প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আহ্ নুসরাত!

রোকেয়া রহমান : নুসরাত জাহানের জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে। তার বয়স হয়েছিল মাত্র সাত বছর। কিন্তু এই বয়সেই ফুটফুটে মেয়েটিকে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। না, কোনো রোগে ভুগে বা দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়নি নুসরাতের। তাকে হত্যা করা হয়েছে নির্মমভাবে। মারা যাওয়ার আগে পৃথিবীর কুৎসিততম রূপটি সে দেখেছে। চোখের সামনে বাবাকে সে খুন হতে দেখেছে। আর এ জন্যই বাঁচতে পারেনি সে।

গত শনিবার যখন প্রথম আলোসহ বিভিন্ন পত্রিকায় নুসরাতের খবরটি পড়ি, তখন মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলি। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, রাজধানীর বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা দুই সন্তানের মা আরজিনা বেগম প্রেমে পড়েছিলেন এলাকারই এক রংমিস্ত্রি শাহিনের। তাঁদের ছিল কঠিন প্রেম। কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে পারছিলেন না। তাই দুজনে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু পথের কাঁটা হিসেবে যিনি রয়েছেন, তিনি আরজিনার স্বামী জামিল শেখ। কাঁটা তো সহজেই দূর করা যায়। খুন করে ফেলা। তা–ই তাঁরা করেছেন। কিন্তু তা দেখে ফেলেছিল আরজিনার বড় সন্তান নুসরাত, চিৎকার করে জানতে চেয়েছিল, কেন তারা বাবাকে মারা হচ্ছে। না, পাপের কোনো সাক্ষী রাখতে চাননি তাঁরা। তাই শ্বাসরোধ করে ও বালিশচাপা দিয়ে নুসরাতকে মেরে ফেলেন শাহিন। গ্রেপ্তারের পর পুলিশের কাছে এসব কথা বলেছেন আরজিনা ও শাহিন। আহ্ নুসরাত, তুই তো ঘুমিয়ে ছিলি! কেন যে তোর সে সময় ঘুম ভেঙে গেল, কেনইবা চোখ মেলে চাইতে গেলি আর কেনইবা চিৎকার করলি। তা না হলে তো আজ তোর প্রাণটা বাঁচত।

এই ঘটনা পড়ার পর আমার মনে কয়েকটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। নুসরাতের মা আরজিনা তো প্রেমে পড়েছিলেন এবং প্রেমিকের সঙ্গে ঘর বাঁধতে চেয়েছিলেন। মানে আরেকটু সুখের আশা, ভালো থাকার আশা করেছিলেন তিনি। তিনি তো সহজেই তাঁর স্বামীকে তালাক দিয়ে প্রেমিকের কাছে চলে যেতে পারতেন। যদিও প্রেমিকের স্ত্রী রয়েছে। তিনিও সহজে তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিতে পারতেন। তা না করে তাঁরা কেন এই সহিংস পথ বেছে নিলেন?

এমন নয় যে আমাদের সমাজে দ্বিতীয় বিয়ের ঘটনা ঘটে না। আকছার ঘটছে। তাহলে তাঁরা সহজ পথটা ছেড়ে কেন কঠিন পথ বেছে নিলেন? তাঁরা কি ভেবেছিলেন যে এভাবে তাঁরা দুজনকে খুন করবেন, আর কেউ কিচ্ছুটি টের পাবে না! ডাকাতির ঘটনা বলে পার পেয়ে যাবেন, আর সমাজের চোখে ভালো থাকবেন! এতটা বোকা বোকা চিন্তা কেন? নাকি পরকীয়া করলে হিতাহিত জ্ঞান থাকে না? সব বোধবুদ্ধি হারিয়ে যায়।

তবে নুসরাতই প্রথম শিশু নয়, যে কিনা মায়ের বা বাবার পরকীয়ার বলি হয়েছে। দেশে অতীতেও বহু শিশু এভাবে বাবা অথবা মায়ের পরকীয়ার বলি হয়েছে। সাত বছর আগে ২০১০ সালে ঢাকায় এমনিভাবে মায়ের পরকীয়ার বলি হয়েছিল শিশু সামিউল। কিশোরগঞ্জে গত বছর খুন হয় দেড় বছর বয়সী শিশু মোহাম্মদ আলী। ২০১৪ সালে বাবার পরকীয়ার কারণে খুন হতে হয় দুই বছরের শিশু মাহফুজকে। গত কয়েক বছরের পত্রিকা ঘাঁটলে এ রকম আরও অনেক ঘটনার কথা জানা যাবে। বাবা-মায়ের পরকীয়া ছাড়াও বড়দের দ্বন্দ্বের কারণেও শিশু হত্যার ঘটনা ঘটছে। যেমন: জমি নিয়ে বিরোধ, প্রতিহিংসা চরিতার্থ, পারিবারিক কলহ, পূর্বশত্রুতা ইত্যাদির জেরে কেন যেন শিশুদেরই টার্গেট করা হয়। অথচ শিশুরা হয়তো এসব বিরোধ–কলহের ধারেকাছেও নেই। এসব ঘটনা মেনে নেওয়ার নয়। মেনে নেওয়া যায় না।

এসব ঘটনা থেকেই বোঝা যায়, আমাদের সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় কতখানি ঘটেছে। খুনখারাবিকে আর কেউ অপরাধ বলে মনে করছে না। তুচ্ছ কারণে, ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য একে অপরকে খুন করছে। এখনই লাগাম টেনে ধরা না গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেবে। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের কিছু দায়িত্ব আছে। সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের উন্নয়নে রাষ্ট্রকে পদক্ষেপ নিতে হবে। কার্যকর বিচারব্যবস্থার অভাবে অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। এটা চলতে পারে না। হত্যাসহ সব ধরনের অপরাধের বিচার হতে হবে। অপরাধীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। পরিশেষে একটা কথা বলতে চাই, খুনখারাবি কোনো সমাধান আনতে পারে না। এটা সবাই যত তাড়াতাড়ি বুঝবে, ততই মঙ্গল।
রোকেয়া রহমান: সাংবাদিক। প্রথম আলো

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ