প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এক শয্যায় দুই রোগী

ডেস্ক রিপোর্ট :  সকাল ৮টা ৮ মিনিট। মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা হাসপাতালের ফটকে রিকশা থেকে নামতেই দেখা গেল নতুন ভবনের সিঁড়ি দিয়ে তিনজন হাসপাতালে ঢুকছেন।

তিনজনই হাসপাতালের প্রশাসন পরিচালনায় যুক্ত চিকিৎসক কর্মকর্তা। তাঁরা হলেন তত্ত্বাবধায়ক ডা. পার্থ সারথি দত্ত কাননগো, সহকারী পরিচালক ডা. মো. শাহজাহান কবীর চৌধুরী ও আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. পলাশ রায়।

হাসপাতালে ঢুকতেই দেখা গেল বহির্বিভাগে রোগীদের টিকিট কাউন্টার খোলা। মেডিক্যাল অফিসাররা সবাই এসে গেলেও তখনো কয়েকজন কনসালট্যান্ট আসেননি। সহকারী পরিচালক মোবাইল ফোনে তাঁদের খবর নিচ্ছিলেন। গত রবিবার সকাল সকাল এ ছিল হাসপাতালের চিত্র। কুয়াশা থাকায় তখনো কোনো রোগী আসেনি।

সকাল সাড়ে ৮টায় আসে দুজন রোগী। তারা টিকিট কেটে চিকিৎসক দেখাতে চলে যায়।

ধীরে ধীরে রোগী বাড়তে থাকে।

সকাল ৮টা ৪৫ মিনিট। প্রসূতি ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, একজন সেবিকা চিকিৎসাধীন রোগীদের কাছে ফাইল দিচ্ছেন। জানা গেল গাইনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রোগী দেখতে আসবেন, তাই এই প্রস্তুতি। প্রসূতি ওয়ার্ডের ৪৭ নম্বর শয্যায় দুজন রোগী দেখা গেল। একজনের কোলে বাচ্চা। আরেকজন একা। কথা হলো তাঁদের সঙ্গে। কমলগঞ্জ উপজেলার লক্ষ্মী রবিদাস (২০) জানালেন, শনিবার রাতে তিনি স্বাভাবিকভাবেই সন্তান প্রসব করেছেন। তাঁর কোলে নবজাতক মেয়ে। একই শয্যায় থাকা কুলাউড়া উপজেলার লিজা বেগম (২৭) গত শুক্রবার রাতে ব্যথা নিয়ে এসেছেন। এখন ব্যথা নেই। চিকিৎসকরা বলেছেন, তিন-চার দিন পর তাঁর সন্তান প্রসব হবে।

দুজন এক শয্যায় কেন জানতে চাইলে ওই দুই নারী বললেন, নার্সরা তাঁদের এক শয্যায় দিয়েছেন। মহিলা সেফটিক ওয়ার্ডে গিয়েও এমন চিত্র পাওয়া গেল। সাড়ে তিন ফুট প্রস্থের ২৪ নম্বর শয্যায় দুজনকে শুয়ে থাকতে দেখা গেল। জানা গেল দুজনই রোগী। একজন কুলাউড়া উপজেলার হাসিমপুর গ্রামের ছামিয়া বেগম (২৬)। অন্যজন শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালাপুর গ্রামের জলি বেগম (৩০)। একই ওয়ার্ডের ২১ নম্বর শয্যায় কুলাউড়া উপজেলার বিজয়া চা বাগানের সুপ্রভা লায়েক (২৫) ও রাজনগর উপজেলার ফরিদপুর গ্রামের রুশন বেগম (৩০)। তাঁরা সবাই ভর্তি হয়েছেন ১০ নভেম্বর।

এ বিষয়ে ওই ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত সেবিকা সুমিত মণ্ডলের কাছে জানতে চাইলে তিনি দেয়ালে লাগানো একটি নির্দেশপত্র দেখালেন। সেখানে লেখা আছে ‘যদি বিছানা খালি না থাকে তা হলে প্রতি বিছানায় দুজন করে রোগী থাকতে দিতে হবে। কোনো রোগী মেঝেতে দেওয়া যাবে না। ’

হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মো. শাহজাহান কবীর চৌধুরী বলেন, ‘মেঝেতে কোনো রোগী না রাখার জন্য সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। তাই এমনটি করতে হচ্ছে। ’

 

সেবিকা সুমিত মণ্ডল বলেন, ‘এভাবে রোগী রাখায় রোগীদের অসুবিধা হচ্ছে; আমরা ঠিকমতো সেবা দিতে পারি না। ’ সেবিকা নিয়তি রাণী দেবী বললেন, ‘প্রসূতি বিভাগের পেয়িং বেড মিলিয়ে মোট ৫০ সিট। ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৫৫ জন। এখন এক বেডে দুজনকে না দিয়ে কোনো উপায় নেই। এক বেডে দুই রোগীকে চিকিৎসা দিতে আমাদের প্রচণ্ড সমস্যা হয়। ’

প্রসূতি ওয়ার্ডে শনিবার সিজারে সন্তান প্রসব হয়েছে লাকী বেগমের। জন্মের পরই বাচ্চার অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। নবজাতককে আলাদা একটি ইউনিটে নেওয়া হয়েছে। তার অবস্থা জানার জন্য সাড়ে ৯টায় সেই ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, দরজার ওপরে লেখা ‘নবজাতকের বিশেষ পরিচর্যা কেন্দ্র’। সেখানে উপস্থিত ছিলেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. পার্থ সারথি দত্ত কাননগো। তিনি জানালেন, এই ইউনিটটি চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি চালু করা হয়েছে। ইউনিসেফের সহযোগিতায় এই ইউনিট চলছে। জন্মের পর যেসব শিশুর জটিলতা দেখা দেয় তাদের এখানে স্থানান্তর করা হয়। এখানে ০ থেকে ২৮ দিন বয়সী শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। একসঙ্গে ১৭ জন নবজাতককে এই ইউনিটে চিকিৎসা দেওয়া যায়। গতকাল ইউনিটে ছয় নবজাতক ভর্তি ছিল।

সকাল ১০টায় অর্থোপেডিক বিভাগে পাওয়া গেল জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. আবু মোহাম্মদ ইমরানকে। তিনি জানালেন, হাসপাতালের সূচি অনুযায়ী গতকাল তাঁকে অস্ত্রোপচার করতে হবে। তিনি ছয়টি অস্ত্রোপচার করবেন। কমলগঞ্জ উপজেলার শ্রীনাথপুর গ্রামের নিপা আক্তারের পিত্তথলি, কুলাউড়ার বনগ্রামের স্বপ্না বেগমের টিউমার, মৌলভীবাজারের উত্তর আটঘর গ্রামের হোসনা বেগমের অ্যাপেনডিক্সে অস্ত্রোপচার হবে। তাঁরা সবাই ২ নভেম্বর ভর্তি হয়েছে। অস্ত্রোপচার এত দিন পরে কেন জানতে চাইলে ডা. ইমরান বললেন, ‘রোগীর চাপ বেশি থাকায় রোটেশনে তাদের এই তারিখ নির্ধারিত হয়েছে। ’

সকাল ১১টায় দোতলার ডায়ালিসিস ইউনিটে গিয়ে দেখা গেল প্রথম পালায় ১০ জনের ডায়ালিসিস চলছে। দায়িত্বরত ব্রাদার সুমন দেব জানালেন, ‘দুই শিফটে ডায়ালিসিস করা হয়। ১৭টি ডায়ালিসিস মেশিন আছে। কিন্তু হাসপাতালে কেন কিডনি বিশেষজ্ঞ নেই। ডায়ালিসিসের সময় যখন কোনো রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়; তখন তাদের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হয়। মেডিসিন বিশেষজ্ঞরা কিডনি রোগীদের চিকিৎসা দেন। একজন কিডনি ডাক্তার থাকলে ভালো হতো। ’

দুপুর সাড়ে ১২টায় বহির্বিভাগে একজন জুনিয়র কনসালট্যান্টের কক্ষের সামনে প্রচণ্ড ভিড়। তিনি একের পর এক রোগী দেখছিলেন। ভিড় ঠেলে ভেতরে গিয়ে তাঁকে সাংবাদিক পরিচয় দিতেই তিনি বললেন, ‘আপনার সঙ্গে একটু একা কথা বলতে চাই। ’ তিনি উঠে বাইরে আসলেন। বললেন, ‘আমার নাম উদ্বৃত করা যাবে না। ’ তারপর তিনি জানালেন, ‘হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার রোগী দেখা হয়। কম করে হলেও ৫০০ থেকে ৬০০ রোগীকে কোনো না কোনো প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা দেওয়া হয়। কিন্তু হাসপাতালে একটি অত্যাধুনিক প্যাথলজি ল্যাব থাকার পরও সিংহভাগ বাইরের বিভিন্ন প্রাইভেট ল্যাবে চলে যায়। ’ হাসপাতালের ভেতর কিছু দালাল সক্রিয় থাকায় এমনটি হচ্ছে বলে তিনি জানান।

দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত বহির্বিভাগ ও ভর্তি হওয়া রোগী মিলিয়ে প্যাথলজি পরীক্ষা হয়েছে ৭৫ জনের, সিটি স্ক্যান ১০ জনের, এক্স-রে ৩২ জনের ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি হয়েছে ৩০ জনের।

 

এর আগে শনিবার সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে হাসপাতালের ফটকে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, কর্মচারী, চিকিৎসক এবং দু-একজন করে রোগী হাসপাতালে ঢুকছে। হাসপাতালের সামনের চত্বর পরিষ্কার করছিলেন দুজন নারী। তাঁদের কাজ তদারকি করছেন সাদিক মিয়া। তিনি জানালেন, ‘আমরা হাসপাতালের স্টাফ না। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সার্ফ ক্লিনটেক্স কম্পানি হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব পেয়েছে। আমরা আমাদের কাজ করছি। ’ হাসপাতালের সামনের বারান্দার কাছেই টয়লেটের ময়লার ট্যাংকি ফেটে পানি ছড়িয়ে আছে। উৎকট দুর্গন্ধ বেরুচ্ছে। ওই দিকে সাদিক মিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজ হাসপাতালের ভেতরে, বাইরেরটা আমরা জানি না। ’

এরপর সকাল সাড়ে ৮টায় ফার্মেসি বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, রাজগরের তেলিজুরী গ্রাম থেকে আসা রিমা আক্তার চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র নিয়ে ওষুধ সংগ্রহ করতে গেলেন। তাঁকে দিনে দুইবার করে সাত দিন দুটি ওষুধ দিয়েছেন চিকিৎসক। কিন্তু তিনি হাসপাতাল থেকে পেলেন ছয়টি করে দুই ধরনের ট্যাবলেট। তিনি জানালেন. বাকিটা বাইরের দোকান থেকে কিনতে বলা হয়েছে। বালিকান্দির রোকন আহমদের পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে ইমা আক্তার মীমকে চিকিৎসক দেখিয়ে চলে যাচ্ছিলেন। জানতে চাইলে রোকন বলেন, ‘ডাক্তার সাহেব ওষুধ লিখে দিয়েছেন। বাইরের ফার্মেসি থেকে কিনতে হবে। ’ মীমকে নিয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ডা. ইকবাল হাসানের কাছে গেলে তিনি ওষুধের তালিকা দেখিয়ে বললেন, ‘হাসপাতালে স্টকে এই ওষুধ নেই। তাই বাইরের ফার্মেসি থেকেই ওষুধগুলো কিনে নিতে হবে। ’

দুপুর ১২টায় জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. স্বপন কুমার সিংহ টেলিমেডিসিন বিভাগের মাধ্যমে (ভিডিও কনফারেন্স) রাজশাহীর তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দুজন রোগীকে স্বাস্থ্যসেবা দেন। তিনি জানান, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশে এটা নতুন সংযোজন। দেশের ৮৫টি হাসপাতালে এই সেবা চালু করা হয়েছে। প্রতিদিন দুপুর ১২টায় এই ৮৫টি হাসপাতালের চিকিৎসকরা কোনো না কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেন। আমরাও কোনো রোগীর ব্যাপারে পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করলে রোগীকে সঙ্গে নিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছ থেকে পরামর্শ নেই। ’

চিকিৎসা নিতে আসা মৌলভীবাজার সচেতন নাগরিক ফোরামের সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন মাতুক বলেন, ‘মৌলভীবাজারের এই হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা বর্তমানে অনেক ভালো হয়েছে। ডাক্তাররা ঠিক সময়ে আসছেন। রোগী দেখছেন। চিকিৎসা দিচ্ছেন। আমি এখন আমার পরিবারসহ পরিচিতজনকে সরকারি এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পরামর্শ দেই। ’

হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মো. শাহজাহান কবীর চৌধুরী বলেন, ‘বায়োমেট্রিক হাজিরা চালু করার পর ডাক্তার ও স্টাফ সবার হাজিরা প্রায় নিয়মিত হয়ে গেছেন। ডাক্তারদের হাজিরা নিয়মিত থাকায় ইনডোর ও আউটডোরে রোগীরা সেবাটা পাচ্ছে। ’ তিনি আরো বলেন, ওষুধ কম্পানির লোকদের হাসপাতালে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। হাসপাতাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও রোগীদের স্বজনরা ওয়ার্ড কেবিনগুলোতে ভিড় না করা জন্য সারা হাসপাতালে ৪৫টি সাউন্ড বক্সের মাধ্যমে আমরা হেল্পডেস্ক থেকে ঘোষণা প্রচার করছি। একসময় হাসপাতালে দালালদের দৌরাত্ম্য ছিল। উদ্যোগ নিয়ে সেটা পুরোপুরি না হলেও অনেকটা বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। ’

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. পার্থ সারথি দত্ত কাননগো বলেন, ‘ধান কাটার মৌসুম শুরু হওয়ায় গত এক সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে রোগীর চাপ কিছুটা কম। এই হাসপাতালটিকে একটি আদর্শ হাসপাতাল করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। তবে হৃদরোগের পরিপূর্ণ চিকিৎসা আমরা দিতে পারছি না আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) চালু না হওয়ায়। আমাদের চিকিৎসক স্বল্পতার কারণেও কিছু সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। ’

টয়লেটের ট্যাংকি ফেটে যাওয়ার বিষয়ে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ডা. পার্থ বলেন, ‘বিষয়টি গণপূর্ত বিভাগকে অবহিত করা হয়েছে। ’  কালের কণ্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত