প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অস্থিরতা বড় দুই দলেই

রাহাত : জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বড় দুই দলেই বাড়ছে অস্থিরতা। মনোনয়ন, কমিটি গঠন ও আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা আধিপত্য বিস্তার ও ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বিভিন্ন সময় বিবাদে জড়িয়ে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রে তা রূপ নিচ্ছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। অন্যদিকে ভাগবাটোয়ারায় বিএনপিতে দ্বন্দ্ব না থাকলেও কমিটি গঠন নিয়ে তৃণমূলের বিরোধ তীব্র হচ্ছে। প্রায় প্রতিটি আসনেই একাধিক প্রার্থী থাকায় উভয় দলই আছে সংকটে। এই বিবাদ, সংঘাত, সংঘর্ষের প্রভাব জাতীয় নির্বাচনে পড়ে কিনা তা নিয়ে উৎকণ্ঠায় আছে দু’দলের হাইকমান্ডই। যে কারণে এগুলো নিরসনে তারা ব্যস্ত সময় পার করছেন।

মাঠে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপির অনুপস্থিতিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে বিবাদ বাড়ছে। আধিপত্য বিস্তার, ভাগবাটোয়ারা এবং আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকাশ্যে চলে আসছে। ফলে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, অগ্নিসংযোগ, খুনোখুনির ঘটনাও ঘটছে। দলটির নেতাকর্মীরা বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে সংঘাত-সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে।

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাজধানীর আজিমপুরে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের দু’পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ১০ নভেম্বর সরকারি দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরে হবিগঞ্জের বাহুবলে হামলার শিকার হন সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী। এদিকে হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে তৃণমূলে সাংগঠনিক কমিটি ভেঙে দেয়া নিয়েও বিভিন্ন এলাকায় নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। গত সপ্তাহে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলা শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে বহিষ্কারের ঘটনায় সেখানে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। এসব ঘটনায় চিন্তিত আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। সংসদ নির্বাচনে এর নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা করছে দলটির শীর্ষ মহল। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে করণীয় নির্ধারণের জন্য খুব শিগগির আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক ডাকা হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বিষয়ে এর আগে এক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, তিনি এবং দলের কেন্দ্রীয় নেতারা এ বিষয়ে সতর্ক। কোথাও কোনো সমস্যা দেখা দিলে তারা সমাধানের উদ্যোগ নিচ্ছেন। এ সম্পর্কে চট্টগ্রামের প্রসঙ্গ আনেন তিনি।

বৃহস্পতিবার ঢাকার আজিমপুরের ঘটনায় আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড কঠোর অবস্থান নিয়েছে বলে জানা গেছে। এ দ্বন্দ্বের বিষয় নিয়ে রাতেই নগর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিষয়টি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এ বিষয়ে তিনি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যারাই শৃঙ্খলা নষ্ট করেছে তাদের গ্রেফতারের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে বলে দেয়া হয়েছে। দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকশন নিতে হবে। ওবায়দুল কাদের বলেন, বিশৃঙ্খলাকারীদের কোনো ছাড় নেই।

বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, এ বছর আমরা অনৈক্য চাই না। আওয়ামী লীগের জনসমর্থনের কোনো কমতি নেই। কিন্তু দলের ভেতরে কিছু সমস্যা আছে। সেগুলো সমাধান করার জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

জানা গেছে, ১৪ নভেম্বর ফরিদপুরের সালথায় আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে জিয়াউর রহমান নামের এক কর্মী নিহত হন। ৭ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ার ঝাউদিয়া ইউনিয়নের বাখইলে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বর্তমান চেয়ারম্যান কেরামত উল্লাহ ও সাবেক চেয়ারম্যান বখতিয়ার রহমানের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে বিল্লাল ও এনামুল নামে দুই আওয়ামী লীগ কর্মী নিহত হয়। ১১ আগস্ট শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলা ক্ষমতাসীন দলের দু’গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে যুবলীগ নেতা ইকবাল হোসেন নিহত হয়। রাজনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতির সমর্থকদের মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ১৮ জুলাই কুষ্টিয়ার মিরপুরে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে যুবলীগ কর্মী শাহীন নিহত হয়।

এর আগে ৯ জুলাই বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে এমপির সঙ্গে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময়ের জের ধরে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের দফায় দফায় সংঘর্ষে ফারুক সরদার নামে এক নেতা নিহত হয়। স্থানীয় সংসদ সদস্য পঙ্কজ দেবনাথের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে যান চেয়ারম্যান আলতাফ সরদার ও সহযোগীরা। পূর্বশত্রুতার জের ধরে এ হামলার ঘটনা ঘটে। একই সময় মাগুরার শালিখায় প্রতিপক্ষের হামলায় আবদুল জলিল নামে এক আওয়ামী লীগ কর্মী নিহত হয়।

এ ছাড়া ১৩ এপ্রিল নোয়াখালীর হাতিয়ায় আওয়ামী লীগের দুুই গ্রুপের সংঘর্ষে নুর আলম নামে এক কর্মী নিহত হয়েছে। সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলীর সমর্থক ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন চেয়ারম্যানের মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এর আগে প্রতিপক্ষের হামলায় মহিউদ্দিনের ভাই যুবলীগের কেন্দ্রীয় সদস্য আশরাফ উদ্দিন নিহত হয়। ৩০ মে পাবনার বেড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আলিম খাঁ নামের এক কর্মী নিহত হয়। পৌর ঠিকাদারি কাজের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে স্থানীয় আলিম খাঁ ও শফি হোসেনের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল।

গত ২৯ মার্চ সাভারের আশুলিয়ায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় গুলিবিদ্ধ হয়ে আওয়ামী লীগ কর্মী আবদুর রহিম নিহত হয়। পাথলিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেনের কর্মীদের সঙ্গে পাথালিয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান পারভেজ দেওয়ানের কর্মীদের মধ্যে এ সংঘর্ষ হয়।

চাঁদপুর-৩ আসনে দীর্ঘদিন ধরেই জনসংযোগ করছেন আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী এবং দলের ত্রাণবিষয়ক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী। মাঠে আছেন ওই আসনের সংসদ সদস্য দীপু মনি। তবে দু’জনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

নেত্রকোনা-৩ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী দলটির সাংস্কৃতিক সম্পাদক ও ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অসীম কুমার উকিল। আসনটির বর্তমান সংসদ সদস্য ইফতিকার উদ্দিন তালুকদার পিন্টুর মধ্যেও দূরত্ব আছে। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান দুই নেতার মধ্যে বিরোধও তৈরি হয়েছে। এ বিরোধকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। অসীম কুমার উকিলের স্ত্রী যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক অপু উকিল স্বামীর পক্ষে জনসংযোগ চালাচ্ছেন।

রাজশাহী-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বাগমারা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এনামুল হকের সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করেছে। সেপ্টেম্বরে স্থানীয় এমপির বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেন বাগমারা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আবদুস সোবহান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান জাকিরুল ইসলাম, তাহেরপুর পৌরসভার মেয়র আবুল কালাম আজাদসহ বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি। এ সংবাদ সম্মেলনের জেরে বেশ কয়েকজনকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়।

রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য আয়েন উদ্দিনের সঙ্গে রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদের দ্বন্দ্ব রয়েছে। চলতি বছর এ দু’জনের কর্মী-সমর্থকরা একাধিকবার নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে জড়ায়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিন আসনেই তীব্র বিরোধ রয়েছে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে। শিবগঞ্জে বর্তমান এমপি গোলাম রাব্বানীর বিরুদ্ধে একাট্টা ডা. সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী এনামুল হক। পৌর নির্বাচনের আগে বিদ্রোহী প্রার্থীকে সমর্থনের অভিযোগে এমপি গোলাম রাব্বানীকে বহিষ্কার করে জেলা আওয়ামী লীগ। সে বহিষ্কারাদেশ এখনও প্রত্যাহার করা হয়নি।

নওগাঁয় জেলা আওমামী লীগের সভাপতি ও সদর আসনের সংসদ সদস্য আবদুল মালেক এবং প্রয়াত নেতা আবদুল জলিল গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করেছে। আবদুল জলিলের সমর্থক অনুসারীরা আগামী সংসদ নির্বাচনে এ আসনে নিজাম উদ্দিন জলিল জনকে প্রার্থী হিসেবে চায়। এ নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করেছে।

জাপালপুরের ইসলামপুর উপজেলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ফরিদুল হক খান দুলালের সঙ্গে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মাহজাবিন খালেদের দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করেছে। মাহজাবিন আগামী নির্বাচনে জামালপুর-২ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী। এ লক্ষ্যে তিনি অনেকদিন ধরেই গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে ক্ষুব্ধ আসনটির বর্তমান সংসদ সদস্য দুলাল ও তার অনুসারীরা।

দিনাজপুরের বীরগঞ্জ ও কাহারোল উপজেলা আওয়ামী লীগে কোন্দল ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল ও তার অনুসারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের চরম বিরোধ দেখা দিয়েছে। কিছুদিন আগে বীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ বর্ধিত সভায় সিদ্ধান্ত নিয়ে মনোরঞ্জন শীল গোপালকে এলাকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে।

বর্তমানে সারা দেশে তুমুল আলোচনার বিষয় হবিগঞ্জে এমপি কেয়া চৌধুরীর ওপর হামলার ঘটনা। এটিও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জের। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আবু জাহির এমপির সঙ্গে দ্বন্দ্বের জেরে হামলার শিকার হন এমপি আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী। ঘটনার পর থেকে এমপি কেয়ার পক্ষের নেতাকর্মীরা নানা কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছেন। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপজেলা আওয়ামী লীগ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এমপি কেয়া চৌধুরীর পক্ষের অংশ ২৬ নভেম্বর মহাসড়ক অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। ১১ নভেম্বর ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মাসুদ হোসেন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়, ভাঙ্গা উপজেলা শাখার সভাপতি কাজী হেদায়েতউল্লাহ সাকলাইন ও সাধারণ সম্পাদক ফাউজুর রহমানকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তাদের বিরুদ্ধে দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ, দুর্নীতি ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

যদিও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এ বছর ১ মার্চ এক চিঠিতে সব জেলা, মহানগর, উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সিদ্ধান্ত ব্যতীত কোনো কমিটি ভাঙা বা বিলুপ্ত না করার জন্য নির্দেশ দেন।

ভাঙ্গার দুই নেতার বহিষ্কারের ব্যাপারে ওবায়দুল কাদের বলেন, অনেকে অনেক সময় না বুঝেও ব্যবস্থা নেয়। দলের কোনো কমিটি অব্যাহতি পাবে বা ভেঙে যাবে এ সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার কোনো স্থানীয় সংগঠনের নেই। আওয়ামী লীগের সভাপতি ছাড়া কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়া এসব সিদ্ধান্ত কেউ নিতে পারে না। যদি নিয়ে থাকেন সেই সিদ্ধান্ত সঠিক নয় এবং এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে না।

 

নির্বাচন ঘিরে কোন্দল বাড়ছে বিএনপিতে
প্রতিটি আসনে একাধিক প্রার্থী মুখোমুখি

 

সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে কোন্দল বাড়ছে বিএনপিতে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসছে, সঙ্গে সঙ্গে কোন্দলও মাথাচাড়া দিতে শুরু করেছে। মনোনয়ন ঘিরে অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকাশ্যে চলে আসছে। দেশের প্রায় প্রতিটি সংসদীয় আসনে দুই থেকে তিনটি গ্রুপ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। এলাকায় আধিপত্য ধরে রাখতে ও প্রভাব ফিরে পেতে তাদের মধ্যে চলছে শক্তির মহড়া। এর ফলে অনেক স্থানে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। মনোনয়নের পাশাপাশি তৃণমূলের বিশেষ করে সংসদীয় আসনের বিভিন্ন ইউনিটের কমিটি নিজেদের কব্জায় রাখা নিয়েও সৃষ্টি হচ্ছে কোন্দল। কোথাও কোথাও তা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষেও রূপ নিয়েছে। তৃণমূলের এ কোন্দলে জড়িয়ে পড়ছেন কিছু কেন্দ্রীয় নেতাও। নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে কোন্দল না মিটিয়ে জিইয়ে রাখার অভিযোগ রয়েছে অনেকের বিরুদ্ধে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। দেশের যেসব এলাকায় কোন্দল রয়েছে তা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানে হাইকমান্ডের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা। এ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপির দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল। এ দলে অসংখ্য যোগ্য নেতাকর্মী রয়েছে। তাদের মধ্যে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকলেও তাকে কোন্দল বলা যাবে না। তবে কোথাও ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হলে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তা মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করছি। তবে কেউ হাইকমান্ডের নির্দেশ না মেনে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হলে ছাড় পাবে না। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মওলানা ভাসানীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে শুক্রবার টাঙ্গাইলে যান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সন্তোষে ভাসানীর মাজারে শ্রদ্ধা জানানোকে কেন্দ্র করে জেলা বিএনপির দু’পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। শ্রদ্ধা জানাতে মির্জা ফখরুলের সঙ্গে জেলা বিএনপির বর্তমান নেতারা যান। এ সময় বিদ্রোহী অংশের নেতাকর্মীরা ভাসানী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম গেট এলাকায় অবস্থান নেন। পুলিশ তাদের ভাসানীর কবরের দিকে যেতে বাধা দেন। পরে ফুল দিয়ে মির্জা ফখরুলকে নিয়ে জেলা বিএনপির নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট দিয়ে ওই এলাকা ত্যাগ করেন। এর আগে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জন্য জেলার কয়েক নেতার পদ স্থগিত ও কয়েকজনকে বহিষ্কার করা হয়। সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে মনোনয়নকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপির মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র দলীয় কোন্দল। বিএনপির কেন্দ্রীয় সহপ্রচার সম্পাদক ও ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলিম দীর্ঘদিন ধরে এ আসনে মনোনয়ন পেতে কাজ করে যাচ্ছেন। জেলা বিএনপির নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় এক নেতা এক সময় সমর্থন দিতেন তাকে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এখন ব্যবসায়ী রাকিবুল করিম খান পাপ্পুকে সমর্থন দিচ্ছেন তিনি। আলিম ও পাপ্পু এ দু’জনকে কেন্দ্র করেই মূলত সেখানকার নেতাকর্মীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। তারা বলেন, এদের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।

কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, রাজশাহী জেলা ও মহানগর বিএনপির বিরাজমান দ্বন্দ্ব নতুন কমিটি গঠনের পর নতুন মাত্রা পেয়েছে। জেলার সভাপতি পদ থেকে অ্যাডভোকেট নাদিম মোস্তফা ও মহানগর থেকে মিজানুর রহমান মিনুকে সরিয়ে দেয়ার পর সংগঠনের মধ্যে চেইন অব কমান্ড বলতে কিছুই নেই। মিনুকে মহানগর বিএনপির কিছু কর্মসূচিতে দেখা যায়। কিন্তু নাদিমকে তার নির্বাচনী এলাকা পুঠিয়া-দুর্গাপুরে দেখা গেলেও জেলার কোনো কর্মসূচিতে তাকে দেখা যায় না। সম্প্রতি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান মণ্টুকে মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলন লাঞ্ছিত করার মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে অবহিত করা হয়েছে। মিনুর অনুসারী হিসেবে মিলন এখন জেলা বিএনপিতেও হাত বাড়িয়েছে। এখন জেলা যুবদলসহ অঙ্গসংগঠনের নেতারাও জেলা বিএনপির কোনো নির্দেশনা মানছে না।

সুনামগঞ্জ-১ আসনে ২০০১ সালে বিএনপির মনোনয়নে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন নজির হোসেন। কিন্তু ওয়ান-ইলেভেনে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সংস্কারপন্থী হওয়ায় ২০০৮ সালে তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়নি। সেবার মনোনয়ন পান ছাত্রদলের সাবেক নেতা ডা. রফিকুল ইসলাম। কিন্তু বিদ্রোহী প্রার্থী হন নজির হোসেন। সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নির্বাচনী এলাকায় নজির হোসেন আবার নিজের সমর্থকদের নিয়ে ঘর গোছানোর চেষ্টা করছেন। এ নিয়ে সুনামগঞ্জ-১ আসনে নেতাকর্মীদের বিরোধ চরমে। এ আসনে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও তাহেরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুলও বেশ শক্ত প্রার্থী। নির্বাচনকে সামনে রেখে এ আসনের নেতাকর্মীরা ত্রিধারায় বিভক্ত। এখানে জেলা বিএনপিতেও নতুন কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

কুমিল্লার লাকসাম উপজেলা ও পৌরসভা এবং মনোহরগঞ্জের কমিটি গঠন কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক কর্নেল (অব.) আনোয়ারুল আজিমসহ জেলার শতাধিক নেতার পদত্যাগের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া কুমিল্লার প্রভাবশালী নেতা যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা টিএমআই খলিলকে বহিষ্কার করায় জেলা বিএনপি দুই ভাগে বিভক্ত।

সম্প্রতি ওয়ান-ইলেভেনে কথিত সংস্কারপন্থী সাবেক এমপি জহিরউদ্দিন স্বপন বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এরপরই বরিশাল-১ আসনে গিয়ে নিজ সমর্থকদের সক্রিয় করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। মনোনয়ন পাওয়ার প্রত্যাশায় চালাচ্ছেন কার্যক্রম। তার এই কার্যক্রমকে ভালোভাবে নেয়নি একই আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী ও বিগত আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা রাখা কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান। ২০০৮ সালে এই আসন মনোনয়ন পাওয়া ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবহানও স্বপনকে ঠেকাতে তার সমর্থক নেতাকর্মীদের নিয়ে একাট্টা। ফলে এখানে বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটতে পারে।

এ প্রসঙ্গে আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, বিগত আন্দোলন সংগ্রামে আমার কী ভূমিকা, এখনও কী ভূমিকা রেখে চলেছি- তা চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান জানেন। অতএব মনোনয়ন নিয়ে চিন্তা করছি না। এখন চিন্তা শুধু একটা তা হচ্ছে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা করা। কাউকে ঠেকানো নিয়ে ব্যস্ত নই।

জানা গেছে, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে মনোনয়নকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থানে শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল ও ইশতিয়াক আহম্মেদ নাসির। এলাকার নেতাকর্মীরা দু’ভাগে বিভক্ত। দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর ইকবাল মনোনয়ন লাভের প্রত্যাশায় আবারও মাঠে সক্রিয় হচ্ছেন। বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে নেতাকর্মীদের পাশে না থাকায় স্থানীয়দের বড় একটি অংশ তার ওপর ক্ষুব্ধ।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও তৃণমূল পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার প্রধান সমন্বয়ক মো. শাজাহান বলেন, বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল। এখানে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকবে- এটাই স্বাভাবিক। তারপরও আমরা সতর্ক আছি।

তিনি বলেন, সম্প্রতি হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে লাখো নেতাকর্মীর অভ্যর্থনা, খালেদা জিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমকে ঘিরে মানুষের পথে পথে ঢল। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে চেয়ারপারসনের উপস্থিতিতে ১২ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এযাবৎকালের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ বিশাল জমায়েত। এতে করে নেতাকর্মীদের আস্থা এখন বেশ উঁচুতে। তাদের ধারণা জন্মেছে, এ অবস্থায় নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি ক্ষমতাসীনরা মেনে নিতে বাধ্য হবে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হবে এমন বিশ্বাস থেকেই নেতাকর্মীদের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। যুগান্তর

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ