প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিরাগে জ্যোতি বসু, অনুরাগে মমতা

সোহরাব হাসান : বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভিন্ন দল মানেই ‘দেশ ও জনগণের শত্রু’। কথাবার্তা বন্ধ। ভারতে সে রকমটি কেউ ভাবেন না। অন্তত প্রণব মুখার্জির আত্মজীবনীমূলক তিনটি বই পড়ে তা-ই মনে হয়েছে। প্রণব মুখার্জি বরাবর কংগ্রেসের রাজনীতি করেছেন। এই রাজনীতির সূত্রে ডান ও বামপন্থী অনেক নেতার সঙ্গে তাঁর সখ্য ও কর্মসম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিশেষ করে কংগ্রেস যখন ক্ষমতায়, তিনি চেষ্টা করেছেন বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনা করে, যুক্তি দিয়ে বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে তাদের সমর্থন আদায় করতে।

প্রণব মুখার্জি মনে করেন, সংসদ হলো ভারতীয় গণতন্ত্রের ‘গঙ্গোত্রী’। যদি গঙ্গোত্রী দূষিত হয়, তাহলে গঙ্গা কিংবা এর অংশীদার কেউ দূষণের বাইরে থাকবে না। তাঁর ভাষায়, কার্যকর সংসদীয় গণতন্ত্র তিনটি ডি–এর ওপর নির্ভরশীল—ডিবেট (বিতর্ক), ডিসেন্ট (বিরোধিতা) ও ডিসকাশন (আলোচনা)। কিন্তু ইতিমধ্যে এই ব্যবস্থায় চতুর্থ ডির অনুপ্রবেশ ঘটেছে—ডিজরাপশন বা বাধাগ্রস্ত করা। প্রথম তিন ডি দেশ শাসনের ক্ষেত্রে সরকারের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে। আর চতুর্থ ডি এলে সরকারের চেয়ে বিরোধী পক্ষই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রণব আরও যোগ করেন, ‘আমাদের প্রয়োজন সহিষ্ণুতা ও অপরকে গ্রহণের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো। সংসদ নেতা ও বিরোধী দলের নেতার দায়িত্ব সংসদের কর্মসূচিগুলো এগিয়ে নেওয়ার জন্য একসঙ্গে কাজ করা। সংসদ নেতা হিসেবে আমি সুষ্ঠুভাবে সংসদ পরিচালনার জন্য বিরোধী দলের নেতা ও অন্যান্য নেতার সঙ্গে প্রায়ই আলোচনা করতাম।’

সংসদীয় ব্যবস্থায় যখন-তখন অধ্যাদেশ জারির বিরোধিতা করেন এই প্রবীণ রাজনীতিক। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, বর্তমান লোকসভার গত তিন বছরের মেয়াদে ২৮টি অধ্যাদেশ জারি হয়েছে। অথচ ১৫তম লোকসভার পাঁচ বছর মেয়াদে ২৫টি এবং ১৪তম লোকসভায় ৩৬টি অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল।

প্রণব মুখার্জি অন্য দলের যেসব নেতার প্রশংসা করেছেন তাঁদের মধ্যে আছেন অটল বিহারি বাজপেয়ি, এল কে আদভানি, আই কে গুজরাল, শারদ পাওয়ার প্রমুখ। রাজনৈতিক মতভেদ সত্ত্বেও তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তাঁর মতে, মমতা জাত বিদ্রোহী ও প্রকৃত রাজনীতিক। ১৯৮৪ সালে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে পরাজিত করে তিনি প্রথম লোকসভার সদস্য হন। ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন। সেখান থেকে তিনি আর পেছনে ফেরেননি। প্রণব লিখেছেন, তিনি সব সময় সাহসের সঙ্গে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছেন এবং সেটিকে সুযোগে রূপান্তরিত করেছেন।…বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মমতা আবেগ দ্বারা তাড়িত হন। তবে তাঁর সেই আবেগের বহিঃপ্রকাশের মধ্যেও একটা হিসাব-নিকাশ থাকে। এটাই তাঁর কাজের কৌশল। তাঁর সব কাজের পেছনে জোরালো যুক্তি আছে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথমে প্রণবকে সমর্থন করেননি। মুলায়ম সিং যাদবের সঙ্গে বৈঠক করে তিনি সাংবাদিকদের জানিয়ে দিলেন, এ পি জে আবদুল কালাম, হামিদ আনসারি ও সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় ইউপিএর সম্ভাব্য প্রার্থী। এর আগে মমতা সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গেও বৈঠক করেন। সেখানে হামিদ আনসারি ও প্রণব মুখার্জিকে যোগ্য প্রার্থী বলে জানান। কিন্তু সংবাদ সম্মেলনে মমতার ভাষ্য ছিল ভিন্ন। তিনি বলেন, হামিদ আনসারি ও প্রণবের নাম সোনিয়াই বলেছেন।

এ খবর শুনে প্রণবের মেয়ে শর্মিষ্ঠা রানীক্ষেত থেকে বাবাকে সমবেদনা জানিয়ে বার্তা পাঠান, যাতে রবীন্দ্রনাথের গানের পঙ্‌ক্তি ছিল, ‘দুখের রাতে নিখিল ধরা যখন করে বঞ্চনা, তোমারে যেন না করি সংশয়।’

প্রণবের মন্তব্য, মমতা কখনো কখনো তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন। তাঁর ভুল ধারণা ছিল যে অর্থমন্ত্রী ইচ্ছা করেই পশ্চিমবঙ্গের দেনা মওকুফ করেননি। তিনি বর্তমান ঋণেরও পাঁচ বছর রেয়াত চাইছিলেন। অর্থমন্ত্রী হিসেবে প্রণব তাঁর প্রত্যাশা পূরণ করবেন এটাই তাঁর ধারণা ছিল। কিন্তু বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রণব তাঁকে বুঝিয়ে বলেছেন, পুরো ঋণ রেয়াত দেওয়া সম্ভব নয়। তবে তিনি নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন যে ১৩তম অর্থ কমিশন ঋণগ্রস্ত রাজ্যগুলোর জন্য কিছু রেয়াতের ব্যবস্থা করবে। যেখানে অধিকাংশ রাজ্য সেই সুপারিশ গ্রহণ করলেও পশ্চিমবঙ্গ তা মানেনি।

তবে শেষ পর্যন্ত মমতা প্রণবের প্রার্থিতা সমর্থন করেছেন। ২০১২ সালের ১৭ জুলাই তিনি সংবাদ সম্মেলন করে এই সমর্থনের কথা জানান এবং সব এমএলএ ও এমপিকে ভোট দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেন। কলকাতার পত্রপত্রিকায় সংবাদ ছাপা হওয়ার পর একজন প্রণবকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এরপর প্রণব মমতাকে টেলিফোন করলে তিনি তিনি জানান, ‘সব এমপি ও এমএলএকে তাঁর (প্রণব) পক্ষে ভোট দিতে বলেছেন। তিনি নিশ্চিত করেন, ভোটের দিন তিনি নিজে তদারক করবেন, যাতে কোনো ভোট নষ্ট না হয়।’

বিজেপি নেতা অটল বিহারি বাজপেয়িরও উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন প্রণব। তাঁর মতে, বাজপেয়ি ছিলেন একজন দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান। তাঁর বাগ্মিতা জনগণকে মুহূর্তেই আকৃষ্ট করত। ‘এই আপসহীন দেশপ্রেমিক’ ভারতকে পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক দেশে পরিণত করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি রাজনীতিতে সমঝাতোর আবহ তৈরি করেন, যার মাধ্যমে তিনি নিজের দল, জোট ও রাজনৈতিক বিরোধীদের শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন।

এল কে আদভানি সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য, ‘রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও আমি সব সময়ই তাঁর বিজ্ঞ পরামর্শ ও বন্ধুত্বপূর্ণ উপদেশ নিতাম।’ এল কে আদভানি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে তাঁর প্রস্তাবেই প্রণব মুখার্জি সংসদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়–সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি হন। সে সময়ে আসামের ইলিগ্যাল মাইগ্রেন্টস (ডিটামিনেশন বাই ট্রাইব্যুনাল বা আইএমডিটি আইন বাতিলের উদ্দশ্যে সংসদে একটি বিল আনা হয়েছিল। এই আইন অনুযায়ী আসামে ১৯৪৮ সালের ১৯ জুলাইয়ের আগে যাঁরা আসামে এসেছেন, তাঁরাই নাগরিক হিসেবি গণ্য হবেন। কিন্তু সারা ভারতের জন্য সীমারেখা হলো ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৭৪ সালে যে চুক্তি হয়, তাতেও ২৫ মার্চের কথাই বলা আছে। বিলটি নিয়ে আদভানি ও প্রণবের মধ্যে মৃদু বিতর্কও হয়। আদভানি ও অন্যান্য বিজেপি নেতার অভিযোগ, ভোটের রাজনীতির জন্যই কমিটির সভাপতি বিলটি আটকে রেখেছেন। কিন্তু এই তথ্য সঠিক ছিল না। প্রণব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জানতে চান দুই অধিবেশন আগে বিলটি কমিটি অনুমোদন করলেও কেন পাস করতে বিলম্ব হচ্ছে? সেই আইনটি অদ্যাবধি পাস হয়নি। কিন্তু আসাম ভারতের বাইরে নয়। সেখানে অন্য আইন থাকতে পারে না।

আমরা অবাক হয়েছি প্রণবের তিন খণ্ড সিরিজে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু সম্পর্কে প্রশংসামূলক একটি বাক্যও না দেখে। প্রথম খণ্ডে একবার তাঁর নাম এসেছে, উপনির্বাচনে ইন্দিরা জয়ী হয়ে সংসদে আসার পর জ্যোতি বসু ও জনতা পার্টির অপর এক নেতা নাকি মন্তব্য করেছেন, ‘শয়তান আবার সংসদে এসেছে।’ ইন্দিরার আমলে চোরাচালান ও মজুতদারিবিরোধী আইন পাস হলে বামফ্রন্ট এর বিরোধিতা করে। তাদের যুক্তি ছিল, আইনটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিরোধীদের দমন-পীড়নে ব্যবহার করা হবে। প্রণবের ভাষায়, ‘জ্যোতি বসু তাঁর স্বভাবমতো সরকারকে চ্যালেঞ্জ করেছেন এবং বামশাসিত রাজ্যগুলোকে এই আইন কার্যকর হতে দেওয়া হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু এটি সংবিধানের লঙ্ঘন। কোনো রাজ্য সরকার দেশের আইনসভায় প্রণীত আইনকে অগ্রাহ্য করতে পারে না।’

তৃতীয় খণ্ডেও একাধিকবার জ্যোতি বসুর নাম এসেছে। জোট গঠনের প্রক্রিয়া হিসেবে প্রণব অন্যান্য নেতার পাশাপাশি জ্যোতি বসুর সঙ্গেও আলোচনা করেছেন। আরেকবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারত যে পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি করেছে তার পক্ষে বামদের সমর্থন পেতে তিনি জ্যোতি বসুর সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। এ ব্যাপারে তাঁকে নমনীয় মনে হয়েছিল। কিন্তু সিপিআইএমের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ কারাত অনড় ছিলেন। বামেরা শেষ পর্যন্ত সমর্থন দেননি।

জ্যোতি বসুর বিষয়ে প্রণবের রক্ষণশীল মনোভাবের একটি কারণ হতে পারে তিনি ইন্দিরা গান্ধী ও কংগ্রেস রাজনীতির কঠোর সমালোচক ছিলেন। আরেকটি কারণ হতে পারে প্রণবও পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। বিধানসভা, রাজ্যসভা কিংবা লোকসভা নির্বাচনে তিনি হয়তো সিপিআইএমের সরাসরি বিরোধিতার মুখে পড়েছেন।

আগামীকাল: যিনি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ ঠেকিয়েছিলেন

সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।

[email protected]। প্রথম আলো