প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

একটি শোক মিছিলের কথা

রাহাত মিনহাজ : উপমহাদেশ ইতিহাসে মিছিল বা শোক মিছিল নতুন কিছু নয়। গত শতাব্দীর ২০ ও ৩০ এর দশকে মহাত্মা গান্ধির অধীনে যেমন হরতাল পালিত হয়েছে, ঠিক তেমনি একসাথে চলেছে মিছিল। বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহে হয়েছে শোক মিছিল, আবার কখনো কখনো এ রকম মিছিল থেকে সহিংস বিক্ষোভে ঘটনাও ঘটেছে। বাংলাদেশে এখনো মিছিল নিত্য দিনের ঘটনা। শোক মিছিলও দেখা যায় মাঝে মাঝে। আমরা আজ কথা বলতে চাই এমনই একটি শোক মিছিল নিয়ে। যা খুবই আবেগময় একই সাথে ঐতিহাসিকও বটে।
১৫ আগাস্টের পর বাংলাদেশের গণমাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন নির্বাসিত। ১৭ আগস্ট শুধু তার দাফনের খবর প্রকাশিত হয়েছিল অত্যন্ত ছোট পরিসরে। এরপর টানা আড়াই মাস গণমাধ্যমে শেখ মুজিবের নাম ছিল একেবারেই নিষিদ্ধ। আর বঙ্গবন্ধু শব্দের ব্যবহার সুদূর পরাহত কোনো কল্পনা। যাই হোক ১৫ আগস্টের হত্যাযজ্ঞের পর শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে প্রথম খবর, বলা যায় প্রথম শোক প্রকাশের খবর প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালের ৫ নভেম্বর। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের পর ৪ নভেম্বর একটি শোক র‌্যালি হয়েছিল ঢাকা শহরে। সেই মিছিলকে নিয়েই সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল পত্র পত্রিকায়।
ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, ঐ শোক মিছিলের আয়োজন করেছিল জাতীয় ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন। বাকশাল গঠনের সময় ছাত্রলীগ ভেঙে জাতীয় ছাত্রলীগ গঠন করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। গঠিত হয়েছিল ২১ সদস্যের একটি কোর কমিটি। জানা যায়, ঐ কোর কমিটিই এই মিছিলের আয়োজন করে। ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দও। যাতে শুধু তারাই নন যোগ দেন নগরীর অগণিত নারী-পুরুষ। এছাড়া এই শোক মিছিলে আরও ছিলেন ৩ নভেম্বর অভ্যুত্থানকারী খালেদ মোশাররফের মা ও ভাই। এ মিছিলটি সম্পর্কে কবি নির্মেলেন্দু গুণ তার ‘রক্ত ঝরা নভেম্বর ১৯৭৫’ গ্রন্থে লিখেছেন, (পৃষ্ঠা ১৬) ‘জানলাম মিছিলটি বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ফুল দিয়ে এসেছে। এটি একটি মস্ত বড় ঘটনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মিছিলটির আয়োজন করেছে। বাংলাদেশ ছাত্র লীগ ও বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সমন্বয়ে গঠিত সংগ্রামী ছাত্র সমাজ বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি দিবস পালনের জন্য ঐ মিছিলটির আয়োজন করেছিল। ঐ মিছিলে ছিলেন সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন আহমদ, সংসদ সদস্য শামসুদ্দিন মোল্লা, সংসদ সদস্য রাশেদ মোশাররফ, মরহুম খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, জনাব মোহাম্মদ মহসীন মন্টু, বেগম মতিয়া চৌধুরী, জনাব সাইফুদ্দিন আহমদ মানিক, জনাব মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, জনাব ইসমত কাদির গামা, খালেদ মোশাররফের বৃদ্ধা মাতা প্রমুখ।’
চার নভেম্বরের এই মিছিলটির খবর গুরুত্ব সহকারে পরের দিন জাতীয় দৈনিকগুলোয় প্রকাশিত হয়। আবার পত্রিকার পাতায় লেখা হয় বঙ্গবন্ধ শব্দটি ইত্তেফাক ছাপে ‘শহরে মৌন মিছিল’ শিরোনামের খবর। দৈনিক বাংলার শিরোনাম, ‘ছাত্রদের মৌন মিছিল: বঙ্গবন্ধু রুহের মাগফেরাত কামনা’ দুটি ইংরেজি পত্রিকা খবর প্রকাশ করে ‘ঐড়সধমব ঢ়ধরফ ঃড় ইধহমধনধহফযঁ’ ও ‘ঐড়সবধমব ঃড় সঁলরন’.

দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত ‘ছাত্রদের মৌন মিছিল: বঙ্গবন্ধু রুহের মাগফেরাত কামনা’ শিরোনামের সংবাদের বর্ণনা ছিল এরকম ‘মঙ্গলবার বেলা সাড়ে দশটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে ছাত্রদের একটি মৌন মিছিল বের করা হয় এবং ১১টা ১৫ মিনিটে মিছিলকারীরা ধানমন্ডির বত্রিশ নাম্বার সড়কে উপস্থিত হয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শ্রদ্ধা ও রুহের মাগফেরাত কামনা করেন। মিছিলটির পুরোভাগে বঙ্গবন্ধুর বিশাল একটি প্রতিকৃতি ছিল। মিছিলে বিপুল সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী ও মহিলারা যোগ দেন। বটতলা থেকে বঙ্গবন্ধুর বাসভবন অভিমুখী এই মিছিল নীলক্ষেত সড়ক ও নিউ মার্কেট হয়ে সুশৃঙ্খলভাবে পথ অতিক্রম করে। বত্রিশ নম্বর বাসভবনে পৌঁছে ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ গেটে বঙ্গবন্ধবুর শেখ রহমানের শেখ চারটি প্রতিকৃতি লাগিয়ে দেন এবং এর উপর পুষ্পমাল্য ও ফুল ছিটিয়ে দেন। তারা বঙ্গবন্ধুর রুহের মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত করেন। পরে মিছিলটি আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ফিরে এসে শেষ হয়। বিকালে শহীদ মিনারে এক ছাত্র জমায়েত হয়। জমায়েত শেষে মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি পুরান হাইকোর্ট ও প্রেসক্লাব হয়ে বায়তুল মোকাররমে গিয়ে শেষ হয়।’

লেখক : প্রভাষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
সম্পাদনা : আশিক রহমান ও মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ