প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সাক্ষাৎকারে রাজনৈতিক বিশ্লেষক আফসান চৌধুরী
শেখ হাসিনার অসম্ভব সবল নেতৃত্ব দলের মধ্য ও নিম্নস্থানীয় নেতৃত্বকে দুর্বল করে ফেলছে

আশিক রহমান : বিএনপি এখন যে রাজনীতি করে সেই রাজনীতির যুগ প্রায় শেষ। বিএনপির ড্রয়িংরুম ভিত্তিক রাজনীতি সেই সত্তরের দশকে শেষ হয়ে গেছে। এখন আর ড্রয়িং রুমের রাজনীতি দিয়ে চলে না। বিএনপির নেতৃত্ব বয়স্ক, দলটিতে তারুণ্যের ঘাটতি রয়েছে। তরুণদের হাতে দলটির রাজনীতি নেই।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতার রাজনীতি করে। মাঠের রাজনীতি এখন অনেক বেশি প্রতিষ্ঠিত। সেই রাজনীতি আওয়ামী লীগ করতে পারছে না। কারণ তারা ক্ষমতায় রয়েছে। আর আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা! এরকম অসম্ভব রকম সবল একটা নেতৃত্ব মধ্য ও নি¤œস্থানীয় নেতৃতকে দুর্বল করে ফেলছে। কারণ প্রধানমন্ত্রীর ওপর এতবেশী নির্ভরশীল যে তারা (আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্ব) নিজের অবস্থান থেকে কোনো কিছু করতে পারেন নাÑ আমাদের অর্থনীতিকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেন গবেষক, সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আফসান চৌধুরী।

এক প্রশ্নের জবাবে এই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক বলেন, টক শোতে যখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের কেউ কথা বলেন, কীভাবে শুরু করবেন সেই ভাষাটাও আগে থেকে বলে দেওয়া যায়। প্রধানমন্ত্রীর বন্দনা চর্চা শুরু হয়ে যায়, এটা দুর্বল চেতনা। প্রধানমন্ত্রীর অসুবিধা হচ্ছে সৎ পরামর্শের ক্ষেত্রে তার দ্বিতীয় মানুষের অভাব। তার প্রশংসা করার লোকের অভাব নেই। কিন্তু তাকে সাহসের সঙ্গে সমর্থন করে যাবেন সে ধরনের লোকের বড় অভাব। এ কারণেই বলছি, এটা আওয়ামী লীগের সংকট।

তিনি বলেন, এই সংকটটা যখন বিএনপির ছিল তখন তাদের কী হাল হয়েছিল। বিএনপি বলতে আজকে কোনো রাজনৈতিক দল রয়েছে তা খুব একটা শক্তভাবে বলা যায় না। ভোটের বিষয়টা আলাদা। বিএনপি এখন খালেদা জিয়া বা তারেক রহমান নির্ভর দল হয়ে গেছে। খালেদা জিয়া বা তারেক রহমান না থাকলে দলটি কে চালাবে? আওয়ামী লীগের মধ্যেও এই দুর্বলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখনই কোনো পদক্ষেপ নেন, যে সাহস ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তিনি, তার দলের নেতাদের মধ্যে কী সেটি আছে? তারা আজকে একটা বলবেন, কালকে আরেকটা। প্রধানমন্ত্রী যতক্ষণ বলেননি, আমরা ষোল কোটি মানুষ খাওয়াতে পারলে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদেরও খাওয়াতে পারব। তার এই অবস্থানের আগে কেউ কিছু বলেননি, যেন বুঝতে পারছেন না। এটা দলের জন্য খুব অসুবিধাজনক। তার মানে দলের কোনো অবস্থান নেই প্রধানমন্ত্রী কী বলছেন তার ওপর। প্রধানমন্ত্রীর শূন্যতা পূরণ সম্ভব নয়। খালেদা জিয়ার অভাব পূরণও সম্ভব নয়। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বিএনপি তা বুঝেছে।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে আফসান চৌধুরী বলেন, বিএনপি তো কোনো সংগঠন নয়, এটাই হচ্ছে সমস্যা। বিএনপি সাংগঠনিকভাবে কিসের ভিত্তিতে দাঁড়াচ্ছে, শ্রেণি বিশ্লেষণ করুন। আওয়ামী লীগকে অনেকেই গালি দিয়েছেন। আমাকেও গালি দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী একক প্রচেষ্টায় হেফাজতকে সামলেছিলেন। এটা আমি বলেছি, তা ফরহাদ মজহারীয় কথা নয়। ফরহাদ মজহারও এ বিষয়ে আমকে অনেক গালি দিয়েছিলেন। তার কাছে তথ্য আসুক বা অন্য যেকোনোভাবেই হোক প্রধানমন্ত্রী বুঝতে পারছিলেন দেশের রাজনৈতিক পটভূমি পাল্টাচ্ছে।

তিনি বলেন, যখন শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন ধ্বংস হয়ে গেল, তখন সামনে এলো হেফাজত। তখন বিএনপি ভেবেছিল আওয়ামী লীগকে তারা ফেলে দিবে হেফাজতে ইসলামের মাধ্যমে। কিন্তু দেখুন কীভাবে প্রধানমন্ত্রী তখনকার পরিস্থিতি সামাল দিলেন। যখন আগুন দেওয়া হচ্ছিল বিভিন্ন জায়গায়, একটা উৎকণ্ঠায় দেশ, মানুষ। কিন্তু শেখ হাসিনা অপেক্ষা করলেন। যখন রাত হলো, অ্যাকশনে গেলেন। হেফাজতের নেতাকর্মীদের কিন্তু তিনি মারেননি, ধরেননি, অত্যাচারও করেননি। তবু তাদের ওই রাতে বিদায় করতে সমর্থ হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি হেফাজতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করলেন। আমার মতে, এটাই হচ্ছে একজন দক্ষ রাজনীতিকের পরিচয়।

তিনি আরও বলেন, গ্রামের মানুষের ধর্মীয় ভাবনা নিয়ে কাজ করেছি আমি। গবেষণা করেছি। তাদের সম্পর্কে জানি। হেফাজতকে অস্বীকার করা যায় না। বাংলাদেশের মানুষ যে খুব ধার্মিক তা নয়। সাধারণ অর্থে তারা ধার্মিক নয়। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ এ জাতীয় মানুষকে ইজ্জত করে সাধারণ গ্রামের সংস্কৃতি থেকে। শেখ হাসিনা তাদেরকে সঙ্গে নিতে পেরেছেন। এটা শেখ হাসিনার দক্ষতা। এই দক্ষতা কি আওয়ামী লীগের কোনো নেতা দেখাতে পারবেন? তারা তো অপেক্ষা করেন শেখ হাসিনা কী বলেন তার জন্য। কারণ তারা জানেন না কী বললে কী হবে। তাদের কোনো অবস্থান নেই। এসব একটা দলের জন্য দুচিন্তার বিষয় হওয়া উচিত।

বাংলাদেশের রাজনীতি অত্যন্ত তরল অবস্থায় রয়েছে। যেকোনো সময় যেকোনো কিছু ঘটছে। এ অবস্থায় আমাদের একটু সবল থাকা দরকার বলেও মনে করেন এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ