প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নকল প্রসাধনীর খনি বংশাল

ডেস্ক রিপোর্ট : গৃহবধূ জাকিয়া বেগম। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত স্বামী বেলায়েত হোসেন প্রায় ২৫ দিন ধরে চিকিৎসাধীন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে।

সার্বিক দেখভালের জন্য স্ত্রী জাকিয়াকে তার সঙ্গেই থাকতে হয়। ব্যবহারের প্রয়োজনে প্রসাধনী যেমন- ইনফিনিটি ব্র্যান্ডের পারফিউম ও রুবি নামে সরিষার তেলের একটি মিনি বোতল কেনেন তিনি। ঘটনাটি ৭ নভেম্বরের। জাকিয়া প্রসাধনী দুটি হাসপাতালের বাইরে জরুরি বিভাগের গেটের পাশের একটি দোকান থেকে নিয়েছিলেন।

ওই দোকানে গিয়ে দেখা যায়, রুবি নামের সরিষার তেলের বোতলে ফ্যাক্টরির ঠিকানা দেওয়া আছে শুধু বংশালের নাম। আর ইনফিনিটি পারফিউমের কনটেইনারে নেই উৎপাদনের ও আমদানিকারকের নাম-ঠিকানা। বংশালের মালিটোলা, গোলক পাল লেন ও পুরানা মোগলটুলীতে খোঁজ করে মেলেনি কোনো সরিষা তেলের ফ্যাক্টরির ঠিকানা। তবে একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানিয়েছেন, এখানে বেশ কয়েকটি কসমেটিকস প্রসাধনীর নকল পণ্য উৎপাদন এবং বাজারজাতের গোডাউন রয়েছে। এমনকি নামিদামি ব্র্যান্ডের নামে সেগুলো সরবরাহ করা হয়ে থাকে।

জানা যায়, এই নকল প্রসাধনীগুলোর বেশির ভাগই বিক্রি হয় সদরঘাট, ঢাকা মেডিকেলের গেটের সামনে, মিটফোর্ড ও চকবাজারের বিভিন্ন ভ্রাম্যমাণ দোকানে। বংশাল ছাড়াও চকবাজার ও কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা এলাকায় নকল প্রসাধনীর কারখানা রয়েছে। ঢামেক জরুরি বিভাগের সামনে ভ্রাম্যমাণ দোকানের আশিক নামের এক বিক্রেতা জানান, পুলিশের ঝামেলার কারণে দোকান নিয়ে তাদের দৌড়ঝাঁপের মধ্যে থাকতে হয়। তাই তাদের পারফিউম, তেলের বোতলে বিভিন্ন ময়লার দাগ দেখা যায়। তবে তাদের দোকানে কোম্পানির লোক এসে সরাসরি পণ্য দিয়ে যান বলেও তিনি জানান।

গত বছর ফেব্রুয়ারিতে বংশাল মালিটোলা এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নকল কসমেটিকস পণ্য জব্দ করে র‌্যাব-১০ এর ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় মুক্তার হোসেন (৪০), আনোয়ার (৫০), শাহ আলম (৩৭) ও দাদন আলী (৪৫) নামে চারজনকে জেল-জরিমানা করা হয়। তাদের হেফাজতে থাকা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের চার ট্রাক কসমেটিকস জব্দ করে র‌্যাব। যার আনুমানিক মূল্য পাঁচ কোটি টাকা। বিএসটিআইর সহকারী পরিচালক রিয়াজুল ইসলাম জানান, বংশালে একাধিক অভিযান চালিয়ে আমরা অনেক নকল পণ্য জব্দ করেছি। র‌্যাবের ফোর্স না পাওয়ার কারণে এখন অভিযান নিয়মিত করা যাচ্ছে না। এ সুযোগে নকলবাজরা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, নকল প্রতিরোধে ভ্রাম্যমাণ আদালতে দোষীরা সর্বোচ্চ সাজা পায় মাত্র দুই বছর।

ফলে উৎপাদন বাড়ছে হরহামেশা। গার্মেন্ট কারখানার কাপড় ধোয়ার কাজে ব্যবহৃত তরল সাবানের সঙ্গে বিভিন্ন রং ও সেন্ট মিশিয়ে শ্যাম্পু তৈরি করে বংশালে অবৈধ নকল পণ্যের রাজ্য গড়ে তুলেছে একাধিক চক্র। এ ছাড়া নিম্নমানের স্পিরিটের সঙ্গে রং মিশিয়ে সিরিঞ্জ দিয়ে খালি কনটেইনারে ভরে বডি স্প্রে তৈরি করে বাজারজাত করছে তারা। নকল শ্যাম্পু, তেল, অলিভ অয়েল ও বডি স্প্রেসহ বিভিন্ন ধরনের কসমেটিকস তৈরি করে নামিদামি কোম্পানির মনোগ্রাম লাগিয়ে সারা দেশে সরবরাহ করা হয়। অসাধু চক্রগুলো শ্যাম্পু ও বডি স্প্রের কাঁচামাল সংগ্রহ করে মিটফোর্ডে পারফিউমারি দোকান থেকে। জানা গেছে, সারা দেশ থেকে ব্যবহৃত পণ্যের খালি কনটেইনার জোগাড় করে নেওয়া হয় বংশালের মালিটোলা, গোলক পাল লেন ও পুরানা মোগলটুলী এলাকায়। ওইসব কনটেইনারে নকল প্রসাধনী ঢোকানো হয়। প্রভাবশালী ও অসাধু চক্রগুলো বিভিন্ন ফেরিওয়ালার কাছ থেকে কাগজ ও খালি কনটেইনারগুলো কিনে নেয়।

খালি কনটেইনার ব্যবহার করে পেনটিন, ডাব, হেড অ্যান্ড শোল্ডার, সানসিল্ক, ক্লিয়ারসহ বিভিন্ন নামিদামি ব্র্যান্ডের শ্যাম্পু এবং মেক্সি, এক্স ও ডয়েটসহ নামি ব্র্যান্ডের বডি স্প্রে ও লোশন তৈরি করে বিক্রি করা হয়। মালিটোলার স্থানীয় প্রভাবশালী ময়না হাজীর মালিটোলার ১৫ নম্বর ও ৯০ নম্বর বাড়িতে নকল কারবারের তথ্য পায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সে তথ্যে ২০১৪ সালে ওই বাড়ির ১৮টি কারখানায় ভেজাল প্রসাধন সামগ্রী, তৈরির নানা উপকরণ, খালি কনটেইনার, কাগজের মোড়ক, লেবেল, হলোগ্রাম ও কাঁচামাল জব্দ করেছিল র‌্যাব। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে আবারও সেখানে অভিযান চালিয়ে নকল পণ্য জব্দ করা হয়। তবু নকল প্রসাধনী তৈরি ও বিক্রি থামেনি বলে জানান বংশালের একটি জুতা তৈরি কারখানার কারিগর সামসুদ্দিন। বাংলাদেশ প্রতিদিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ