প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রোহিঙ্গা বৃদ্ধার আত্মকথন
অতঃপর বাংলাদেশে

ডেস্ক রিপোর্ট : ভোর রাত। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। একই গ্রামের ১০ পরিবারের অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশু বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রাখাইনের পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চল রাসিডং থানার লুদাইং থেকে পথচলা শুরু করেছে। পুরুষদের কাঁধে বস্তাভর্তি নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল ও অনেক মহিলাদের কোমরে শিশু অথবা বস্তা। চারদিকে চোখ রেখে সেনাদের অবস্থান লক্ষ্য করে সূর্য ওঠার আগেই তাদের পাহাড়ি পথ ধরতে হবে। নতুবা মগেরা (বৌদ্ধ) দেখলে নির্যাতন, অর্থ, স্বর্ণসহ মালামাল লুট করে সর্বস্ব কেড়ে নেয়ার ভয় রয়েছে।
তাদের সঙ্গে পঞ্চাশোর্ধ মকবুল আহমদের স্ত্রী আম্বিয়া খাতুন ও মা-বাবা হারা তার দুই এতিম নাতি ইয়াছমিন (১০) এবং মো. হারুন (৬) পথ এগিয়ে চলছে।
গ্রামের পর গ্রাম পেরিয়ে ঠিকই সূর্য ওঠার আগেই পাহাড়ি পথে ঢুকেছে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গার এ দলটি। উঁচু নিচু ঢালু পাহাড় অতিক্রম করতে সারাদিন লেগে যায় তাদের। পথিমধ্যে শুকনো খাবার চিড়া আর ঝর্ণার পানি খেয়ে সারাদিন হেঁটেছে। ক্লান্ত শরীরে সামনে পা এগুতে না চাইলেও প্রাণের ভয়ে হাঁটতে হচ্ছে। এসময় যা দেখেছে তাদের বর্ণনায় মধ্যযুগকে হার মানাবে। গোটা পাহাড়ি পথে লাশের পচা দুর্গন্ধ। মানুষের কঙ্কাল এলোমেলোভাবে পড়ে আছে। পচা লাশে মাছি ভনভন করছে। যুবতীদের উলঙ্গ মৃতদেহ এলোমেলোভাবে আছে। অনেকের হাত-পা, মস্তক বিচ্ছিন্ন। অনেক লাশের ওপর জঙ্গল দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে। জনমানবহীন গ্রামের পর গ্রাম খালী পড়ে আছে। মাঝে মাঝে অনেক গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে নিশ্চিহ্ন করেছে। মানুষের কোনো দেখা নেই। দূর থেকে শুধু ভেসে আসে কুকুর আর শিয়ালের শব্দ। যা দেখলে ও শুনলে সারা শরীর শিউরে ওঠে। সন্ধ্যা হতেই রোহিঙ্গার এই দলটি পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে পশ্চিমাঞ্চলীয় অঞ্চল মংডু থানাধীন একটি গ্রামে পৌঁছে। সেখানে রাত পার করে ফের সকালে হেঁটে বিকালের দিকে ধংখালী সীমান্তের বালুচরে আরো অন্যান্য রোহিঙ্গাদের সঙ্গে জড়ো হয়ে তাঁবু গাড়ে। এপার থেকে নৌকা না যাওয়ায় প্রায় ২২ দিন যাবৎ বালুচরে অবস্থান করে দলটি। দুয়েকটি নৌকা হঠাৎ করে গিয়েই মোটা অঙ্কের বিনিময়ে কয়েক পরিবারকে নিয়ে আসলেও অর্থ না থাকায় অন্যান্য রোহিঙ্গাদের সঙ্গে তারাও রয়ে যায়। সেখানে একটি সংস্থা তাদের খাদ্য সরবরাহ করছে।
১৫ই নভেম্বর বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় টেকনাফ বাস স্টেশনে রোহিঙ্গার এই দলটির সঙ্গে এই প্রতিবেদকের দেখা হলে তারা কথাগুলো বর্ণনা করেন। তাদের সঙ্গে দেখা হয় আম্বিয়া খাতুনসহ তার দুই এতিম নাতনির। আম্বিয়া খাতুন জানান, স্বামীকে হারিয়েছে অনেক বছর হয়েছে। তিন ছেলে, তাদের পুত্রবধূ ও নাতি-নাতনি নিয়ে ভালোই সময় কেটে যাচ্ছিল। একসময় এক ছেলে সোলতান আহমদের স্ত্রী মারা যায়। স্ত্রী মারা যাওয়ায় গত ৪ বছর আগে ছেলে সোলতান ছেলে-মেয়ে ও মাকে ফেলে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। তার আর কোনো খোঁজ নেই। তার দুই ছেলে-মেয়ের ভার পড়ে দাদির কাঁধে। অপর দুই ছেলে তাদের স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে মা থেকে আলাদা হয়ে যায়। ফলে এক প্রকার অসহায় হয়ে পড়েন দুই নাতিকে নিয়ে। সহায়-সম্বল বলতে ৮০ শতক জমি ছিল। তা দিয়ে কোনো রকমে দু’বেলা খাদ্য খেয়ে জীবন পার করতেন। ২৫শে আগস্ট সহিংসতা শুরু হলে তাদের জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়। জমির ধান কাটতে পারছে না। বাজার নেই। ঘরে খাদ্য নেই। বাইরে যেতে দিচ্ছে না, কাজ কর্মও নেই। এমবিসি কার্ডের জন্য প্রতিদিন চাপ দিচ্ছে এবং তা নিতে বাধ্য করছে। আর তা গ্রহণ না করলে রাখাইনে থাকা যাবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে সেনারা। তাই এক প্রকার খাদ্যসংকটে দুই নাতনিকে নিয়ে এপারে আশ্রয়ে আসি। তিনি আরো জানান, বিদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা ফিশিং বোট পাঠিয়ে তাদের এপারে নিয়ে আসে। বোটে কোন ভাড়া দিতে হয়নি। মঙ্গলবার বিকাল ৪টার দিকে ধংখালীর বালুচর থেকে রওনা দিয়ে বাহারছড়া ইউনিয়নের কচ্ছপিয়া সাগরের সৈকত পয়েন্ট দিয়ে রাত ১টায় তাড়াহুড়ো করে তাদের নামিয়ে দিয়ে বোটটি দ্রুত সটকে পড়ে। অজ্ঞাত ওই বিদেশি রোহিঙ্গারা যদি বোট না পাঠাতেন হয়তো বালুচরেই তাদের পড়ে থাকতে হতো। ওরা কারা তা তিনি জানেন না। তবে শুনেছে বিদেশে থাকা রোহিঙ্গারা বোটের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এভাবেই আরো জড়ো হওয়া রোহিঙ্গারা এপারে আসার পথে।
দুই নাতিকে নিয়ে পঞ্চাশোর্ধ এই বৃদ্ধা মহিলা অসহায়। রাখাইনের সারাটা পথ চলতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। সঙ্গে টানতে হয়েছে দুই শিশু নাতিকে, তারাও ক্লান্ত, মুখে বিষণ্নতা। কোথায় যাবে, কোথায় থাকবে, গন্তব্য জানা নেই। এখন সম্পূর্ণ ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়েছে ভবিষ্যৎ। অতঃপর তারা এখন বাংলাদেশে পৌঁছে এতটুকু স্বস্তি পেয়েছে যে, মৃত্যু তাদের আর তাড়া করবে না। মানবজমিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত