প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘অনুমতির ঘেরাটোপেই’ বন্দি বিএনপির আন্দোলন

মামুন : প্রশাসনের অনুমতির ঘেরাটোপেই বন্দি হয়ে পড়েছে বিএনপির আন্দোলন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচনের পরের বছর ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে প্রায় ৩ মাস ধারাবাহিক অবরোধ কর্মসূচি ছাড়া এখন পর্যন্ত তেমন কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারছে না দলটি। দশম নির্বাচনের প্রথম বর্ষপূর্তির দিনটিকে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করার জন্য রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, মতিঝিলের শাপলা চত্বর কিংবা নিদেনপক্ষে নয়াপল্টন দলীয় কার্যালয়ের সামনে জনসভার অনুমতি না পাওয়ায় গুলশান কার্যালয়ে পুলিশের ঘেরাওয়ের মুখেই ওই কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন খালেদা জিয়া। বেশ কয়েকবার সরকার পরিচালনাকারী বৃহৎ এই রাজনৈতিক দলটি এরপর থেকেই নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ও গুলশানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন, ইনডোর আলোচনা সভা, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম থাকতে হচ্ছে দলটিকে। প্রশাসনের অনুমতির বাইরে কোনো কার্যক্রমই করতে পারছে না।
এদিকে ৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে ৮ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার অনুমতি দেয়নি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। গতকাল সোমবার দুপুরে দলটির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি জানিয়েছেন, ৮ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ অনুমতির বিষয়ে চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আবুল খায়ের ভূঁইয়াকে নিয়ে আজ (সোমবার) ডিএমপিতে গিয়েছিলাম। ডিএমপি থেকে বলা হয়েছে, একই দিনে দুটি রাজনৈতিক দল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার অনুমতি চেয়েছে। এ ছাড়া আগারগাঁওয়ে কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের (সিপিএ) সম্মেলন চলছে। তাই নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে কোনো দলকেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের অনুমতি দেয়া হবে না।
সাবেক এ ছাত্রনেতা আরো জানান, ডিএমপি থেকে আমাদের বলা হয়েছে, ৯ নভেম্বর সিপিএ সম্মেলন শেষ হলে বিএনপি যদি পুনরায় সমাবেশের অনুমতি চায় তাহলে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। এ ছাড়া ৭ নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে সংসদ ভবনের পাশে চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়াউর রহমানের সমাধিতে সীমিত সংখ্যক নেতাকর্মী নিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে ডিএমপি থেকে বলা হয়েছে বলেও জানান শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি।
এ প্রেক্ষিতে বিএনপি তার এ সমাবেশের তারিখ পরিবর্তন করে ১১ নভেম্বর ধার্য করেছে। দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নয়াপল্টনে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ‘সিপিএ সভা চলার কারণে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিতব্য আমাদের কর্মসূচি পিছিয়ে ১১ নভেম্বর ২০১৭ শনিবার ধার্য করা হয়েছে। সেদিন রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপির উদ্যোগে জনসভা অনুষ্ঠিত হবে।
গেল বছরের ৭ নভেম্বরের কর্মসূচি পালনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অনুমতির জন্য বারবার তারিখ পরিবর্তন করেও তা পায়নি বিএনপি। প্রশাসন দলটিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বদলে সমাবেশ করার অনুমতি দিয়েছিল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে।
বিএনপি অফিস সূত্রে জানা যায়, প্রথমে ৮ ও ৯ নভেম্বর এবং দ্বিতীয়বার ১৩ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বরাদ্দের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে চিঠি দিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু ওই উদ্যান বরাদ্দ না দিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অবশেষে ২৭ শর্ত আরোপ করে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তন ব্যবহারের অনুমতি দেয়। ওই ২৭ শর্তের অন্যতম ছিল, সমাবেশে সরকারবিরোধী বক্তৃতা দেয়া যাবে না। পরে অবশ্য বিএনপি সেখানে সমাবেশ করেনি বলে জানান দলের সহ-দফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু।
ঢাকার নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দফতর বিভাগ এবং বিএনপি চেয়ারপার্সনের প্রেস উইংয়ের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৪ এপ্রিল দলের কেন্দ্রীয় ৫১ নেতার নেতৃত্বে গঠিত ৫১টি সাংগঠনিক কমিটি সারাদেশে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারে সভা সমাবেশ, উঠান বৈঠক করে। এসব সভা সমাবেশের কোথাও প্রশাসনের অনুমতি ছিল, কোথাও ছিল না। যেসব স্থানে প্রশাসনের অনুমতি ছিল সেসব স্থানে বিএনপি সমাবেশ করতে পেরেছে। অনুমতিবিহীন কোথাও সমাবেশ করতে পারেনি। এমনকি অনেক স্থানে ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের’ হামলায় নিজেদের কার্যালয়ে জড়ো হওয়ার পরও সমাবেশ করতে পারেনি বলে অভিযোগ করেছেন তারা। সর্বশেষ কেন্দ্রীয়ভাবে ২০১৬ সালের ১ মে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শ্রমিক সমাবেশের অনুমতি পেয়েছিল তারা। এতে খালেদা জিয়া প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তৃতা রেখেছিলেন।
এর আগে ওই বছরের ৫ জানুয়ারি দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জনসভার অনুমতি দিয়েছিল পুলিশ। তারপরও ১৯টি শর্তের বিনিময়ে সমাবেশের অনুমতি পেয়েছিল তারা। তাদের দাবি, এরপর থেকে আজ পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বা নয়াপল্টনে জনসভা করতে পারেনি দলটি। এর আগে ২০১৪ সালের ২০ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দীতে জনসভার অনুমতি পায় বিএনপি। এর কয়েক মাস আগে ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচন ‘বর্জন’ করায় জনগণকে ‘অভিনন্দন ও ধন্যবাদ’ জানাতে এ সমাবেশ করেছিল দলটি।
২০১৬ বছরের ১৯ মার্চে তাদের জাতীয় কাউন্সিলের ভেন্যু হিসেবে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের পাশাপাশি বিএনপি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একটি অংশ ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছিল।
এরপর ২০১৫ সালের ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় র‌্যালি, ২০১৬ সালের স্বাধীনতা দিবসের র‌্যালি, একই বছরের ৩০ আগস্ট বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর র‌্যালি, পরের বছর গণতন্ত্র হত্যা দিবস উপলক্ষে ৭ জানুয়ারির সমাবেশ, একই বছরের ২৪ মে খালেদা জিয়ার গুলশান অফিস তল্লাশির প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে কর্মসূচি পালন করতে সোহরওয়ার্দী উদ্যান ব্যবহারের অনুমতি পায়নি দলটি।
অন্যদিকে প্রতি বছর ৭ নভেম্বরে বিপ্লব ও সংহতি কর্মসূচি পালন করে আসছে বিএনপি। তবে দলটির অভিযোগ, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এখন পর্যন্ত ওই কর্মসূচি পালন করার জন্য সোহরাওয়ার্দী কিংবা অন্য কোনো স্থানের অনুমতি পায়নি।
এ প্রসঙ্গে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করেন, অনেকদিন ধরেই আমাদের কোনো সমাবেশ জনসভার অনুমতি দেয়া হচ্ছে না। গণতন্ত্র চর্চাকে এভাবেই পুলিশি অনুমতি নির্ভর করা হয়েছে। দুঃশাসনের যে আদর্শ রাষ্ট্র- সেটিই এখন বাংলাদেশ।
এ ব্যাপারে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, রাজনৈতিক সভা সমাবেশের অনুমতির বিষয়টি শুধুই পুলিশ বিভাগের বিষয় নয়, বরং পুলিশের অনুমতি দেয়ার বিষয়টি নির্ভর করে সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।
তিনি বলেন, পাবলিক মিটিং যে কোনো নাগরিকের অধিকার। অনুমতি না দেয়া বা বাধা দেয়া আমার কাছে ভালো ঠেকছে না। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া, এটা পুলিশের সিদ্ধান্তের বিষয় হতে পারে না। এদিকে প্রশাসনের অনুমতির বাইরে মাঠে কোনো ধরনের কর্মসূচি পালন করতে না পারায় দলটির শুভানুধ্যায়ীরা সমালোচনা মুখর হয়ে উঠেছেন। ‘সরকারের দমনপীড়নের ভয়ে’ মাঠে কোনো কর্মসূচি পালন করতে না পারায় বিএনপির মতো একটি বৃহৎ দলের সাংগঠনিক কর্মক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
এ প্রসঙ্গে ২ নভেম্বর রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক আলোচনা সভায় চারদলীয় জোট সরকারের সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা মাহমুদুর রহমান আলোচনা-সংলাপ বাদ দিয়ে রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছেন। এতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আপনারা এসব ঝেরে ফেলে দেন, এসব ভোট-টোট বাদ দেন, এসব আলোচনা বাদ দেন, ইলেকশন কমিশনে গিয়ে ধরনা দেয়া বাদ দেন। আপনারা গণঅভ্যুত্থানের জন্য রাস্তায় নামুন, তাহলে মুক্তি আসবে; অন্যথায় কোনো মুক্তি আসবে না।
২০ অক্টোবর ভাষা সৈনিক অলি আহাদের স্মরণ সভায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিএনপির সমালোচনা করে বলেন, খালেদা জিয়া সাহসী ও ভালো কাজ করেন। কিন্তু সেটা দেরিতে করেন। আর এই কারণেই আন্দোলন গড়ে ওঠে না। অলি আহাদ-ভাষা মতিনরা আন্দোলন সংগ্রাম বুঝতেন। তাদের প্রদর্শিত পথেই আন্দোলন গতে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা মাঠে আন্দোলন গড়ে না ওঠার পেছনে কারণ হিসেবে মনে করছে বিএনপি। জুন মাসে ৫১ কমিটির পৃথক পৃথক রিপোর্টে তৃণমূল নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলায় মাঠের কর্মসূচিসহ দলের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। তারা এতে বলেন, এসব মামলার অধিকাংশই ২০০৭ সালে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের। বাকিগুলো আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত এবং বর্তমান আমলে করা। এগুলোর বেশিরভাগই ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালের। খালেদা জিয়া তার জিয়া দাতব্য মামলায় আদালতে আত্মজবানীতে বলেছেন, দলের কেন্দ্রীয় নেতাসহ তৃণমূলের প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ২৫ হাজার মামলা রয়েছে। দলের প্রায় ৭৫ হাজার নেতাকর্মী বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ করার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, এসব মামলা থাকার কারণে নেতাকর্মীরা দলীয় কাজে অংশগ্রহণ করতে পারছেন না। এতে দলের স্বাভাবিক কার্যক্রম বিঘœ হচ্ছে।
শুভানুধ্যায়ীদের এসব সমালোচনার প্রেক্ষিতে বিএনপি ধীরে ধীরে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। ২৩ অক্টোবর বিএনপির যে স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয় তাতে বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাধা দিলে তা উপেক্ষা করে কর্মসূচি পালন করারও তাগাদা দেয়া হয়েছে বৈঠকে।
এ ব্যাপারে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ অভিযোগ করেন, ‘জনগণের ভয়ে’ সরকার বিএনপিকে সভা-সমাবেশ করতে দিচ্ছে না। বিগত দুই বছর কোনো আন্দোলন হয়নি। তবে সামনে নির্বাচন। তত্ত্বাবধায়কের দাবি আদায়ে প্রয়োজনে আবার আন্দোলনে মাঠে নামতে হবে। জনগণও এর অপেক্ষায় আছে। মানবকণ্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ