প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এবার সিন্ডিকেটের লক্ষ্যবদ্ধ হবে কোন পণ্যটি?

ড. সা’দত হুসাইন : ব্যবসায়ীক সিন্ডিকেটের নাটের গুরু তথা মূল হোতাকে অবশ্যই একজন দক্ষ সংগঠক এবং অন্তর্দৃষ্টি (রহংরমযঃ) সম্পন্ন কুশলী হতে হয়। কাজটি খুব খারাপ, জনস্বার্থের পরিপন্থী এবং সাধারণ মানুষ, তথা ভোক্তা সাধারণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একই সাথে কাজটি জটিল। এর মূল হোতাকে দূরদৃষ্টি সম্পন্ন হতে হয়। পণ্যের চাহিদা সরবরাহ সম্পর্কে তার পরিষ্কার ধারণা থাকতে হয়। তাকে অর্থনীতিবিদ হতে হবে এমন কথা নেই। তবে বাজার কাঠামো এবং বাস্তব অর্থনীতি সম্পর্কে তার টনটনে ধারণা থাকতে হয়। দ্রব্যের স্থিতি-স্থাপকতা, ভবিষ্যত উৎপাদন এবং আমদানির সুযোগ-সম্ভাবনা সম্পর্কে তাকে ওয়াকিবহাল হতে হয়।

 

এর পর শুরু হয় সাংগঠনিক তৎপরতা। কোন পণ্যটিকে তারা টার্গেট করবে তা নির্ভর করে সহব্যবসায়ীদের পছন্দ-অপছন্দ এবং প্রবণতার ওপর। এখানে লাভ-ক্ষতির বিষয়টি একমাত্র বিবেচ্য নয়। সহব্যবসায়ীরা যে বিষয়গুলো বিবেচনায় আনে তা হচ্ছে, তাদের স্টকে মালামাল কি রয়েছে, পাইপ লাইনে কি পরিমাণ পণ্য রয়েছে, আমাদানির সম্ভাবনা কি রূপ এবং সবশেষে, অন্যান্য সাধারণ ব্যবসায়ী আমদানি বা অন্য কোনো উপায়ে পণ্যটি দ্রুত সংগ্রহ করে বাজারজাত করতে পারবে কিনা। তারা আরও হিসাব করে দেখে ঋতু পরিক্রমায় তারা এখন কোথায় আছে। নতুন পণ্যের ‘সিজন’ কখন শুরু হচ্ছে। ‘সিজন’ শুরু হওয়ার আগে তাদের স্টকের পণ্য এবং পাইপ লাইনে থাকা সরবরাহ শেষ হবে কিনা। একই সঙ্গে তারা জেনে নেয় সরকারি ভা-ারের অবস্থা।

 

এ সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে নাটের গুরু ও তার অনুগত চক্র সিদ্ধান্ত নেয় কোন পণ্যটি হবে সিন্ডিকেটের পরবর্তী টার্গেট। এর পরই শুরু হয় ব্যবসায়ীক তৎপরতা। বারবার যোগাযোগ করে সহব্যবসায়ীদেরকে অঙ্গীকারবদ্ধ করা হয়, তারা যেন সমঝোতার মূল কাঠামো এবং পরিসীমা থেকে বিচ্যুত না হয়। আঁটঘাট বাধা ঐকমত্য সৃষ্টি হওয়ার পর হঠাৎ করে পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেওয়া হয়। সব বাজারে একই দাম। অজুহাতও একই। উৎসে দাম বেড়েছে, সীমান্তে দাম বেড়েছে, সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে। রাস্তাঘাটে চাঁদাবাজি, মাস্তানি, পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি, বৃষ্টি-বাদল এসব অতি সাধারণ অজুহাত। এক গোষ্ঠী কর্তৃক আর এক গোষ্ঠীর ওপর দোষ চাপানো তো লেগেই থাকে।

 

সিন্ডিকেটের নাটের গুরু এবং তার চক্রের সাথে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকে। এর মাধ্যমে নিবিড় মনিটরিং, লাগসই আইন প্রয়োগ এবং রাষ্ট্রয়াত্ত্ব প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধির প্রচেষ্টাকে শিথিল করে দেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষ অনেক হুমকি-ধমকি ছাড়ে, ভোক্তার স্বার্থ রক্ষার পক্ষে সুন্দর সুন্দর কথা বলে। শেষ পর্যন্ত তারা বৈষয়ীক সূত্রে গাঁথা সিন্ডিকেটের পক্ষে অবস্থান নেয়। তাদের স্বার্থ রক্ষা করে কাজ করে। অসহায় ভুক্তভোগীদের পক্ষে কেউ থাকে না। তারা কম খেয়ে, কম পরে ধুঁকে ধুঁকে নিস্তেজ হয়ে পড়ে।

 

গত ক’বছরে, বলা যায় কয়েক দশকে, যে পণ্যগুলি একের পর এক সিন্ডিকেটবাজির কবলে পড়েছে সেগুলো হচ্ছে : চিনি, চাল, আটা, ময়দা, লবণ, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, সোয়াবিন তেল, বেগুন, কাঁচা মরিচ, ডাল, মসলা, মাংস, ডিম ইত্যাদি। হিসাব করে দেখুন, কোনো না কোনো সময়ে হঠাৎ করে এর একটি বা দুটি পণ্যের দাম অযাচিতভাবে লাফ দিয়ে বেড়ে ক্রেতা সাধারণের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এ ব্যাপারে পত্রপত্রিকায় লেখা হয়েছে, ক্রেতা সাধারণ দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছে, অভিশাপ দিয়েছে। কিছুই হয়নি। সিন্ডিকেটবাজরা নিয়মিত বিরতিতে তাদের কর্মকা- চালিয়ে গেছে। তাদের নাটের গুরু এখন পর্যবেক্ষণ করছে, নীরব সমীক্ষা চালাচ্ছে, তথ্যাদি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছে এবার কোন পণ্যটিকে টার্গেট করা যায়।

শীত আসছে। ‘সিজন’ বদলি হচ্ছে। কয়দিন পরই অসহায় ভোক্তারা টের পাবে সিন্ডিকেট এবার কোন পণ্যটিকে টার্গেট করছে।
লেখা : সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ