প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রতিহিংসার আচরণ করবো না

তারেক :  সাহস ও সততার সঙ্গে সরকারের প্রভাবমুক্ত থেকে আইন অনুযায়ী ন্যায়বিচার করার অনুরোধ করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। দেশের বিচারব্যবস্থা প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে দাবি করে ও ইতিহাসের কিংবদন্তীদের বিচারের ঘটনাগুলো তুলে ধরে তিনি এ অনুরোধ জানান। খালেদা জিয়া বলেন, তার বিরুদ্ধে বিচারাধীন এ মামলার রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হবে, বিচারকগণ স্বাধীনভাবে, বিবেকশাসিত হয়ে এবং আইনসম্মতভাবে বিচারকার্য পরিচালনা করতে সক্ষম কিনা?

ঢাকার বকশিবাজার আলীয়া মাদরাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩০৪২ ধারায় আত্মপক্ষ সমর্থন করে দেয়া ৪র্থ দিনের বক্তব্যে তিনি এসব মন্তব্য করেন। চতুর্থদিনের বক্তব্যে খালেদা জিয়া দেশে গণতন্ত্র চর্চার প্রয়োজনীয়তা, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে অতীতে রাজপথের আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য, মইন-ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বে অবৈধ সরকারের ক্ষমতাদখল, সে সরকারকে আওয়ামী লীগের সমর্থন, তিনি ও তার দুই ছেলের ওপর নির্যাতন ও সমঝোতার প্রস্তাবের বিষয়গুলো উল্লেখ করেন। সেই সঙ্গে বর্তমান সরকারের আমলে দুর্নীতি, বিরোধী দল দমন-পীড়ন, সরকারের প্রতি বিএনপির সহযোগিতার আশ্বাসসহ নানা প্রসঙ্গ তুলে ধরেন খালেদা জিয়া। এ সময় তিনি জিয়াপরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অশোভন উক্তি এবং প্রতিহিংসামূলক বৈরী আচরণকে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা ও তার প্রতি কোনো প্রতিহিংসাপ্রবণ আচরণ না করার ঘোষণা দেন।

আদালতের উদ্দেশে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, শাসক মহলের ইচ্ছা অনুযায়ী আমাদের বিরুদ্ধে কোনো একটা রায় দেয়া হবে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতে চাই, আপনি সাহস ও সততার সঙ্গে সরকারের প্রভাব মুক্ত থেকে আইন অনুযায়ী ন্যায়বিচার করবেন। আমাদের বিচারব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বাধীন দাবি করা হলেও সাম্প্রতিক বিভিন্ন উদাহরণ সেই দাবিকে প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এই স্বাধীনতার দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা বর্তমান মামলাতেও অনেকখানি বোধগম্য হবে। প্রমাণিত হবে, বিচারকগণ স্বাধীনভাবে, বিবেকশাসিত হয়ে এবং আইনসম্মতভাবে বিচারকার্য পরিচালনা করতে সক্ষম কিনা। তিনি ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, মাননীয় আদালত- আমাদের এই দেশে ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ে বিচারের নামে অবিচারের বিভিন্ন নমুনা আমরা দেখেছি। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের একজন প্রভাবশালী নির্মাতা মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান। তাকেও দুর্নীতির মামলার বিচারে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও অলি আহাদের মতো জাতীয় নেতৃবৃন্দকেও কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়েছে।

 

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে কবিতা রচনার দায়ে রাষ্ট্রদ্রোহী সাব্যস্ত করে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। মহাত্মা গান্ধী, মওলানা শওকত আলী-মোহাম্মদ আলী, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, চিত্তরঞ্জন দাস ও জওহর লাল নেহেরুর মতো নেতাদের এবং নেলসন ম্যান্ডেলা, মার্টিন লুথার কিং, বার্ট্রান্ড রাসেল ও বেনিগনো আকিনোর মতো মানুষদেরও কোনো না কোনো বিচারে আদালতের রায়ে কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়েছে। তথাকথিত সেইসব রায়ের পিছনেও কোনো না কোনো যুক্তি, অজুহাত ও আইন দেখানো হয়েছিল। হযরত ইমাম আবু হানিফা ও সক্রেটিসের মতো মহামানবদেরকেও তো বিচারের নামেই সাজা দেয়া হয়েছিল। সেই সব বিচারকে কি বিশ্ববাসী ন্যায়বিচার বলে মেনে নিয়েছে? ইতিহাসের ধোপে সেসব রায় কি টিকেছে? খালেদা জিয়া বলেন, যাদের অপরাধী সাব্যস্ত করে সাজা দেয়া হয়েছিল, বিশ্বমানবতা ও ইতিহাস তাদেরই দিয়েছে অপরিমেয় মহিমা। ইতিহাস রায় দিচ্ছে, নিরপরাধীকে অপরাধী সাব্যস্ত করে যারা রায় দিয়েছিলেন তারাই প্রকৃত অপরাধী। তাদের জন্য পারলৌকিক সাজা তো নির্ধারিত আছেই। এই পৃথিবীতেও তাদের নাম ও স্মৃতি যুগ যুগ ধরে অগণিত মানুষের ঘৃণা ও ধিক্কার কুড়াচ্ছে। এ জগৎ যতদিন থাকবে, মানুষ যতদিন থাকবে, ইতিহাস যতদিন পাঠ করা হবে এবং যতদিন মানুষের স্মৃতি থাকবে, ততদিনই তাদের প্রতি চলতে থাকবে এই ঘৃণা ও ধিক্কার।
আদালতের উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, ইতিহাসের এই সব শিক্ষা থেকে কেউ কেউ শিক্ষা নেন আবার কেউ নেন না। যারা শিক্ষা নেন মানুষ ও ইতিহাস তাদের সম্মানিত করে। আর যারা নেয় না তাদের ঠাঁই হয় ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে, আর মানুষের ঘৃণা ও ধিক্কারে। সময়ের পরিক্রমায় আজকের সময়ও এক সময় ইতিহাস হবে। আলোচ্য এ মামলাটিও নিশ্চয়ই ইতিহাসের এক মূল্যবান উপকরণ হবে। কাজেই এই পটভূমিতে আপনি ইতিহাসের শিক্ষা থেকে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করবেন কি-না, সেই সিদ্ধান্ত আপনাকেই নিতে হবে। এরজন্য আপনাকে নির্ভর করতে হবে সুবিবেচনা, প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, সাহস ও সততার ওপর। অনাগত দিন বলে দেবে, আইন ও বিবেক দ্বারা পরিচালিত হয়ে আপনি সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পেরেছিলেন কি-না।

বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, মাননীয় আদালত- আপনিও নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে একমত হবেন, মতবৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য ও সমন্বয়ই হচ্ছে গণতান্ত্রিক সমাজের সৌন্দর্য্য। ভিন্নমত দলন ও দমন নয়, প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসা নয়, বরং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানকে উৎসাহিত না করলে গণতন্ত্র টেকানো যায় না। আমরা সে কথা জানি, বুঝি এবং মানি। আপনি জানেন, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর মধ্যে ভিন্নমত ও দাবি আদায়ের পন্থা এ দেশে বারবার কতটা সহিংস হয়ে উঠেছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায়ের আন্দোলনে সহিংসতা, নৈরাজ্য, হরতাল-অবরোধ, জাতীয় অর্থনীতির ‘লাইফ লাইন’ সমুদ্রবন্দর দীর্ঘদিন বন্ধ করে রাখা, রেলস্টেশন জ্বালিয়ে দেয়া ও গান পাউডার দিয়ে আগুন ধরিয়ে চলন্ত বাসের বহু নিরপরাধ যাত্রীকে পুড়িয়ে মারাসহ নানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তুলে ধরেন খালেদা জিয়া।

 

এ ছাড়া কর্তব্যরত পুলিশের ওপর হামলা, অফিসগামীকে প্রকাশ্যে দিগম্বর করা, সচিবালয়ে হাঙ্গামা, নোংরা ছড়ানো, দীর্ঘদিন ধরে রাস্তা অবরোধ ও সিভিল প্রশাসনে বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা উসকে দেয়া এবং সশস্ত্র বাহিনীকে ক্ষমতা দখলের জন্য প্রকাশ্যে উসকানি দেয়ার প্রসঙ্গগুলো তুলে ধরেন বিএনপি চেয়ারপারসন। তিনি বলেন, ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর রাজপথে আন্দোলনের নামে যে সহিংস ও হানাহানি শুরু হয় তা আমাদের পুরো মেয়াদ জুড়ে অব্যাহত ছিল। সেই সহিংসতা থেকে পুলিশ, বিচার বিভাগ, সুপ্রিম কোর্ট, প্রধান বিচারপতির এজলাস পর্যন্ত কোনো কিছুই রেহাই পায়নি। প্রকাশ্য রাজপথে পৈশাচিক কায়দায় লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে অনেক মানুষকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে সেই ধারাবাহিক সন্ত্রাসের পরিসমাপ্তি ঘটে। হানাহানির অজুহাতে জাতীয় নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে স্থগিত করে দিয়ে তখনকার সেনাপ্রধান অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে নেয়। তার অনুগত একটি গোষ্ঠীকে নিয়ে তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা জরুরি সরকার গঠন করে। তাদের সামনে রেখে সেনাপ্রধান সবকিছু নিয়ন্ত্রণ ও নির্বাচন পিছিয়ে সেই অবৈধ শাসনকে দুই বছর পর্যন্ত প্রলম্বিত করে। বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, আপনি জানেন- আমি এই অবৈধ প্রক্রিয়াকে সমর্থন করিনি। বর্তমানে ক্ষমতাসীনরাই বিপুল উৎসাহ ও উল্লাস নিয়ে সেদিনের অবৈধদের সমর্থন করে বলেছিলেন, ওটা তাদেরই আন্দোলনের ফসল। আমি এবং শেখ হাসিনা, এই দু’জনকেই জোর করে ‘মাইনাস’ করার উদ্দেশ্যে তারা সব ধরনের তৎপরতা শুরু করে। আমাকে গৃহবন্দি করা হয়। বিদেশ সফররত শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি ও তিনি দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালত প্রাঙ্গণেই তিনি চরম অশোভন আচরণের শিকার হন।

 

বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, আমি তখন চুপ করে থাকতে পারতাম। কিন্তু অন্যায়কে আমি মেনে নিইনি। গৃহবন্দি অবস্থা থেকেই আমি শেখ হাসিনার প্রতি সেই অন্যায় আচরণের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম। বিবৃতিতে তার মুক্তি দাবি করেছিলাম।
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, মইন উদ্দিন-ফখরুদ্দীনের জরুরি সরকার সংবিধান অনুযায়ী গঠিত কোনো বৈধ সরকার ছিল না। জোর করে অস্ত্রের মুখে তারা ক্ষমতা নিয়ে প্রায় দুই বছর জরুরি অবস্থা জারি করে অবৈধভাবে ক্ষমতায় ছিল। আমি কখনো কোনোভাবে তাদের সমর্থন করতে পারিনি। তারা আমার সমর্থন চেয়েছিল। আমাকে সপরিবারে নিরাপদে দেশত্যাগ করার জন্য তারা বলেছিল। আমি তাদের কথা মানিনি। আমার নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভাবিনি। তাদের স্পষ্টভাষায় বলেছি, বাংলাদেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই। জীবনে-মরণে আমি বাংলাদেশেই থাকতে চাই। শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ সেই অবৈধ সরকারকেই সমর্থন করে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানেও সানন্দে যোগ দিয়েছিলেন। তাদের পরামর্শে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়েছিলেন। বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, সেই অবৈধ সরকার তাদেরই আন্দোলনের ফসল। তিনি তাদের সকল কাজের বৈধতা দেয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। এমনকি, আমার বড় ছেলে তারেক রহমানের দিকে ইঙ্গিত করে তাকে গ্রেপ্তারের জন্যও সেই অবৈধ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন।
বিএনপি চেয়ারম্যান ওয়ান-ইলেভেনের জরুরি সরকারের আমলে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের ঘটনাগুলো আদালতের সামনে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সে অবৈধ সরকার মিথ্যা মামলায় আমি ও আমার দুই ছেলেকে গ্রেপ্তার করেছিল। বন্দি অবস্থায় পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়ে তাদেরকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। আমার বড় ছেলে তারেক রহমান সেই নির্যাতনে পঙ্গু হয়ে এখনও বিদেশে চিকিৎসাধীন। আমার ছোট ছেলেটি আর সুস্থ স্বাভাবিক জীবন ফিরে পায়নি। বিদেশে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই অকালে আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নিয়েছে। সন্তানের অকাল মৃত্যুর দুঃসহ ব্যথা বুকে চেপে আমি দেশের ও মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আদালতের উদ্দেশে তিনি বলেন, মইন-ফখরুদ্দীনের অবৈধ সরকারের জুলুম-নির্যাতন ও স্বেচ্ছাচারী কার্যকলাপের কথা নিশ্চয়ই আপনি ভুলে যাননি। ব্যবসায়ীসহ যাকে-তাকে মিথ্যা অজুহাতে ধরে নিয়ে সে সময় তারা টাকা আদায় করতো। রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকায় জমি-বাড়ি দখলের কাজেও তারা বিভিন্ন পক্ষে প্রভাব খাটিয়েছে। আইন-আদালত ও বিচার ব্যবস্থাকে তারা তাদের নির্দেশে চালিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষক এবং সাংবাদিকদের উপর তারা নির্যাতন করেছে। এত অপকর্ম করেও তারা বিদেশে আরাম-আয়েশে দিন কাটাচ্ছে। আজ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগও দায়ের করা হয়নি।
খালেদা জিয়া বলেন, জরুরি সরকারের দোসর মাসুদউদ্দিন চৌধুরীকে দীর্ঘদিন রাষ্ট্রদূত হিসাবে বহাল রেখে লালন-পালন করা হয়েছে। এ সবের কারণ, আওয়ামী লীগ তাদের সঙ্গে আঁতাত করে ক্ষমতায় এসেছিল। ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনকে নানাভাবে প্রভাবিত করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনা নিশ্চিত করা হয়েছিল। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, আমাদের বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণে সেদিন দেশের ভেতরে-বাইরের পরিস্থিতি অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল। তারা আমার সঙ্গেও সমঝোতার চেষ্টা করেছে। নানা রকম প্রস্তাব নিয়ে আমার কাছে গেছে। আমি তাদের কোনো প্রস্তাবে রাজি হইনি। স্পষ্ট বলে দিয়েছি, অবৈধ শাসকদের সঙ্গে কোনো রকম সমঝোতা আমি করবো না। জরুরি অবস্থা তুলে দিয়ে তাদের নির্বাচন দিয়ে চলে যেতে হবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ তাদের সঙ্গে আঁতাত করেই ক্ষমতায় গিয়েছিল। তারপরও আমরা সাংবিধানিক শাসন ও গণতন্ত্রের স্বার্থে ঐ কারসাজির নির্বাচনের ফল মেনে নিয়ে সরকারকে সহযোগিতা করার কথা বলেছিলাম। কিন্তু সহযোগিতার আহ্বানের বিনিময়ে সরকার আমাদের সঙ্গে কী আচরণ করেছে তা সকলেরই জানা।
খালেদা জিয়া বলেন, প্রতিহিংসার বিপরীতে আমি বারবার সংযম, সহিষ্ণুতা ও সমঝোতার পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করে এসেছি। কিছুদিন আগেও আমি একটি সংবাদ-সম্মেলন করে অতীতের সকল তিক্ততা ভুলে ক্ষমার কথা তুলে ধরি। পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা করি, আমার এবং শহীদ জিয়াউর রহমানসহ আমার পরিবারের অন্যান্য সদস্যের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার ক্রমাগত অশোভন উক্তি এবং প্রতিহিংসামূলক বৈরী আচরণ সত্ত্বেও আমি ব্যক্তিগতভাবে তাকে ক্ষমা করে দিচ্ছি। আমি তার প্রতি কোনো প্রতিহিংসাপ্রবণ আচরণ করবো না। আমি আহ্বান জানিয়েছিলাম, আসুন, রাজনীতিতে একটি সুন্দর, শোভন ও সহিষ্ণু সংস্কৃতি গড়ে তুলি। যা গণতন্ত্রের জন্য খুবই প্রয়োজন। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে আমাদের কাছ থেকে ভালো কিছু শিখতে পারে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমঝোতার পরিবেশ গড়তে আমাদের মরহুম জাতীয় নেতৃবৃন্দকে সম্মানিত করার ব্যাপারে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হবার জন্যও আমি বিভিন্ন সময়ে প্রস্তাব দিয়েছি। এ ছাড়াও, বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজার ব্যাপারেও আমাদের প্রস্তাব সব সময় ছিল এবং এখনো আছে। ইতিমধ্যে আমি সমঝোতার মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা, জনগণের ক্ষমতা তাদের হাতে ফিরিয়ে দেয়া, সামাজিক ইনসাফ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার রূপকল্প ভিশন-২০৩০ ঘোষণা করেছি। কিন্তু উদারতার জবাব আমাদেরকে কোন ভাষায় দেয়া হচ্ছে, তার প্রমাণ সকলেই পাচ্ছেন।
বক্তব্যের এ পর্যায়ে খালেদা জিয়া, দেশে গণতন্ত্র ও বিচারহীনতা, খুন-অপহরণ,-গুম, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিরোধী নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতন, সন্ত্রাস, দখল ও দলীয়করণের বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বয়োবৃদ্ধ মানুষদের পর্যন্ত দিনের পর দিন পুলিশি রিমান্ডে নেয়া হচ্ছে। সংবাদ-মাধ্যম শৃঙ্খলিত। সম্পাদক ও সাংবাদিকরা বন্দি হচ্ছেন। ব্যাপকভাবে আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি নৃশংসভাবে খুনের বিচার হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিবেদনে পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। নারী-শিশুরা নির্যাতিত ও নিহত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ব্লগার, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও বিভিন্ন ধর্মের লোক, এমনকি বিদেশিরা খুন হচ্ছেন। সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত ও উচ্ছেদের শিকার হচ্ছে। কোথাও কারো কোনো নিরাপত্তা ও অধিকার নেই। অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে নির্বিচারে গুলি করে প্রতিবাদী মানুষদের হত্যা করা হচ্ছে। আদালতের উদ্দেশে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, এগুলো কি ক্ষমতার অপব্যবহার নয়? ক্ষমতার অপব্যবহার আমি করেছি?
আর্থিকখাতে দুর্নীতির কথা তুলে ধরে খালেদা জিয়া বলেন, শেয়ার বাজার লুট করে লক্ষ কোটি টাকার তছরূপ ও নিম্ন আয়ের মানুষ নিঃস্ব হল। ব্যাংকগুলো লুটপাট করে শেষ করে দেয়া হচ্ছে। একটি বেসরকারি সংস্থার হিসেবে গত ৭ বছরে ব্যাংক থেকে চুরি হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রী ব্যাংক লুটের হাজার হাজার কোটি টাকাকে ‘সামান্য’ বলে অভিযোগ উড়িয়ে দিচ্ছেন। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের নামে দায়মুক্তি দিয়ে সীমাহীন দুর্নীতির সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। দুর্নীতির প্রমাণিত অভিযোগের সাজা সুপ্রিম কোর্টে বহাল থাকা ব্যক্তিরাও মন্ত্রিসভায় ও সংসদে সদস্যপদে বহাল থাকছেন। পচা গম আমদানির জন্য দায়ী লোকও বহাল তবিয়তে মন্ত্রিত্ব করছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার নামে আইটি খাতে বিশাল দুর্নীতি চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকে গচ্ছিত রিজার্ভের অর্থ থেকে ৮শ’ কোটি টাকা কারসাজি করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে সম্পন্ন বিচারের নথিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রবাসীপুত্রের সন্দেহভাজন একটি অ্যাকাউন্টেই প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থের কথা এসেছে। সে ব্যাপারে কোনো উচ্চবাচ্য না করে অপ্রমাণিত অভিযোগে মামলা করে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার ও হেনস্তা করা হচ্ছে। অপপ্রচার করা হচ্ছে বিএনপির বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের গরিব মনুষের অর্থ চুষে সুইস ব্যাংকের অ্যাকাউন্টগুলোতে জমানো টাকার স্তূপ ফুলে ফেঁপে উঠছে। ২০১৫ সালে শুধু এক বছরেই এই সব অ্যাকাউন্টে বেড়েছে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ১০ বছর ধরে বিএনপি ক্ষমতায় নেই। এ দশ বছরে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘জিএফআই’-এর হিসাবে দেশ থেকে প্রায় সাড়ে চার লক্ষ কোটি টাকার বেশি বিদেশে পাচার হয়েছে। ফাঁস হওয়া পানামা পেপার্সে বিদেশে অবৈধ পথে ক্ষমতাসীনদের পাচার করা বিপুল অর্থের খবর প্রকাশিত হয়েছে। অফসোর কোম্পানিগুলোতে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। এই কেলেংকারি নিয়ে দুদক একটি মামলাও করেনি। দেশে এখন কোনো খাতই অবাধ লুটপাট থেকে মুক্ত নয়। অথচ এখনো প্রচারণা ও মামলা চলছে আমাদের বিরুদ্ধে। দেশের সম্পদ লুট করে কারা, আর মামলা দিয়ে হেনস্তা করা হয় কাদেরকে? অপপ্রচার চলে কাদের বিরুদ্ধে? আমাদের বিরুদ্ধে তো কম অপপ্রচার করা হয়নি। সারা দুনিয়ায় চষে বেড়িয়ে এবং সব তন্নতন্ন করে দেখে কয় লাখ বা কয় কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ আজ পর্যন্ত আনতে পেরেছে? অথচ তাদের বিরুদ্ধে এক-একটি ঘটনাতেই শত শত, হাজার হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ আজ সকলের মুখে মুখে।
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশে তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও প্রতিপক্ষরা কখনো সহ্য করতে পারে না। সে কারণেই শহীদ জিয়ার নাম ও তাঁর স্মৃতিবিজড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোকে টার্গেট করে ধ্বংসের চেষ্টা চলছে। শহীদ জিয়ার আদর্শের উত্তরাধিকারী হিসাবে আমাকে এবং আমার পরিবারের সদস্যদের হেয় ও হেনস্তা করার অব্যাহত চেষ্টা সম্পর্কেও সকলে ইতিমধ্যে জেনে গেছেন। সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই যে এ মামলা দায়ের করা হয়েছে তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।
এর আগে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে গতকাল সাড়ে এগারটার কিছু পরে আদালতে যান খালেদা জিয়া। আদালতের কার্যক্রম শেষ হলে দুপুর দেড়টার দিকে আদালত প্রাঙ্গণ ছেড়ে যান তিনি। গতকাল খালেদা জিয়ার পক্ষে স্থায়ী জামিনের আবেদন করেন তার আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। আর স্থায়ী জামিনের বিরোধিতা করেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল। পরে আদালতের বিচারক খালেদা জিয়ার জামিন ১৬ই নভেম্বর পর্যন্ত বর্ধিত করে ওই দিন দুই মামলার শুনানির দিন ধার্য করেন। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় গতকাল ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করে অসমাপ্ত বক্তব্য দেন খালেদা জিয়া। বক্তব্য শেষে এ মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য ১৬ই নভেম্বর দিন ধার্য করেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক মো. আখতারুজ্জামান। একই সঙ্গে আদালত জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ১৬ই নভেম্বর পর্যন্ত খালেদা জিয়ার জামিন বহাল রাখেন আদালতের বিচারক। দুই মামলার বিচারকাজ রাজধানীর বকশীবাজারে কারা অধিদপ্তরের প্যারেড গ্রাউন্ডে স্থাপিত অস্থায়ী আদালতে চলছে। এদিকে বিশেষ আদালতে খালেদা জিয়ার হাজিরা উপলক্ষে গতকাল মৎস্যভবন থেকে হাইকোর্ট হয়ে বকশীবাজার পর্যন্ত এলাকায় বিপুল উপস্থিতির মাধ্যমে শোডাউন দিয়েছে বিএনপি ও অঙ্গদলের নেতাকর্মীরা। এ সময় পুলিশ বেশ কয়েকজনকে আটক করেছে।
উৎসঃ মানবজমিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ