প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সাংবাদিকের কখন দেহরক্ষী প্রয়োজন?

কাজী আলিম-উজ-জামান : অভিনব ঘটনা। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে লেবার পার্টির সম্মেলনে একজন ‘অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথি’র আগমন ঘটে। পেশায় তিনি একজন দেহরক্ষী। তবে তিনি লেবার পার্টির বামপন্থী নেতা জেরেমি করবিনকে নিরাপত্তা দিতে সেখানে যাননি। বা দলের হোমরাচোমরা অন্য কাউকে। তিনি সেখানে গিয়েছিলেন বিবিসির পলিটিক্যাল এডিটর লরা কুয়েন্সবার্গকে নিরাপত্তা দিতে!
কঠিন কঠিন প্রশ্ন করে রাজনীতিবিদদের নাকানিচুবানি খাওয়ানোর ক্ষেত্রে কুয়েন্সবার্গের নাম আছে। তা ছাড়া তিনি একজন নারী। দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মহলের হুমকি, ব্যক্তিগত আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু তিনি। বিবিসি হয়তো মনে করেছে, লেবার পার্টির সম্মেলন কভার করতে গিয়ে কুয়েন্সবার্গের নিরাপত্তার ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তাই সঙ্গে দেওয়া হয়েছে দেহরক্ষী। যদিও বিবিসি বিষয়টি স্বীকার করেনি, অস্বীকারও করেনি।
তবে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি লন্ডনে সাংবাদিকদের অনেকেই কুয়েন্সবার্গের সঙ্গে দেহরক্ষী দেখেছেন। বিষয়টি তীব্রভাবে ঝাঁকুনি দিয়েছে ব্রিটিশ সাংবাদিকতা ও জননিরাপত্তার দেয়ালে। অনেকেই বিষয়টি এভাবে দেখছেন যে নিরাপত্তা কতটা ভঙ্গুর হলে দায়িত্ব পালনকালে একজন সাংবাদিকের দেহরক্ষীর প্রয়োজন হতে পারে। বিবিসির সাবেক সম্পাদক ও নামী কলামিস্ট জেনি রাসেল, যিনি নিজেও লেবার পার্টির ওই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, তিনি বলেছেন, এটা রীতিমতো হতাশাজনক এবং সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটিশ নাগরিক জীবনে সবচেয়ে খারাপ ঘটনাগুলোর একটি।
কাছাকাছি আরেকটি ঘটনা আমরা উল্লেখ করতে পারি, যেটা ঘটেছিল মাত্র দুই বছর আগে, ২০১৫ সালে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনে আয়োজিত র‌্যালিতে থাকা এনবিসির প্রতিবেদক কেটি টারকে নিরাপত্তা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিসের এজেন্টরা। এর কারণ, কেটি টার বিশেষভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত র‌্যালি থেকে তাঁকে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল। যদিও বিষয়টি পরবর্তী সময়ে ট্রাম্পের দলীয় মনোনয়ন পাওয়া ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেনি। উগ্র রাজনীতির উত্থান কেবল সাংবাদিকতার অসহায়ত্বই প্রকাশ করেছিল।
সাংবাদিক লরা কুয়েন্সবার্গের বিষয়টির পূর্বাপর তলিয়ে দেখলেই নিরাপত্তা–সংকট কীভাবে দেহরক্ষী রাখা পর্যন্ত গড়াল, তা বোঝা যাবে। আমরা সেদিকেই যাই। ঘটনার পরম্পরা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাম-ডান উভয় শিবির থেকেই সমালোচনার তিরে বিদ্ধ হয়েছেন তিনি। বলা যায়, তিনি যা-ই লিখেছেন, তাই-ই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমালোচনার বেড়া ডিঙিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণের নিশানা হয়েছে। বিশেষ করে এ কাজে এগিয়ে থেকেছে বা থাকছে দ্য ক্যানারি, ইভলভ পলিটিকস এবং নোভারা মিডিয়ার মতো কট্টর বামপন্থী ওয়েবসাইটগুলো। অতি সম্প্রতি দ্য ক্যানারি অভিযোগ করে, কুয়েন্সবার্গ ক্ষমতাসীন দল কনজারভেটিভ পার্টির সঙ্গে যুক্ত একটি অনুষ্ঠানে কথা বলতে রাজি হয়েছেন। অর্থাৎ তিনি রক্ষণশীলদের পক্ষের মানুষ। দ্রুত এ অভিযোগের জবাব দিয়ে বিবিসিকে বলতে হয়েছে, এটা মিথ্যা, সম্পূর্ণ অপপ্রচার।
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বিবিসি যেন পরিণত হয়েছে ডানপন্থী রাজনীতিবিদ ও ভাষ্যকারদের ‘পাঞ্চিং ব্যাগে’। তাঁরা এই গণমাধ্যমের কপালে এঁকে দিয়েছেন ‘কলঙ্কতিলক’। তাঁরা বলছেন, এটা বাম ও উদারপন্থীদের গাঁটের প্রতিষ্ঠান। আবার সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনের সময় বামপন্থীদেরও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল বিবিসিকে। নিরপেক্ষ থাকার এ এক বিরাট সমস্যা!
লন্ডনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড পাওয়ারের প্রধান মার্টিন মুর বলছেন, এটা একটা নতুন অবস্থা। বিবিসি এখন ডান, বাম উভয় শিবির থেকে আক্রমণের শিকার হচ্ছে, যা এ প্রতিষ্ঠানটির অতীত অবস্থান থেকে ভিন্ন।
পর্যবেক্ষকদের অনেকে বলছেন, বামপন্থী শিবির থেকে বিবিসির আক্রমণের শিকার হওয়ার পেছনে জেরেমি করবিনের রাজনৈতিক বিশ্বাসের যোগসূত্র আছে। কারণ, করবিন লেবার পার্টিতে তাঁর পূর্বসূরিদের চেয়ে কিছুটা বেশি বাম। দলের সদস্যদের মধ্যে তিনি যথেষ্ট জনপ্রিয়। আবার দলের এমপি, যাঁরা মধ্যপন্থী হিসেবে পরিচিত, তাঁরা করবিনের কঠোর সমালোচক। কিন্তু করবিনের সমর্থকেরা যুক্তি দেখান যে তাঁদের নেতাকে এভাবে চিত্রিত করার পেছনে কুয়েন্সবার্গের মতো বিবিসির কিছু রিপোর্টারের হাত রয়েছে। যেমন ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারির সময় সে দেশের গণমাধ্যম বার্নি স্যান্ডার্সের গায়ে বামপন্থী তকমা সেঁটে প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটনের তুলনায় তাঁকে পিছিয়ে রেখেছিল। পুঁজিবাদী মার্কিন দেশের রাজনৈতিক জগতে বামপন্থী তকমাটা গালিরই নামান্তর।
বিষয়টির আরও ব্যাখ্যা পাওয়া যায় করবিনের সমর্থক বামপন্থী ওয়েবসাইট ‘নোভারা মিডিয়া’র জ্যেষ্ঠ সম্পাদক অ্যাশ সরকারের কথায়। নিউইয়র্ক টাইমসের ওই প্রতিবেদনে অ্যাশ সরকার বলেছেন, তিনি মনে করেন, অনেক মানুষের এ রকম ধারণা যে রাজনীতির নতুন ও উদীয়মান ধারার প্রতি বিবিসি সহানূভূতিশীল নয়। তাঁর মতে, কুয়েন্সবার্গের কাজের সমালোচনা এবং যে ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার তিনি হচ্ছেন, এই দুটো বিষয়কে পৃথকভাবে দেখা উচিত। অ্যাশ সরকার, যিনি নিজেও অনলাইনে নিয়মিত আক্রমণের শিকার, তাঁর কথায়, ‘আমাকে যদি বলেন, লরা কুয়েন্সবার্গ কি একজন ভালো সাংবাদিক? আমি বলব, বিষয়টি বিতর্কের অবকাশ রাখে। আবার তাঁর কি এ রকম ট্রলের শিকার হওয়া উচিত? আমার সরাসরি উত্তর থাকবে, না।’
তবে সব মহলের পর্যবেক্ষকেরা সতর্কতার সঙ্গে একটি বিষয়ে একমত যে কুয়েন্সবার্গের মতো সাংবাদিকের সঙ্গে আচরণ একেবারেই বামপন্থীদের একান্ত সমস্যা।

২.
দেশে দেশে সমাজে বাড়ছে বিভক্তি। রাজনীতিতে কট্টরপন্থা আর ধর্মীয় উন্মাদনা এই বিভক্তির চারা গাছের গোড়ায় জল ঢালছে প্রতিনিয়ত। আমরা দেখি, উদারপন্থার স্বর্গ বলে বিবেচিত ইউরোপে কয়েক দশক ধরেই পাখা মেলছে উগ্রপন্থা। সম্প্রতি জার্মানির নির্বাচনের ফলাফলেও এর ধারাবাহিকতা দেখা গেল। মার্কিন মুলুকে তো ডানপন্থীরা পুকুর কেটে বসেছে। উপমহাদেশের রাজনীতিতে ধর্মাশ্রয়ী কট্টরপন্থী রাজনীতির ইতিহাসটা বহু রক্তে রঙিন।
আর এ পরিবেশে সাংবাদিকদের কাজ করা কেবল কঠিন নয়, রীতিমত স্থায়ী সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। আজ রাজনীতিবিদেরা সহজেই ব্যক্তি ধরে ধরে সাংবাদিকদের গায়ে সিল লাগিয়ে দিচ্ছে, হয় তুমি আমাদের দলে, নতুবা আমার শত্রুর দলে। তোমার নিরপেক্ষ থাকলে চলবে না। তোমার চিন্তা বিক্রি করতে হবে। কার কাছে বেঁচবে? ক্রেতা আমি বা তিনি। তুমি অবিক্রীত থাকতে পারবে না।
সাংবাদিকতা দিন দিন ওই জায়গায় চলে যাচ্ছে। লরা কুয়েন্সবার্গের ঘটনা তারই ইঙ্গিত। একজন সাংবাদিক বা রিপোর্টারের দায়িত্ব পালনকালে দেহরক্ষীর উপস্থিতি যথেষ্ট অনভিপ্রেত। কারও কোনো সন্দেহ আছে?

কাজী আলিম-উজ-জামান: সাংবাদিক
[email protected]। প্রথম আলো

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ