরক। শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধু এবং বিশ্বও আজ পরস্পরের পরিপূরক প্রমাণিত হচ্ছে। অনুবাদের বাহনে চড়ে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ এখন পৃথিবী পরিভ্রমণ করবে। তার বজ্রকণ্ঠ শোষকের হূত্কম্পন ঘটাবে আর শোষিতকে জোগাবে সাহস। বঙ্গবন্ধু আজ কেবল বঙ্গবন্ধুই নন। বঙ্গবন্ধু আজ বিশ্ববন্ধুও বটে। দিকে দিকে শুনি তারই জয়গান। যারা হিমালয় দেখেননি, তাদের অনেকেই বঙ্গবন্ধুকে দেখে হিমালয়ের বিশালতা অনুভব করেছিলেন বলে জানিয়েছেন। এখন যারা বিসুভিয়াসের অগ্নিগিরি দেখেননি, তারাও নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শুনে সে উত্তাপ অনুভব করবেন। হিমালয়ের বিশালতা এবং বিসুভিয়াসের উদগীরণ এখন ইউনেস্কোর তালিকা পুস্তকে সংরক্ষিত আছে—বিশ্বের এক প্রামাণিক ঐতিহ্য হিসেবে। সকলের প্রবেশাধিকার সেখানে উন্মুক্ত।

n লেখক :অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ইত্তেফাক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ