প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সৌদি প্রায়শ্চিত্য : দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভবিষ্যত বাদশাহ’র জিহাদের মূল কারণ

রাশিদ রিয়াজ : সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান পরিস্কারভাবে তার সংস্কারের পথে চলার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য অভিযুক্তদের সাফ করছেন। উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি তিনি দুর্নীতি দমন কমিটির নেতৃত্ব দেওয়া শুরু করলেই কয়েক ডজন প্রিন্স, ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, মন্ত্রীদের গ্রেফতার করা হয়। এদের মধ্যে কোটিপতি ব্যবসায়ী ও প্রিন্স আলওয়ালিদ বিন তালাল বিশ্বে শুধু একজন শীর্ষ ধনী নন একই সঙ্গে সৌদি বিনিয়োগকারী হিসেবে একটি প্রতীক।

প্রিন্স আলওয়ালিদ সৌদি বাদশাহ সালমানের ভাগ্নে এবং বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান কিংডম হোল্ডিংএর মালিক, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান সিটিগ্রুপ ও টুইটারে বিনিয়োগকারী। ক্রাউন প্রিন্স সালমানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের আড়ালে দেশটির ন্যাশনাল গার্ড প্রধান প্রিন্স মিতেব বিন আব্দুল্লাহকে আটক করে তার স্থলে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে প্রিন্স খালেদ বিন আয়াফকে। প্রিন্স আলওয়ালিদ বিন তালালের বিরুদ্ধে মুদ্রা পাচার, উৎকোচ প্রদান ও কর্মকর্তাদের ওপর জোর জবরদস্তি করার অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রিন্স মিতেব বিন আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, কর্মচারি নিয়োগ, নিজের প্রতিষ্ঠানকে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাজ পাইয়ে দেওয়া ছাড়াও বুলেটপ্রুফ মিলিটারি গিয়ার সহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহে ঘাপলার অভিযোগ আনা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ কোনো তদন্ত বা স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হয়নি। একটি দুর্নীত দমন কমিটি গঠন করেই এধরনের বিশুদ্ধি অভিযানে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন ৩২ বছর বয়স্ক ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান যিনি ৩ বছর আগে থেকে সৌদি রাজতন্ত্রের ক্ষমতায় কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে থাকেন। দুর্নীতি দমন কমিটিকে বিপুল ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যাতে এ কমিটি তদন্ত ছাড়াও কাউকে গ্রেফতার ও কারো ভ্রমণের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে। সৌদি রাজকীয় ফরমানে বলা হয়েছে দুর্নীতির মূলৎপাটন না হলে এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে সৌদি আরবের অস্তিত্ব হুমকিতে পড়বে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তত ১১ জন প্রিন্স, বর্তমান ও সাবেক মন্ত্রী, প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারের মধ্যে দিয়ে বর্তমান ক্রাউন প্রিন্স তারচেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের নির্মূলের মাধ্যমে বিশ্বের শীর্ষ তেল রফতানি নিয়ন্ত্রক হতে চাচ্ছেন। গত জুনে তিনি এক প্রাসাদ অভ্যুত্থানে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও চাচাতভাই মোহাম্মদ বিন নায়েফকে ক্রাউন প্রিন্সের পদ থেকে সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হন। বাদশাহ সালমান তার এই প্রিয় পুত্রকে ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে ঘোষণা করেন। আর এবার সৌদি রাজতন্ত্রে উপজাতিগুলোর মধ্যে অপরিহার্য ক্ষমতাধর প্রিন্স মিতেবকে অপসারণ করলেন।

গত কয়েক বছরে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান আদতেই সৌদি শাহীর সামরিক, পররাষ্ট্র, আর্থসামাজিক বিষয়াদির মূল সিদ্ধান্তগ্রহণকারী ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। উল্কা ঝড়ের মত তার এই নাটকীয় উত্থান রাজতন্ত্রের অন্যান্য ক্ষমতাধর কলাকুশলীরা স্বাভাবিকভাবে নেননি।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে এ জিহাদে সৌদি স্টক একচেঞ্জের লেনদেনে হোঁচট খেলেও দীর্ঘমেয়াদে এধরনের সংস্কার সহায়ক হয়ে উঠবে বলে বিনিয়োগকারীরা আশা করলে বাজার ফের ঘুরে দাঁড়ায়। রাজকীয় ফরমানে আরো বলা হচ্ছে, সৌদি জনগণের স্বার্থ জলাঞ্জলী দিয়ে যারা নিজেদের ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করছে এবং এভাবে অবৈধ অর্থ সম্পদের পাহাড় গড়েছে তাদের বিরুদ্ধেই অভিযান চলছে।

অথচ সৌদি আরবে জনগণের অর্জিত আয় ও সরকারি তহবিলের বিপরীতে রাজতন্ত্রের ক্রীড়নক বা প্রভাবশালী প্রিন্সদের আয়ের উৎস সবসময় অজানা থাকে। এমন এক রাজতন্ত্র যাকে বলা হয় ইসলামী ব্যবস্থার দ্বারা উৎসারিত কিংবা অনুশাসিত কিন্তু কখনো তা পদ্ধতিগতভাবে লিপিবদ্ধ নেই এমনকি নির্বাচিত কোনো কার্যকর সংসদ নেই।

উইকিলিকস’এর এক তথ্যে জানা যায় সৌদি রাজকীয় পরিবারের ব্যক্তিরা প্রচুর ও বিরাট অংকের মাসিক ভাতা পেয়ে থাকেন। অর্থ আয়ের জন্যে বিবিধ প্রক্রিয়া বা প্রকল্পের অভাব নেই তাদের জন্যে। সৌদি অথবা বিশ্বের ব্যয়বহুল যে কোনো স্থানে অকল্পিত বিলাসবহুল জীবন যাপনে এরা অভ্যস্ত। সন্দেহ নেই এধরনের জীবনযাপন পদ্ধতি সৌদি তরুণদের বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল এবং এক অবধারিত সংস্কার অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। কিন্তু তা যদি হয় মোহাম্মদ বিন সালমানের ক্ষমতাকে আরো কুক্ষিগত করা এবং একচ্ছত্র সিংহাসনের মালিক বনে যাওয়ার মত ব্যাপার তাহলে তা রাজতন্ত্রের ঐতিহ্য ও ঐক্যমতের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া অন্যান্য ব্যক্তি কিছুতেই মেনে নেবেন না।

গত সেপ্টেম্বরে বাদশাহ সালমান সৌদি নারীদের ওপর থেকে গাড়ি চালানোর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান চান এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে রক্ষণশীল মনোভাব থেকে তার দেশকে উদার পথে নিয়ে যেতে। বিনোদন ও বিদেশি পর্যটক বৃদ্ধি ছাড়াও অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়ে উঠবে বলে সকলেই আশা করছেন। একই সঙ্গে ক্রাউন প্রিন্স চাচ্ছেন সাশ্রয়। বড় ধরনের সরকারি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বাজারে ছাড়তে। সৌদির শীর্ষ তেল প্রতিষ্ঠান আরামকোর আইপিও নিউ ইয়র্ক স্টক একচেঞ্জে ছাড়া হচ্ছে।

প্রিন্স মোহাম্মদ প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই গত দুই বছর ধরে ইয়েমেনে জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়াই সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছেন। বলা হচ্ছে ইরান সমর্থিত জোটের বিরুদ্ধে লড়াই চলছে। নিন্দুকেরা বলছেন, ক্রাউন প্রিন্স দুঃসাহসিক ও বিপজ্জনক কাজ করছেন। সর্বশেষ তার অভিযানকে সিঙ্গাপুরের এস রাজারাতনাম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিসের সিনিয়র ফেলো জেমস ডরসে সৌদি রাজতন্ত্রের ঐতিহ্যবাহী বোঝাপড়ার সমাপ্তি বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ক্রাউন প্রিন্স ক্ষমতাসীন রাজপরিবার,সামরিক বাহিনী, ন্যাশনাল গার্ডে ব্যাপক সংস্কার করতে শুরু করেছেন। ইয়েমেনের যুদ্ধে আরো আগ্রাসী হওয়ার জন্যেও তিনি এসব করছেন।

বিশ্লেষক জোসেফ কেচিচিয়ান বলেন , আল-সৌদ রাজবংশের স্বার্থ রক্ষায় সবকিছু করা হচ্ছে। মনে হচ্ছে শাসনব্যবস্থার আধুনিকিকরণ ও ২০৩০ ভিশন বাস্তবায়নে এসব অভিযান চলছে।

রিয়াদের সাবেক গভর্নর প্রিন্স তুর্কি বিন আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে রিয়াদ মেট্রো প্রকল্পে দুর্নীতি ও তার প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুযোগ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। সাবেক অর্থমন্ত্রী ইব্রাহিম আল-আসাফ যিনি জাতীয় তেল প্রতিষ্ঠান আরামকো’র বোর্ড সদস্য তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে মক্কায় কাবশরীফ সম্প্রসারণ প্রকল্পে দুর্নীতি ও জমি ক্রয়ে ঘাপলার। ক্রাউন প্রিন্সে মোহাম্মদ সালমানের জন্যে যিনি সংস্কারের রুপরেখা প্রণয়ন করেছেন সেই বরখাস্তকৃত অর্থমন্ত্রী আদেল ফাকিহ বাদ যাননি। গ্রেফতার করা হয়েছে বাদশাহ আব্দুল্লাহর রয়াল কোর্টের প্রধান খালিদ আল-তুওয়াইজিরিকেও।

এধরনের গ্রেফতার অভিযানকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ অভিহিত করেছেন, ‘দি নাইট অব দি লং নাইভস’ বা ১৯৪৩ সালে জার্মানিতে নাজি সরকারে রাজনীতিবিদদের ওপর নির্যাতনের সাথে। সৌদি বিনলাদেন কনস্ট্রাকশন গ্রুপের চেয়ারম্যান বকর বিন লাদেন ও ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের টেলিভিশনের কর্মকর্তা আলওয়ালিদ আল-ইব্রাহিমকেও আটক করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের রাখা হয়েছে রিৎজ-কার্লটন হোটেলে। বলা হচ্ছে নিরাপত্তার খাতিরে হোটেলটি বন্ধ রাখা হয়েছে। এই হোটেলেই ১০দিন আগে এক আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলনে গ্রেফতারকৃতরা যোগ দিয়েছিলেন যাদের এখন সেখানে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

গত সেপ্টেম্বরে আরেক দমন অভিযানে অন্তত ৩০ জন বিরোধী মতালম্বী, ধর্মীয় নেতা, চিন্তাবিদ ও মানবাধিকার কর্মীকে আটক করা হয়। প্রিন্স আলওয়ালিদ বিন তালাল ২০১৫ সালে এক টুইটার বার্তায় তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আমেরিকার জন্যে লাঞ্ছনাকারী হিসেবে অভিহিত করে তাকে প্রার্থী হিসেবে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিলেন।এর জবাবে ট্রাম্প আরেক টুইট বার্তায় বলেন, নির্বোধ প্রিন্স আলওয়ালিদ বিন তালাল মার্কিন রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছেন তার বাবার টাকায়। আমি নির্বাচিত হলে তা তিনি করতে পারবেন না। প্রিন্স আলওয়ালিল বিন তালালের পিতা প্রিন্স তালাল ছিলেন আল সৌদ পরিবারের অন্যতম সংস্কারবাদী ও কয়েক দশক আগেই তিনি চেয়েছিলেন সৌদি আরবে একটি সাংবিধানিক সরকার গঠন করতে। হারতেজ থেকে অনুবাদ

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ