প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিএনপি নেত্রী নতুন কিছু বলতে পারলেন না

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.) : দীর্ঘ প্রায় ২২ মাস পর বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ১২ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় ভাষণ দিলেন। ঘন্টাখানেকের মতো তিনি বক্তৃতা করেছেন। বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল এবং বেগম খালেদা জিয়া তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। দলের শীর্ষ নেত্রীর সঙ্গে অন্য সিনিয়র নেতাদের একটা পার্থক্য মানুষ প্রত্যাশা করে বলেই শীর্ষ নেত্রীর সভায় লোক সমাগম বেশি হয় এবং মিডিয়ার আকর্ষণও বেশি থাকে।

উপরন্তু ইতিমধ্যে সংঘটিত অনেক ঘটনাপ্রবাহের ২২ মাস পর জনসভায় ভাষণ দেওয়ার কারণে মানুষের প্রত্যাশা ছিল নিশ্চই তিনি নতুন কিছু শোনাবেন। কিন্তু দলের সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রতিদিন টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে যা বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার কাছ থেকে সেই একই কথা শুনে সাধারণ জনমানুষ হতাশ হয়েছে, একথা কেউ বললে সেটিকে অযৌক্তিক বলা যায় না। দীর্ঘদিন পর রাজধানীতে জনসভার সুযোগে দলের নেতাকর্মীদের উজ্জ্বীবিত হওয়া ও উল্লাস প্রকাশ করা এককথা, আর দলীয় বলয়ের বাইরে বৃহত্তর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গণের পর্যবেক্ষক এবং দেশের অভ্যন্তরে নির্বাচনের ডিসাইডিং ফ্যাক্টর দল নিরপেক্ষ ভোটারদের আকাক্সক্ষা ও প্রত্যাশার ব্যাপারটি কি হলো, সেটা ভিন্ন কথা।

 

শীর্ষ নেতা-নেত্রী বা সিনিয়রদের কাছ থেকে মানুষ সব সময় স্বতন্ত্র ও নতুন কিছু আশা করে। সে কারণে যেকোনো সাধারণ অনুষ্ঠানেও যারা সিনিয়র থাকেন তারা শেষে বক্তব্য রাখেন এই জন্য যে, অন্যেরা যা বলেছেন তার থেকে ভিন্ন কিছু বলার সক্ষমতা, বুদ্ধিমত্তা এবং চিন্তার বিস্তৃতি সিনিয়রদের রয়েছে। অন্যান্য সব পুরনো কথার সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়া জাতীয় ঐক্যের কথাও বলেছেন। অন্যান্য দলের নেতা-নেত্রীগণও একই কথা সচরাচর বলে থাকেন। এটা ভালো কথা। কিন্তু জাতীয় ঐক্য কোথায়, কিভাবে হবে তার কিছু তিনি বলেননি। ফলে ধরে নেওয়া যায় এটাও আটপৌরে কথা।

 

প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের ভিন্ন মতাদর্শ থাকবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার পথ, কৌশল ও পন্থা ভিন্ন হবে বলেই তারা ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দল। জাতীয় ঐক্য হয় রাষ্ট্রের ফান্ডামেন্টাল বা মৌলিক রাষ্ট্রীয় দর্শনের ওপর, যা সন্নিবেশিত হয় রাষ্ট্রের সংবিধানে, রাষ্ট্রের জন্মলগ্নে, রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রার প্রারম্ভে। যেটি বাংলাদেশের বেলায় হয়েছে বাহাত্তরের মূল সংবিধানের মধ্য দিয়ে। আমেরিকা, ব্রিটেন, ভারতসহ বিশ্বের সব অগ্রগামী রাষ্ট্র আজ উন্নতির শিখরে উঠছে এই কারণে যে, রাষ্ট্রের জন্মলগ্নে প্রতিষ্ঠিত মৌলিকত্ব শত শত বছর ধরে অটুট আছে, তার ওপর কোনো দল কখনো হস্তক্ষেপ করেনি। কিন্তু বাংলাদেশের বেলায় ১৯৭৫ সালের পরে সামরিক শাসকদ্বয় বন্দুকের জোরে স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র কয়েক বছরের মাথায় এতবড় জাতীয় ঐক্যমতের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের মৌলিক দর্শনকে সংবিধান থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। বিএনপি এখনো ওই ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া সংবিধানের জায়গায় বসে রাজনীতি করছে। তাই জাতীয় ঐক্য চাইলে বিএনপিকে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্মলগ্নে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের মৌলিক দর্শনে ফিরে আসতে হবে এবং সামরিক শাসকের কলঙ্কের বোঝা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে হবে।

একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়ে, অবমাননা করে যে রাজনীতি হয় তা দীঘদিন টিকে থাকতে পারে না। ৩০ লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত রাষ্ট্রের সহজাত শক্তিকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না। এই মহা সত্য কথা বিএনপিকে উপলব্ধি করতে হবে। সুতরাং ১২ নভেম্বরের জনসভায় বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্যে জাতীয় রাজনীতির মূল সংকট নিরসনের কোনো কথা নেই। বিএনপি যেখানে ছিল সেখানেই আছে। ১২ নভেম্বরের জনসভা দেশের মানুষকে কিছু দিতে পারেনি।

লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ