প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভাড়াটিয়া শিক্ষক দিয়ে চলে পড়ালেখা!

আবু তাহের ঃ সাঘাটা উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের দক্ষিন দিঘলকান্দি চরের যমুনা নদী ঘেষেই দক্ষিন দিঘলকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্কুলটিতে ৫জন শিক্ষক কাগজে কলমে রয়েছে। অথচ পাঠদানের জন্য স্কুলটিতে তিনজন ভাড়াটিয়া(প্রক্সি)শিক্ষক রাখার অভিযোগ ওঠেছে সরকারি বেতনভাতা পাওয়া শিক্ষকদের বিরুদ্ধে। ভাড়াটিয়া শিক্ষকরা লুঙ্গি পড়ে ক্লাশ নেয়। বন্যা-বৃষ্টিতে ভেঙ্গে বিদ্যালয়ের শিশুদের খেলার মাঠ খানাখন্দে ভরা। নিয়মিত জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়না। স্কুলটি চলে ভাড়াটিয়া শিক্ষকদের খেয়াল খুশি মত। স্কুল তদারকির জন্য উপজেলা প্রাথমিক সহকারি শিক্ষা অফিসারদের দেখার কথা থাকলেও তারা বছর-ছয়মাসেও স্কুল ভিজিট করেননা বলে স্থানীয় অভিভাবকদের অভিযোগ। ফলে ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পড়ালেখায় খুবই দুর্বল। এছাড়া ভাড়াটিয়া শিক্ষক দিয়ে মাসের পর বছর স্কুলের ক্লাশ চালানোর ফলে কোমলমতি শিশুরা তাদেরকেই আসল স্যার বলেই জানে।
সরেজমিনে গত ৯ নভেম্বর বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে বারোটায় দক্ষিন দিঘলকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে দুটি টিনের চৌচালা ঘর। বিদ্যালয়টিতে ৫জন শিক্ষক কাগজ কলমে থাকলেও বাস্তবে পাওয়া যায় দুজনকে। তাদের একজন প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলাম অন্যজন সহকারি শিক্ষক তানজিমা। তিনজন ভাড়াটিয়া শিক্ষক সাইদুর রহমান, মিন্টু ও রফিক মির্জা। ভাড়াটিয়া শিক্ষকদের সবাইকে লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। তানজিনাকে তৃতীয় শ্রেণির ক্লাশ ও মিন্টুকে লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায় ৫ম শ্রেণীর বিজ্ঞান পড়াতে দেখা যায়। পড়ানোর সময় তার উচ্চারনে ব্যাপক ভুল পাওয়া গেছে। বেশ কয়েকটি ক্লাশ রুম থাকলেও মাত্র একটি রুমে তৃতীয় হতে ৫ম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের বসে ক্লাশ নিতে দেখা যায়। তবে মিন্টু বলেন, ‘আমি শিক্ষক নই। আমি সরকারি স্যারদের বদলে পড়াই। এরজন্য আমাকে মাসে আড়াই হাজার টাকা করে দেন,হেড স্যার। অন্য ভাড়াটিয়া শিক্ষকরা চিনতে পারায় তারা ক্লাশ রুম থেকে বের হয়ে যায়।
৫ম শ্রেণির ছাত্র হাসান রোল নং ৮ ও লাকি আক্তার রোল ১৩ এর কাছে তাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নাম জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষকের উপস্থিতিতেই বলে, সাইদুর স্যার, রফিক স্যার, মিন্টু স্যার, বাবলু (শহিদুল)স্যার ও তানজিমা আপা। ৪র্থ শ্রেণির রোল নং ২০ শাকিল ও ১৭ রোলধারী পারভিন ভাড়টিয়া শিক্ষকদের একই নাম বলেন। তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও সকলেই ভাড়াটিয়া শিক্ষকদের তাদের আসল স্যার বলেই জানে।(ভিডিও রয়েছে)।
এসময় কয়েকজন অভিভাবক আসেন এবং প্রধান শিক্ষকের সামনেই এপ্রতিনিধিকে বলেন, ভাড়াটিয়া মাষ্টাররা পড়া (ক্লাশ) নেয় বলেই আমরা আর আমাগো পোলাপানদের (ছেলেমেয়েদের) পড়াইনা। বির অঞ্চলে (মেইনল্যান্ডে)মেছে রেখে কেজি স্কুলে পড়াই। দেখেন এই স্কুলে কয়জন ছাত্র আছে। গত দুদিন আগে (পুর্বে) এক বছর পর বড় অফিসার (উপজেলা সহকারি অফিসার)আইছিলো। হেইদিনও দুইডা মাষ্টার পাইছিলো,আজো তাই। হেরা (শিক্ষকরা) কাউরে ডরায়না (ভয়পায়না)। সরকারের হাজার হাজার টাকা বেতন খায় আর ভাড়ায় কম টাকায় কম লেখাপড়া মাষ্টার দিয়া আমগো পোলাপান পড়ায়। তাই আমাগো পোলাপান কিছুই লিখতে ও পড়তে পারেনা। তারা আরো বলেন, নদী পার হইয়া যেহানে (যেখানে)পুরুষ আইতে পারেনা, সেইহানে অফিসার টাকা (উৎকোচ)নিয়া মাইয়া মানুষ মাষ্টার দেওনের কারনে বেশি খারাপ অবস্থা। তারা বর্তমান শিক্ষা অফিসারের বদলী দাবি ও সরকারি বেতনভাতা পাওয়া শিক্ষকদের প্রতিদিন স্কুলে আসার দাবি করেন।
কিছুক্ষন পর ভাড়াটিয়া শিক্ষকরা বলেন, আপনি প্যান্ট পড়ে আইছেন দেখে ছাত্ররা ভয় করছে। এসময় পাশে বসে থাকা একজন অভিভাবক রেগে উঠে বলেন, তোমরা লুঙ্গি পড়ে স্কুলে আসো, ক্লাশ নেও দেহাইতো প্যান্ট পড়া মানুষ দেখলেই পোলাপানেরা ডরায়। সব দোষ তোমাগো।
বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কাগজ কলমে ৫ম শ্রেণিতে ২৭ জন হলেও উপস্থিতি পাওয়া যায় ১০ জন, ৪র্থ শ্রেণিতে ৪৬ জনের স্থলে উপস্থিতি ৮জন ও তৃতীয় শ্রেণীতে ৬০ জন থাকলেও উপস্থিতি পাওয়া যায় ১১জনকে। এছাড়া দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৭০জন, প্রথম শ্রেণিতে ৭০জন ও শিশু শেণিতে ৩৮জন আছে বলে প্রধান শিক্ষক জানায়। শিক্ষার্থী উপস্থিতি কম সর্ম্পকে জানতে চাইলে তিনি সদুত্তোর দেননি।

ভাড়াটিয়া শিক্ষক ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বিদ্যালয়ে পাঁচজন শিক্ষক। আমি প্রধান শিক্ষক আর সহকারি শিক্ষকরা হলেন, শফিউল্লাহ, তানজিমা, গোলেনুর ও শাহানা। আমরা সকলেই মেইনল্যান্ডে থাকি। আমাদের আসার একমাত্র বাহন নৌকা । নৌকা দিয়ে স্কুলে আসতে বেলা ১২টা বাজে। কিন্তু স্কুলতো ১০টায় । তাই তিনজন স্থানীয় ব্যক্তিকে বদলী শিক্ষক হিসেবে রেখেছি। আমরা আসার পুর্বে তারা স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের পড়ায়। আমরা তাদের মাসে আড়াই হাজার করে ভাতা দেই। ভাড়াটিয়া শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেউ আইএ পাশ। কেউ এসএসসি। আপনারা দুজন সরকারি বেতনভুক্ত শিক্ষক থাকতে ভাড়াটিয়া শিক্ষককে ক্লাশ নিতে দেখা গেলে জানতে চাইলে তিনি আর মুখ খুলতে রাজি হয়নি। তবে তিনি অভিযোগের সুরে বলেন, চরের যারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকুরি পেয়েছে শিক্ষা অফিস তাদের দিয়েছে মেইনল্যান্ডে, আর মেইনল্যান্ডের শিক্ষকদের দিয়েছে চরে। চরাঞ্চলের স্কুলে মেইনল্যান্ডের শিক্ষকরা আসতে চায়না। আপনারা এটা লেখেননা কেন। আর তাই বদলী শিক্ষক নিতে হয়।
মোবাইল ফোনে ওই প্রতিষ্ঠানের তদারকির দায়িত্বে থাকা সহকারি শিক্ষা অফিসার মামুন উর রশিদ’র সাথে কথা বললে তিনি বলেন, আমি গত কয়েকদিন পুর্বে যোগদান করেছি। এসেই ওই বিদ্যালয়ে ভিজিটে গিয়েছিলাম। আমিও দুজন শিক্ষক পেয়েছিলাম। বাকি তিনজনকে শোকজ করেছি। জানতে পেরেছি চরাঞ্চলের বিদ্যালয়ের লেখাপড়ার হালচাল। এটা দীর্ঘদিন থেকে চলছে। আপনারা সহযোগিতা করেন। সময় দেন, সব কিছু ঠিক করে ফেলবো। ভাড়াটিয়া শিক্ষক সম্পর্কে বলেন ‘বিদ্যালয়ে ভাড়াটিয়া শিক্ষক রাখার কোন বিধান নেই। বিষয়টি আমার উর্দ্ধতনকে অবগত করেছি। শোকজের জবাব পাওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
ফোনে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আজিজুল হকের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, প্রতিদিনই সহকারি শিক্ষা অফিসার চরাঞ্চলে যাচ্ছেন, কোনো সমস্যা নেই, ক্লাশ ভালো চলে। ভাড়াটিয়া শিক্ষকের কথা তিনি অস্বীকার করেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ