প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুতি : মূলে বঙ্গোপসাগর আর বাণিজ্য

অধ্যাপক ড. এম এ মাননান : মিয়ানমারের শুধু রাজনৈতিক ইতিহাস জানলেই রোহিঙ্গা জটিলতার সবকিছু বোঝা যাবে না। জানা দরকার এর ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ও অর্থনীতির বিয়টিও। তা হলে আসুন, পাঠক, এখন একটু তাকাই মিয়ানমারের এ গুরুত্বপূর্ণ দুটো বিষয়ের দিকে। মিয়ানমারের পশ্চিমে ভারত আর বাংলাদেশ। পূর্বে থাইল্যান্ড ও লাওস। উত্তরে চীন।

 

দক্ষিণে ১৯৩০ কিলোমিটার বিস্তৃত সমুদ্রতট; বঙ্গোপসাগর আর আন্দামান সাগরের হাতে হাত রেখে গায়ে গায়ে অবস্থান। দুর্যোগ-প্রবণ মিয়ানমারে ঝড়-ঝঞ্ঝা, বন্যা, ভূমিকম্প, ভূমিধ্বস, খরা ইত্যাদি দেশবাসীর নিত্যসঙ্গী। বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি নির্দেশক অনুযায়ী দেশটির স্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। জনগণের মধ্যে আয়-বৈষম্য পৃথিবীতে সর্বোচ্চ। অল্প কয়েক জনের হাতে কেন্দ্রিভূত প্রায় সকল সম্পদ। অর্থনীতির বৃহদাংশ সেনা-সরকার নিয়ন্ত্রিত। অর্থনীতিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ তেমন উল্লেখযোগ্য নয়।

 

মাত্র ২৮ শতাংশ লোক ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ২৬ শতাংশ লোকের অবস্থান দারিদ্র্যসীমার নিচে। ৩৭ শতাংশ লোক বেকার। অর্থনৈতিক শঙ্কট দেখা দিলে এরাই বিপর্যস্ত হয়। ব্যাংকে অর্থ জামা রাখার কোনো আগ্রহই নেই জনগণের। এ বছরের অক্টোবর পর্যন্ত দেখা গেছে, মিয়ানমারের ১০ শতাশেরও কম লোকের ব্যাংক হিসাব রয়েছে। শহর গ্রাম নির্বিশেষে সকলেই দুর্বল অবকাঠামো ও অপর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে জীবন-ধারণের মান উন্নীত করতে ব্যর্থ।

 

কয়েক বছর আগেও মিয়ানমারের পরিচিতি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতি-পরায়ণ দেশ হিসেবে। ওই সময়ে মুদ্রাস্ফীতি ৩০ শতাংশের উপরে উঠে যায়। কয়েক বছর ধরে ভারত ও চীন মিয়ানমারের সাথে অর্থনৈতিক লাভের জন্য সুসম্পর্ক স্থাপনের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগ আসছে মূলত চীন, ভারত, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও থাইল্যান্ড থেকে। মিয়ানমার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর শক্তিশালী সংস্থা এসোসিয়েশন অব সাউথ ইস্ট এশিয়ান ন্যাশান্স (আসিয়ান)-এর সদস্য। আসিয়ানে আরও রয়েছে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কম্বোডিয়া, ব্রুনাই দারুস্সালাম, লাওস ও ভিয়েতনাম।
এ তথ্যগুলো আমাদের জানা দরকার এ জন্য যে, দেশের অভ্যন্তরে হাজারো সমস্যার আবর্তে ঘুরপাক খাওয়া মিয়ানমারের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী-বিদ্বেষী সেনা প্রশাসকরা বর্তমানের মতো ভবিষ্যতেও নিজের দিকটাই দেখবে।

তারা চাইবে হতদরিদ্র দেশটাতে কীভাবে শিল্পোন্নয়ন করা যায়, কীভাবে শিল্পোন্নয়নের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা যায়, কীভাবে খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ রাখাইন রাজ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা যায়, কীভাবে বন্ধু হয়ে যাওয়া চীনের সাথে ইতোমধ্যে রাখাইন থেকে চীনের ইউনান পর্যন্ত মাটির তলা দিয়ে টেনে নেওয়া পাইপ লাইন দিয়ে বঙ্গোপসাগরের তলার গ্যাস রপ্তানি করে ফেঁপে উঠা যায়, কীভাবে চীন-ভারতসহ আসিয়ানের সমৃদ্ধ দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। এরই মধ্যে আমরা দেখেছি, আসিয়ানের কোনো দেশই রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করা কিংবা বাংলাদেশ থেকে তাদের ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারের ওপর কোনো চাপই দেয়নি; শুধু ত্রাণ সাহায্যের কথা বলেছে, বলছে। মিয়ানমার কখনো বলছে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের লোক, কখনো বলছে ফেরত নেবে না।

আবার কখনো বলছে ফেরত নিবে কিন্তু তাদের নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাই করতে হবে। যাদের নাগরিকত্বই কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের নাগরিকত্ব কীভাবে যাচাই-বাছাই হবে? সারকথা দাঁড়ায় : রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের কাগজপত্র নেই; সুতরাং তারা মিয়ানমারের নাগরিক নয়। এরা অনেকটা বাংলা ভাষায় কথা বলে এবং মুসলমান, অতএব তারা বাংলাদেশেরই নাগরিক। বাংলাদেশ কিভাবে প্রমাণ করবে এরা মিয়ানমারের নাগরিক? গভীর চিন্তার বিষয়। ভাবনা শুরু করতে হবে এখন থেকেই।

বিষয় আরও আছে। অনেক জটিলতায় আকীর্ণ বিষয়। এ জটিলতা বুঝতেই হবে বাংলাদেশের শাসকদের, রাজনীতিবিদদের, পলিসি/প্রকল্প প্রণেতাদের। প্রভাব সুদূরপ্রসারী। প্রচ্ছন্ন সা¤্রাজ্যবাদীদেও চোখ এখন জলজ আর খনিজ সম্পদে ভরা বঙ্গোপসাগরের দিকে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ ভূখ-টিও অনেক দেশের নিকট গুরুত্বপূর্ণ। কীভাবে? বঙ্গোপসাগরের দিকে শ্যান দৃষ্টি পড়েছে চীনের অনেক আগেই। বাংলাদেশের কাছে তারা প্রস্তাবও দিয়েছিল গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরি করার। বাংলাদেশ সাড়া দেয়নি।

কিন্তু মিয়ানমার প্রস্তাব পাওয়ার সাথে সাথে সাড়া দিয়েছে। নতুন বন্ধু মিলে গেল চীনের। ইতোমেধ্যে রাখাইনের মধ্য দিয়ে পাইপ দিয়ে বঙ্গোপসাগর থেকে গ্যাস নেওয়ার ব্যবস্থা তো হয়েছেই। চীন কেন এখন বাংলাদেশের দিকে সাহায্যের হাত বাড়াবে? আর চীনের মতো বন্ধু পেলে মিয়ানমার কেনই বা বাংলাদেশকে পাত্তা দিবে? এখনো পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে তেমন কোনো জোর কথা বলেনি চীন। বরং আন্তর্জাতিক পরিম-লে মিয়ানমারের পক্ষই নিয়েছে প্রকাশ্যে। বাণিজ্যকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি যে চীনের সে চীন কেন বাংলাদেশের পক্ষ নিয়ে মিয়ানমারের মতো বাণিজ্য-সখা হারাবে?

 

বিষয় আরও আছে। চীনের আরও অনেক দূরে দৃষ্টি। আফ্রিকা থেকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড হয়ে চীন পর্যন্ত ওয়ানবেল্ট হাইওয়ে যা যাবে রাখাইন রাজ্যের ওপর দিয়ে। রাখাইনে যদি মানুষ থাকে তাহলে রাস্তা, শিল্প-কারখানা ইত্যাদি হবে কিভাবে? এবং আরও আছে বিষয়। চীন তো চায় আমেরিকার সমান্তরাল ক্ষমতার বলয় তৈরি করতে এ অঞ্চলে, বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে। এ বলয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে চীন। চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট তৃতীয় মেয়াদে কয়েক দিন আগে ক্ষমতায় আসার পর তার ভাবগতিক-কথাবার্তা থেকেও তা স্পষ্ট। সবাই জানে, চীনের সাথে মিয়ানমারের গলায় গলায় ভাব, অনেকটা কাজিন-কাজিন সম্পর্ক। ভারতও কম যাচ্ছে না এ বিষয়ে। মিয়ানমার ভারতের বিশাল বিনিয়োগ ও পণ্যের বাজার। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সাথেও মিয়ানমারের কাঁধে-চুলে সম্পর্ক। আন্তর্জাতিক ক্ষমতার খেলা চলছে এ অঞ্চলে।

 

শকুনের শ্যান দৃষ্টি এ এলাকায়। আর শকুন শুধু মরা গরু খেতে ভালবাসে। তাই সাবধান না হলে বাংলাদেশ ভুগবে। রোহিঙ্গাদের দিয়ে সম্ভবত ভোগানোর যন্ত্রনা সবে মাত্র শুরু। এমনিতরো যন্ত্রণা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল ফিলিস্তিনিদের উপর অনেক বছর আগে। বৃটিশদের অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া ১৯১৭ সালের ‘বেলফোর ঘোষণা’র ফলশ্রুতিতে ইহুদি সশন্ত্র গোষ্ঠীগুলো ৩১ বছর পর ১৯৪৮ সালে সাড়ে সাত লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে তাদের প্রিয় মাতৃভূমি ত্যাগে বাধ্য করেছিল। মিয়ানমারের আগ্রাসী সেনাবাহিনী আর সশস্ত্র মগদের রোহিঙ্গা বিতাড়নের সাথে ফিলিস্তিনিদের বিতাড়নের অনেক মিল। যন্ত্রনা একই রকমের নীল। তাই রোহিঙ্গা বিষয়ক যন্ত্রনা লাঘবে মলম দিলে চলবে না, রীতিমতো এলোপ্যাথি লাগবে। এবং তা এখনই, সময় থাকতেই।

লেখক : কলামিস্ট ও শিক্ষাবিদ। এবং উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ