প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীর্ঘ হচ্ছে নিখোঁজদের তালিকা
অন্ধকারে পুলিশ

তারেক : বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথের শিক্ষক ড. মুবাশ্বার হাসান সিজার গত তিন দিন ধরে নিখোঁজ রয়েছেন। এখন পর্যন্ত তার অবস্থান শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। সাংবাদিক উৎপল দাস নিখোঁজ রয়েছেন দীর্ঘ একমাস ধরে। তারও কোনো সন্ধান দিতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
.
একইভাবে গত কয়েক মাসে ছাত্র, শিক্ষক, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাসহ অন্তত ১০ জন রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ রয়েছেন।

এসব ঘটনায় মামলা, সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হলেও তদন্তে কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারছেন না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তাদের কী অপহরণ করা হয়েছে, নাকি স্বেচ্ছায় গা-ঢাকা দিয়েছেন কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই তুলে নিয়ে গেছেন সে বিষয়ে কেউই মুখ খুলছেন না।

পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) সহেলী ফেরদৌস পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, নিখোঁজদের খুঁজে বের করতে পুলিশ তৎপর রয়েছে। তারা কেন নিখোঁজ হচ্ছেন, তা তাদের খুঁজে বের না করা পর্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে কেউ যদি স্বেচ্ছায় গা-ঢাকা দেয় তাদের খুঁজে বের করা কঠিন হযে পড়ে।

অন্যদিকে র‌্যাব সদর দফতরের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘কেউ হঠাৎ করে নিখোঁজ হলে ঘটনা জানার পর আমরা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করি। বিভিন্ন ঘটনায় নিখোঁজদের খুঁজে বের করতে জোর তৎপরতা চালানো হচ্ছে। তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের সন্ধান পাওয়ার চেষ্টা চলছে।’

‘তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় কাউকে ফাঁসানোর জন্য অনেকে আত্মগোপন করে। আবার কেউ কেউ স্বেচ্ছায় গা-ঢাকা দেয়। সেক্ষেত্রে তাদের খুঁজে বের করাটা কঠিন হয়ে পড়ে।’

গত ৭ নভেম্বর নিখোঁজ হন রাজধানীর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুবাশ্বার হাসান সিজার। তিনি সম্প্রতি সমাজে জঙ্গিবাদের বিস্তার নিয়ে গবেষণা করছিলেন বলে জানা গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন শেষে সিজার যুক্তরাজ্য থেকে স্নাত্তকোত্তর ও অস্ট্রেলিয়ায় পিএইচডি করেন। দেশে ফিরে বছরখানেক আগে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল জোনের উপ-কমিশনার আনোয়ার হোসেন পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘আমরা তার বাসার সামনের গেটের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ, কললিস্ট, তার কর্মকাণ্ড সকল বিষয় নিয়েই তদন্ত করছি। তবে এখনও তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।’

তার আগে ১০ অক্টোবর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন সাংবাদিক উৎপল দাস। ওই ঘটনায় গত ২২ ও ২৩ অক্টোবর মতিঝিল থানায় দুটি পৃথক জিডি করা হয় তার পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষে। উৎপলের সহকর্মী ও বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন এক সপ্তাহ ধরে তার সন্ধানের দাবিতে আন্দোলন করছে।

তবে উৎপল নিখোঁজ হওয়ার দীর্ঘ একমাস পরও পুলিশ আগের মতোই দাবি করেছে, তারা উৎপলের সন্ধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওমর ফারুক জানান, পুলিশ চেষ্টা করে যাচ্ছে। তবে কবে নাগাদ উৎপলের সন্ধানের তদন্ত শেষ হবে, তা জানাতে পারেননি তিনি।

এছাড়া ২২ আগস্ট থেকে নিখোঁজ রয়েছেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও এবিএন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ সাদাত আহমেদ। বিমানবন্দর সড়কের বনানী ফ্লাইওভারের নিচে গাড়ি আটকে কিছু লোক তাকে আরেকটি মাইক্রোবাসে তুলে নেয়। ওই রাতেই ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি মামলা (মামলা নম্বর ৬) করেন তার পরিবার।

মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। এখনও সাদাতের অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি। তার মোবাইল ফোন দুটি বন্ধ থাকায় প্রযুক্তিগত তদন্তও এগিয়ে নেয়া যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, ‘নিখোঁজ সাদাতের পরিবারে নিজেদের মধ্যে ঝামেলা রয়েছে। তারা কেউই তদন্তে তেমন সাহায্য করছেন না। আমাদের ধারণা, সাদাত কোথায় আছেন তা তার পরিবারের সদস্যরা জানেন।’

এছাড়া ২৬ আগস্ট রাজধানীর গুলশান থেকে অপহরণ করা হয় বাংলাদেশি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান আরএমএম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) অনিরুদ্ধ কুমার রায়কে। তিনি বেলারুশের অনারারি কনস্যুলার।

অনিরুদ্ধ রায়ের ভাগনে কল্লোল রায় ওই ঘটনায় গুলশান থানায় একটি জিডি করেন। পরিবারের একটি সূত্র জানায়, গুলশান-১-এ নিজের গাড়িতে ওঠার সময় ৭-৮ জন লোক এসে নিজেদের একটি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য পরিচয় দিয়ে অনিরুদ্ধ কুমার রায়কে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়।

গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বকর সিদ্দিক জানান, বিকাল ৪টার দিকে গুলশান-১ থেকে অনিরুদ্ধ কুমার রায় নিখোঁজ হয়েছেন বলে জিডিতে বলা হয়েছে। আমরা এখন পর্যন্ত তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারিনি। তবে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

২৬ আগস্ট সন্ধ্যায় কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইশরাক আহম্মেদ (২০) ছুটি কাটাতে ঢাকা এসে ধানমন্ডি থেকে নিখোঁজ হন। পরে তার সন্ধান চেয়ে ধানমন্ডি থানায় জিডি করেন ইশরাকের বাবা জামাল উদ্দীন।

ইশরাক ঢাকার ম্যাপল লিফ স্কুল থেকে এ লেভেল পাস করে গত বছর কানাডার মন্ট্রিল শহরের ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। গত জুনে ছুটিতে বাড়ি আসেন তিনি। ইশরাক জঙ্গিবাদে জড়িত ছিলেন নাকি অপহৃত হয়েছেন- তা নিশ্চিত নয় র‌্যাব-পুলিশ।

পরদিন ২৭ আগস্ট রাত পৌনে ৯টার দিকে পার্টি অফিসে কাজ শেষ করে আমিন বাজারের বাসায় ফেরার উদ্দেশে রওনা হন কল্যাণ পার্টির মহাসচিব আমিনুর রহমান। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ মেলেনি। পরদিন রাতে পল্টন থানায় জিডি করা হলেও পুলিশ এখন পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান দিতে পারেনি।

গত ৭ অক্টোবর রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে তাবলিগে যাবার কথা বলে বেরিয়ে নিখোঁজ হন আরাফাত রহমান নামে এক যু্বক। তার বাবা মমিনুল হক জানান, স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে আরাফাত মোহাম্মদপুর বছিলা মডেল টাউনে থাকতেন। ৭ অক্টোবর সাভারের আমিন বাজারে তাবলিগে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়ে আর ফেরেননি। এ ঘটনায় তিনদিন পর ১০ অক্টোবর মোহাম্মদপুর থানায় একটি জিডি করা হলেও এখন পর্যন্ত তার সন্ধান মেলেনি।

গত ২৭ অক্টোবর রাতে পুরান ঢাকার সূত্রাপুর থেকে একসঙ্গে নিখোঁজ হন বাংলাদেশ জনতা পার্টির (বিজেপি) সভাপতি মিঠুন চৌধুরী ও কেন্দ্রীয় নেতা আশিক ঘোষ। ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ওই দুই নেতার স্বজনরা জানান, এ বিষয়ে সূত্রাপুর থানায় জিডি করতে চাইলেও পুলিশ তা নিচ্ছে না। তারা কোথায় আছে, তাও বলছে না।

নিখোঁজ মিঠুন চৌধুরীর স্ত্রী সুমনা চৌধুরী সীমা বলেন, তারা উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন। তার স্বামী রাজনীতি করেন। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পারে। কিন্তু আইন অনুযায়ী সে বিষয়ে তথ্য দিচ্ছে না। মিঠুন ও দলের নেতা আসিক ঘোষ কোথায় আছেন, তারা বেঁচে আছে কিনা তা জানতে চাই। পরিবর্তন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ