প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রধান বিচারপতি, অপরাপর বিচারকদের নিয়োগ ও পদত্যাগ

ইকতেদার আহমেদ : প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হন। প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণের আবশ্যকতা নেই। প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগের প্রধান। প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগের প্রধান হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগে একটি বেঞ্চের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও সংবিধানে প্রধান বিচারপতির পদটিকে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। সংবিধানে উচ্চাদালতের বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে যে যোগ্যতার বিষয় উল্লেখ আছে তা হলো- এ পদে নিয়োগ প্রার্থীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং তার সুপ্রিম কোর্টে অন্যূন দশ বছরকাল ওকালতির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে অথবা বিচার বিভাগীয় পদে অন্যূন দশ বছর কর্মের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। সংবিধানে সুপ্রিম কোর্টে বিচারক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে আইনের দ্বারা নির্ধারিত অন্যান্য যোগ্যতার উল্লেখ থাকলেও অদ্যাবধি যোগ্যতা নির্ধারণপূর্বক এ বিষয়ে কোনো আইন প্রণীত না হওয়ায় পূর্বল্লিখিত যোগ্যতার আলোকে উচ্চাদালতে বিচারক পদে নিয়োগ কার্য সমাধা করা হয়ে আসছে।

 

প্রয়োজনীয় যোগ্যতাসম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে উচ্চাদালতের বিচারক পদে নিয়োগ পরবর্তী তাকে সংবিধানে উল্লিখিত বিচারকদের জন্য নির্ধারিত শপথ বাক্য পাঠ করতে হয় এবং শপথ পাঠ ব্যতিরেকে তিনি বিচারক পদে আসীন হন না। প্রধান বিচারপতি এবং আপীল বিভাগে বিচারক পদে নিয়োগ সম্পূর্ণরূপে পৃথক নিয়োগ। উভয় নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে নতুন করে শপথ পাঠ করতে হয়। সংবিধানে প্রধান বিচারপতি বা আপীল বিভাগে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে পৃথক কোনো যোগ্যতার বিষয় উল্লেখ নেই; তবে দীর্ঘকাল যাবৎ উভয় নিয়োগে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আপীল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারক এবং হাইকোর্ট বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারককে প্রাধান্য দেওয়া হয়ে আসছে।
বিচার বিভাগের নি¤œতম পদ সহকারী জজ পদের নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হলে একজন প্রার্থীর মাধ্যমিক হতে এলএলবি ¯œাতক পর্যন্ত সকল পরীক্ষায় ন্যূনতম দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার আবশ্যকতা রয়েছে। উচ্চাদালতের বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে অদ্যাবধি আইন প্রণয়নের মাধ্যমে শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি উল্লিখিত না হওয়ায় শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টিকে অবজ্ঞা বা উপেক্ষা করার অবকাশ নেই। আর এর পিছনে যে কারণ তা হলো- সাংবিধানিকভাবে উচ্চাদালতের হাইকোর্ট বিভাগকে অধস্তন সকল আদালত ও ট্রাইব্যুনালের ওপর তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে বিশ্বব্যাপী যে স্বীকৃত নিয়ম তা হলো- উচ্চতর যোগ্যতাসম্পন্নরা নি¤œতম যোগ্যতাসম্পন্নদের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ করবেন। সে নিরিখে বিচার বিভাগের নি¤œতম পদে নিয়োগের বিষয়ে শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টি নির্ধারিত করে দেওয়ায় এর নি¤েœর যোগ্যতাসম্পন্ন কোনো ব্যক্তিকে উচ্চাদালতে বিচারক পদে নিয়োগ দেওয়ার অবকাশ নেই।

 

প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগের প্রধান হওয়ার কারণে এবং সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগকে হাইকোর্ট বিভাগের রায়, ডিক্রী, আদেশ বা দ-াদেশের বিরুদ্ধে আপিল শুনানী ও তা নিষ্পত্তির এখতিয়ার প্রদান করায় প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের বিচারকদের যথাক্রমে আপিল বিভাগের অপরাপর বিচারক এবং হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকদের চেয়ে উচ্চতর যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়ার আবশ্যকতা রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ নিয়োগের ক্ষেত্রে অনাকাক্সিক্ষতভাবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও মতাদর্শীর বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার কারণে যোগ্যতা বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যায়।
উচ্চাদালতের একজন বিচারক নিয়োগ পরবর্তী তার বয়স ৬৭ বছর পূর্ণ হওয়া অবধি পদে বহাল থাকেন; তবে প্রধান বিচারপতিসহ উভয় বিভাগের যে কোনো বিচারক চাইলে রাষ্ট্রপতির উদ্দেশ্যে লিখিত স্বীয় স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে পদত্যাগ করতে পারেন। বাংলাদেশে সদ্য পদত্যাগী প্রধান বিচারপতি ব্যতীত অপর কোনো প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের নজির নেই। ইতোপূর্বে আপীল বিভাগের জনৈক বিচারক অতিক্রান্ত করার কারণে পদত্যাগ করেছিলেন। হাইকোর্ট বিভাগের জনৈক বিচারকের আইন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রিত্ব গ্রহণের জন্য পদত্যাগের নজির রয়েছে। হাইকোর্ট বিভাগের অপর একজন বিচারক সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাষ্ট্রপতি কর্তৃক পদত্যাগের জন্য অনুরুদ্ধ হলে তিনি পদত্যাগ করে পদ হতে সরে দাঁড়ান। তাছাড়া হাইকোর্ট বিভাগের অন্যূন দুজন বিচারক সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল কর্তৃক অভিযুক্ত হয়ে চাকরি হারানোর পূর্বক্ষণে পদত্যাগ করে বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়ানোর প্রয়াস নিয়েছিলেন।

 

সদ্য পদত্যাগী প্রধান বিচারপতি ব্যতীত ইতোপূর্বে উচ্চাদালতের যে সকল বিচারক পদত্যাগ করেছিলেন তারা সকলে রাষ্ট্রপতির উদ্দেশ্যে তাদের নিজ নিজ স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগ পত্র রেজিস্ট্রার জেনারেল (রেজিস্ট্রার) এর কার্যালয়ের মাধ্যমে প্রেরণ করেছিলেন। পদত্যাগ পত্রগুলো রাষ্ট্রপতির বরাবর লিখিত হলেও রেজিস্ট্রার জেনারেল এর কার্যালয় এগুলো আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করে থাকে। আইন মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় সারসংক্ষেপ প্রস্তুত করে তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রেরণ করে এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে তার পরামর্শ সহকারে তা রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে প্রেরণ করা হয়।

 

প্রধান বিচারপতি ব্যতীত সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের অপরাপর বিচারকদের নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণের আবশ্যকতা রয়েছে। আর তাই প্রধান বিচারপতি ব্যতীত উভয় বিভাগের অপর যে কোনো বিচারক পদত্যাগ করলে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ব্যতিরেকে রাষ্ট্রপতির পক্ষে তা গ্রহণ করার অবকাশ নেই। প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি যদিও প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণ হতে অবমুক্ত কিন্তু পদত্যাগের বিষয়টি নিয়োগ হতে ভিন্নধর্মী হওয়ার কারণে এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ব্যতিরেকে রাষ্ট্রপতির পক্ষে পদত্যাগ পত্র গ্রহণ সংবিধান সম্মত নয়।

লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
সম্পাদনা : আশিক রহমান ও মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ