প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রভাব বাড়ছে

রাহাত : ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর থেকেই দেশে রাজনীতি এবং সমাজ ব্যবস্থায় ধর্মের ব্যাপক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, ৭০ দশকের শেষেরদিকে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতার অবসানের কারণে রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলের আবির্ভাব ঘটে। নব্বইয়ের দশকে এসে রাজনীতিতে শুধু ধর্মের প্রভাব বৃদ্ধিই পায়নি, সমাজ ও দৈনন্দিন জীবনাচরণে ধর্মের ব্যাপক এবং দৃষ্টিগ্রাহ্য উপস্থিতি লক্ষ্যণীয় হয়ে উঠেছে। ইসলামপন্থী দলের সংখ্যা বৃদ্ধি, বিভিন্ন ধরনের ইসলামপন্থী দলের সংস্কারবাদী, রক্ষণশীল উগ্রপন্থী, সহিংস চরমপন্থাও বিকাশ লাভ করেছে।

শনিবার রাজধানীতে আয়োজিত একটি সেমিনারে তারা বলেন, দেশের সমাজ ও রাজনীতিতে কয়েক বছরের সংঘটিত ঘটনাবলী ও প্রবণতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে দুটি বড় ধরনের পরিবর্তন সংঘটনের। এর একটি হচ্ছে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবস্থা। অন্যটি হচ্ছে রাজনীতি ও সমাজে ধর্মের ব্যাপক প্রভাব। সেন্টার ফর গবর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত সেমিনারে ‘বাংলাদেশের নতুন মধ্যবিত্ত, গণতন্ত্র ও ধর্মের প্রশ্ন’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ।

অনুষ্ঠানে আলোচনায় অংশ নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খান বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা ও পুঁজিবাদ একত্রে ইউরোপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমাদের এখানে এটা হয়নি। ইউরোপের অভিজ্ঞতা এখানে নকল করা সম্ভব ছিল না। আমাদের এখানে প্রকৃতপক্ষে কোন ধর্মীয় সংস্কার হয়নি। আমাদের এখানে সংস্কার মানে আরও প্রতিহিংসাপরায়নতা। মানে একমত না হলে একেবারে উৎখাত করে দেয়া।

সংস্কার না হওয়ার ফলে ধর্মের বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে। কিন্তু আমাদের এখানে ধর্মের প্রভাব প্রাধান্য পাচ্ছে কেন? ধর্ম নিয়ে এই হৈচৈ শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও হচ্ছে। যত মুসলমান রাষ্ট্র আছে, শুধু মুসলমান নয়, খ্রীস্টান রাষ্ট্রগুলোতেও হচ্ছে। এটা দূর করা সম্ভব নয়। আমরা হঠাৎ করে দেখে ভয় পাচ্ছি। ভয়ের কারণ নেই।

তিনি বলেন, সারা বিশ্বের নির্বাচনগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সংখ্যালঘিষ্ঠ ভোট পেয়ে রাজনৈতিক দলগুলো সরকার গঠন করছে। এতে করে সকল জনগণের সরকার হচ্ছে না। এ ধরনের সরকারের জন্য প্রয়োজন প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার। সেটার জন্য প্রয়োজন রেফারেন্ডাম এবং আনুপাতিক হারে নির্বাচনের ব্যবস্থা থাকা। এতে করে গণতন্ত্র আরও পূর্ণতা পাবে। মধ্যবিত্তের সংজ্ঞা আয়ের ভিত্তিতে সঠিক নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, মধ্যবিত্ত হচ্ছে পেশাভিত্তিক শ্রেণী। মধ্যবিত্ত পৃথিবীর সব দেশে একভাবে বিকশিত হয় না। বাংলাদেশে এর বিকাশ রাষ্ট্রের আনুকূল্যে গড়ে উঠেছে। রাষ্ট্রের আনুকূল্যে গড়ে ওঠা পেশাগত এ শ্রেণীর দুর্বলতা রয়ে গেছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ’৪৭ এ ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়েছিল। ’৪৯ সালে আওয়ামী লীগের নতুন দল গঠনের সময় মুসলিম লীগ শব্দটি ব্যবহার করতে হয়েছিল। যদিও তাদের আদর্শ ছিল সেক্যুলার। তিনি বলেন ধর্মের গুরুত্ব রাজনীতিতে রয়েছে। কিন্তু ’৭৫ এর পর ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে রাজনীতিতে ব্যবহার করা হয়েছে। আবার যারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সঙ্গে জড়িত তারা এদেশের স্বাধীনতারও বিরোধিতা করেছে। সামরিক সরকারগুলো তাদের ইচ্ছেমতো রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহার করেছে। ফলে আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন পর ’৯৬ সালে ক্ষমতায় এসেও সংবিধানে সেক্যুলার শব্দটি পুনর্প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ২০০৯ সালে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরই কেবল তারা সেক্যুলার শব্দটি পুনঃব্যবহার করতে পেরেছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ চায় সবার অংশ গ্রহণে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন; যেখানে সব দল অংশগ্রহণ করবে। বিএনপি ভাইস চেয়ারম্যান ইনাম আহমেদ চৌধুরী বলেন, ধর্মের প্রভাব বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন উপায়ে চলে আসছে। উপমহাদেশের রাজনীতিতে ধর্মীয় ব্যবহার সব সময় ছিল। ধর্মের অপব্যবহার রোধে দেশে দরকার সত্যিকারের একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচন।

সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, রাষ্ট্রীয় আনকূল্যে দেশে এক ধরনের মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে উঠেছে। এরা সমাজের কোন অবদান রাখতে পারছে না। তারা লুটেরা ধনীতে রূপান্তর হচ্ছে। ’৭১ এ দেশ স্বাধীনতার মূলে ছিল দেশের মধ্যবিত্তরা। কিন্তু বর্তমানে যে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্ম নিয়েছে তার সঙ্গে আগের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর তফাৎ অনেক। তিনি বলেন আদর্শগত শূন্যতা আন্তর্জাতিকভাবে বিরাজ করছে। এ কারণে মানুষ নিরুপায় হয়ে ধর্মের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

লেখক কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, দেশে ধর্মের অপব্যবহার শুরু হয়েছে। এখন ধর্ম নিয়ে কিছু বলা বিপদ। এমনকি ঘরের মধ্যেও কিছু বললে যে কেউ মামলা করে দিতে পারে। আবার রাজনীতিবিদদের নিয়ে কথা বলাও বিপদ। ৫৭ ধারায় মামলার আশঙ্ক রয়েছে। অথচ এদেশে সমন্বয়বাদী সংস্কৃতি চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে; যার মিশ্রণে একটি বাঙালী সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। সেখালে ছিল না কোন হিংসা বা দ্বেষ। এটি ক্রমান্বয়ে এখন সমাজ থেকে উঠে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আমাদের প্রথাগত চিন্তাচেতনা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিলুøর রহমান বলেন, অর্থনীতি এগোচ্ছে, রাজনীতি একটু দুর্বল। বিশেষ করে ২০১৪ এর পরবর্তীতে মনে হচ্ছে এক ধরনের সীমারেখা, বিভাজন। একটা নতুন ধরনের বেসামরিক কর্তৃত্ববাদ। বেসামরিক কর্তৃত্ববাদের রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়ে আছে। রাষ্ট্র প্রক্রিয়ার পরিম-লের মধ্যে সেই কর্তৃত্ববাদের ছায়া বা নিয়ন্ত্রণ আমরা দেখতে পাই। এটা একটা বড় ধরনের সঙ্কট। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থার দুটো দিক দেখতে পাই। তবে আফ্রিকার বা লাতিন আমেরিকার বাস্তবতার মধ্যে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। অনেক জায়গায় দেখেছি বেসামরিক কর্তৃত্ববাদ দীর্ঘমেয়াদী অবস্থান গ্রহণ করতে পেরেছে। তারা এক ধরনের নাগরিকদের সম্মতি পেয়েছে। আমাদের এখানে বেসামরিক কর্তৃত্ববাদের অবস্থা তৈরি হলেও সরকার বৈধতার সঙ্কটে ভুগছে। সেখানে একটা অস্থিরতার জায়গা আছে।

তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় মধ্যবিত্ত রাজনীতি বিমুখ। এখানেও বিশ্লেষণের, গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমান ছাত্র বা সাধারণ মানুষের রাজনীতিতে অংশগ্রহণে অনীহা রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক আকাক্সক্ষার অনীহা, রাজনীতিতে অংশগ্রহণে অনীহার কারণে অংশগ্রহণের মূল্য বেড়ে গেছে।

সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক ও টেলিভিশন উপস্থাপক জিল্লর রহমানের সঞ্চালনায় সেমিনারে বক্তব্য রাখেন সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সিজিএসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম আতাউর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক, মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, ড. আহরার আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন সাদেকা হালিম ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বিআইজিডির হেড অব অপারেশন্স সরওয়ার জাহান চৌধুরী। জনকণ্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত