প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এতো নৃশংসতা, এতো নিষ্ঠুরতা, কিন্তু কেন

শুভ কিবরিয়া : আজিজা শ্রমজীবি পিতার ঘরে জন্ম নেয়া এক কিশোরী। দরিদ্র পিতার পরিবারে তার বেড়ে ওঠা। অসুস্থতা আর অভাব দু-কারণে স্কুল ছাড়তে হয়েছে তাকে। আর দশজন কিশোরীর মতোই বেড়ে উঠার কথা তার। কিন্তু হঠাৎ করে এক বিভিষিকা এলো তার সামনে। একদল মানুষ তাকে রাতের অন্ধকারে বাড়ির পাশে তুলে নিয়ে, রশি দিয়ে হাত পা বেঁধে, গাছের সঙ্গে জড়িয়ে গায়ে ঢেলে দেয় কেরোসিন। পুড়তে থাকে জীবন্ত আজিজা। এক সময় গাছের সঙ্গে থাকা রশি পুড়ে গেলে উঠে দৌড়াতে চেষ্টা করে। পারে না। দু-একজন মানুষের চোখে পড়ে তার এই করুণ দশা। স্থানীয় হাসপাতাল ঘুরে ঢাকা মেডিকেলে ঠাঁই হয় তার । কিন্তু জীবন আর বাঁচে না। দগ্ধ আজিজার প্রাণপ্রদীপ নিভে যায়।
.
হাসপাতালে আসতে আসতে আজিজা তার ঘাতকদের নাম বলে। সেই বয়ানে জানা যায় আজিজার চাচী, তার কথিত চুরি যাওয়া হারানো মোবাইল ফেরত পেতেই তাকে লোকজন দিয়ে এভাবে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। আজিজার মার ভাষ্য, ‘আজিজা বলছে তার এক ফুপু তাকে ধরে নিয়ে ওই চাচির মায়ের কাছে দেন। চাচির মা তার চোখ-মুখ, হাত-পা বেঁধে চারটা ছেলের কাছে দেয়। তারা বেলগাছের নিচে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢালার পর ডালে নামিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।’ এই বিভৎস ঘটনা সম্প্রতি ঘটেছে নরসিংদী জেলার শিবপুর থানার খনকুটে।
আজিজার বাবা সাত্তার এই ঘটনার পর আক্ষেপ করে বলেন, ‘১৪ বছরের মাইয়া। এই মাইয়াটারে চউক-মুখ বাইন্ধা কেরোসিন দিয়া পুইড়া লইসে। মানুষ কত নিষ্ঠুর, একটা মোবাইলের লাগি এমুন করল।’
এই ঘটনার পর থানায় মামলা হয়। পুলিশ প্রাথমিক তদন্ত করে এই ঘটনার আরেক ক্লু উদঘাটন করে। পুলিশের ভাষ্যমতে, আজিজার চাচি বিউটি এক অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে। যে কোনভাবে আজিজা চাচির এই অনৈতিক সম্পর্ক দেখে ফেলে। সে কারণেই আজিজাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয় তার চাচি। তার কারণেই মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগটি চাচি বানিয়েছে। তারপর আজিজাকে পুড়িয়ে মারা বন্দোবস্ত করা হয়েছে।
এই ঘটনার পুলিশি তদন্ত হয়তো আরও এগুবে। আরও সত্য হয়তো বেরুবে আদালতের জিজ্ঞাসাবাদে। আসামিরাও হয়তো ধরা পড়বে। কিন্তু এই পৈশাচিক বর্বরতার ঘটনায় প্রাণ হারানো কিশোরী আজিজা আার কোনোদিনই ফিরবে না। তার বাবা-মার সন্তান হারানোর কষ্ট কোনদিনই লাঘব হবে না।
এই ঘটনায় দুটো দিক।
এক. চাচির অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া। সেটা দেখে ফেলায় আজিজার জীবন গেল।
দুই. আজিজাকে পুড়িয়ে মারার মতো একটা বর্বর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেটা বাস্তবায়নে চাচির মাসহ আরও ক’জনের জড়িত হওয়া। একটা অপরাধ ঢাকতে সংঘবদ্ধ হয়ে আরও কজন আরেকটি বর্বর অপরাধে জড়িয়ে পড়লেন।
০২.
শামীম, কালাম বন্ধু। দুজনই শ্রমজীবী প্রান্তিক মানুষ। শামীম দরজির দোকানের কর্মি ছিলেন। পরে আখের রস বিক্রি করতেন। তার বন্ধু কালাম গ্রিল-মিস্ত্রি। কালামের প্রেমিকাকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন শামীম। কিন্তু কিছুতেই প্রেমিকার মন পাওয়া যাচ্ছে না। একমাত্র উপায় কালামকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়া। এরকম ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সহায়তা মিলল কালামের সহকর্মী স্বাধীনের। স্বাধীনের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা ধার করেছিল কালাম। ফেরত দিতে পারে নাই। ক্ষোভ ছিল স্বাধীনের।
একজনের ধার দেয়া টাকা ফেরত না পাবার ক্ষোভ। অন্যজনের প্রেমিকাকে না পাবার ক্ষোভ। দুই ক্ষোভ যুক্ত হলো খুনের অভীপ্সায়। মিরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনে কালামকে নিয়ে যায় দুই বন্ধু শামীম আর স্বাধীন। একটা ঝোপের পাশে নিয়ে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী কালামের মাথার পেছনে কোপ দিয়ে হত্যা করে তাকে। এরপর তার লাশ বস্তায় ভরে ভ্যানে করে নিয়ে আসে নিজের ঘরে। আট বছরের পুরনো বন্ধুর লাশ নিজের ঘরের চৌকির তলায় চার ফুট মাটির নিচে পুতে রাখে শামীম। এরপর নির্বিকারভাবে স্বাভাবিক দিনযাপন করতে থাকে।
নিহত কালামের পরিবার থানায় জিডি করে। পুলিশের নানামুখী তদন্ত চলতে থাকে। অবশেষে কালামের ফোনের সূত্র ধরে শামীম হত্যার এই সূত্রমুখ বের হয় ৬ মাস পর। শামীম স্বীকার করে এই খুনের ঘটনা। পুলিশের উপস্থিতিতে নিজের ঘরের চৌকির নিচের মাটি খুড়ে বের করে দেয় বন্ধু কালামের হাড়গোড়।
গোবেচারা শামীমের এই পৈশাচিক বর্বরতা দেখে অবাক তার প্রতিবেশীরা।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, অন্যের প্রেমিকাকে বাগে আনতে আর সামান্য ৫০ হাজার টাকার জন্য, কেনো এ রকম পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটাতে গেলো শামীম, স্বাধীন? এই হত্যার পর লাশ নিজের খাটের নিচে পুতে রেখে দিনের পর দিন এতো নির্বিকার থাকতেই বা পারলো কিভাবে শামীম?
০৩.
রাজবাড়ী জেলার সদর উপজেলার বানীবহ ইউনিয়নের আচদাজুনিয়া গ্রামের ওমর আলী শেখ (৫৫) একজন প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষ। ঘোড়ার গাড়ি আর ভ্যান চালিয়ে পাঁচ-ছ’জনের একটি পরিবার চালান খুব কষ্টে। প্রতি বছর ধানের মৌসুমে এই ঘোড়ার গাড়িতেই করে মাল টেনে একটা বড় আয় আসে তাদের। কাজ শেষে প্রতিদিন সন্ধ্যেতে ওমর আলী বসত বাড়ির কাছে স্থানীয় হাইস্কুলের মাঠে ঘোড়াটি বেঁধে রাখেন অন্যদের আরও কয়েকটি ঘোড়ার সাথে। এক সকালে উঠে দেখতে পান তার ঘোড়াটিকে হত্যা করেছে, দুর্বৃত্তরা। ঘোড়ার চার পা বেঁধে, মলদ্বার ও মূত্রনালিতে বাঁশের লাঠি ঢুকিয়ে নৃশংসভাবে ঘোড়াটিকে কে বা কারা হত্যা করে রেখে গেছে ওই স্কুলের মাঠে।
মলদ্বারে আর মূত্রথলিতে বাঁশের লাঠি ঢুকিয়ে এভাবে একটা প্রাণীকে হত্যা করতে পারে মানুষ! চারপাশের মানুষের বিস্ময় কাটে না। কে করলো এমন কাজ? কেনো করলো?
অনেকের ধারণা দুর্বৃত্তরা ওমর আলীকে শায়েস্তা করতে চেয়েছে ঘোড়াটিকে হত্যা করে তার জীবিকাকে খাটো করে। কিন্তু যে পৈশাচিক এবং মধ্যযুগীয় কায়দায় এই প্রাণীটিকে হত্যা করা হয়েছে তাতে বোঝা যায় ঘোড়ার হত্যাকারীরা মনোবৃত্তির দিক দিয়ে কি পরিমাণ নিষ্ঠুর এবং পৈশাচিক।
০৪.
যে তিনটি ঘটনার কথা উল্লেখ করলাম তা সবই সাম্প্রতিক ঘটনা। সংবাদপত্র বা মিডিয়ায় আলো ফেলেছে এই ঘটনাগুলো। হয়তো এরকম আরও ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে। সব হয়তো মিডিয়ায় প্রকাশিত হচ্ছে না। অনেক ঘটনাই পড়ে থাকছে নিত্যকার নানান খবরের নিচে চাপা। কিন্তু আলোচিত এই তিনটি ঘটনার মূলেই আছে এক পৈশাচিক নৃশংসতা। ঘটনাগুলো শুনলে, নির্মমতার পুরো কাহিনী জানলে গা শিউরে ওঠে। মানুষের হাতে, এতো বর্বরতা ঘটতে পারে, মানুষের মনে এতো হিংসা থাকতে পারে এসব ভাবতে অবাক লাগে। কিন্তু মানুষ এতো পৈশাচিক হয়ে উঠছে কেন?
প্রতিশোধ পরায়ণতায় এতো বর্বর হয়ে উঠছে কেন?
কোনো অভিযোগ থাকলে তা প্রচলিত রাষ্ট্র সমাজ আইন আদালতের হাতে ছেড়ে না দিয়ে, বিচারের ভার নিজেই তুলে নিচ্ছে কেন মানুষ?
০৫.
মানুষ কি তাহলে ধরে নিচ্ছে রাষ্ট্রে যে শাসন চালু আছে সেই প্রচলিত ব্যবস্থায় তার সুবিচার পাবার কোনো উপায় নাই। মানুষের ন্যায়বিচার পাবার বিশ্বাস কি পুরোটাই চলে গেছে? মানুষ কি ধরে নিয়েছে তার যে সামর্থ্য সেই শক্তিতে ভর করে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে তার সুবিচার পাবার সুযোগ নেই।
সে কারণেই যে যেভাবে পারছে বিচারটা নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে, নিজেই নিজের সমস্যার সমাধান খুঁজে নিচ্ছে! মানুষ কি ভাবছে যেসব প্রতিষ্ঠান মানুষের অধিকার রক্ষা করবে , নৈতিক নির্দেশনা দেবে, সেই প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেই নৈতিকতা হারিয়েছে।
ফলে আস্থাহীনতায়, বিশ্বাসহীনতায় মানুষ আইন নিজ হাতে তুলে নিয়ে ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরতায় ভুগছে। নিষ্ঠুরতম আচরণ করতেও পিছপা হচ্ছে না। এসব সংকটের উত্তর হয়তো পাওয়া যাবে আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রনৈতিক আচরণে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির যে দীর্ঘ রাষ্ট্রাচারে আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি হয়তো সেগুলোই এই নৃশংসতার কারণ।
কিংবা দিন দিন সুশাসন উঠে যাচ্ছে বলে, আয় ও ব্যয়ের ফারাক বাড়ছে বলে, ধন ও শক্তি বৈষম্য বাড়ছে বলে মানুষ এই চাপ সইতে পারছে না, হয়ে উঠছে আত্মঘাতি। হয়ে উঠছে নিপীড়ক। এসবও হয়তো এই সামাজিক ভ্রষ্টাচারের কারণ।
শুভ কিবরিয়া: সাংবাদিক, কলামিস্ট; নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক।
[email protected]। পরিবর্তন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ