প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিশ্বে খাদ্যমূল্য কমেছে বাড়ছে বাংলাদেশে

ডেস্ক রিপোর্ট : চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবর মাসে বিশ্ববাজারে সার্বিকভাবে খাদ্যপণ্যের দাম কমেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। গত ২রা নভেম্বর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আলোচ্য মাসে দানাজাতীয় শস্য, ভোজ্য তেল, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, চিনি ও মাংসের দাম বেশি কমেছে, যার সার্বিক প্রভাব পড়েছে মূল্যসূচকে। এসব খাদ্যের মূল্যমান সেপ্টেম্বর মাসের তুলনায় অক্টোবরে ১.৩ শতাংশ কমে ১৭৬.৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বিশ্ববাজারে কমলেও বাংলাদেশে নিত্যপণ্যের দাম দফায় দফায় বাড়তে দেখা গেছে। কোনোভাবেই লাগামহীন এই ঊর্ধ্বগতি থামানো যাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গত কয়েক বছর ধরে খাদ্যের উৎপাদন স্থিতিশীল আছে। এর মাঝে চলতি বছর কয়েক দফায় বন্যা ও অতি বৃষ্টির ফলে হাওর অঞ্চলসহ দেশের ২০-৩০টি জেলায় ফসলহানি হয়েছে। এতে খাদ্য ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে ঘাটতি মেটাতে নানা দেশ থেকে সরকারকে খাদ্য আমদানি করতে হচ্ছে। এতে করে পণ্যের দাম বেড়েছে। এফএও’র প্রতিবেদনে বলা হয়, সংস্থাটি বিশ্বব্যাপী ৫ ধরনের পণ্যের দাম নিয়ে চালানো জরিপের ওপর ভিত্তি করে ওই প্রতিবেদন তৈরি করেছে। সংস্থাটির মতে, বিশ্বে খাদ্যের বর্তমান মূল্য গত বছরের অক্টোবর মাসের তুলনায় ২.৫ শতাংশ বেশি। কিন্তু ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্বে খাদ্য মূল্য যে রেকর্ড পরিমাণ সর্বোচ্চ দামে পৌঁছায় তার তুলনায় বর্তমান খাদ্য মূল্য ২৭ শতাংশ কম। কৃষিজাত পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে বেশি উঠানামা করে। তবে এফএওর মতে, আগামী দশকে কৃষিপণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকবে।
খাদ্য সংক্রান্ত ইনডেক্সে দেখা গেছে, অক্টোবর মাসে সব খাদ্য পণ্যের মধ্যে দুগ্ধজাত পণ্যের দাম কমেছে সবচেয়ে বেশি। এ পণ্যটির দাম কমার হার ছিল ৪.২ শতাংশ। প্রতিবেদনে দেখা যায়, আলোচ্য মাসে ভোজ্য তেল, চিনি, মাংসের দামও বেশি কমেছে। অক্টোবর মাসে বিশ্ববাজারে মাংসের দাম কমেছে ০.৯ শতাংশ। ভোজ্য তেলের দামও সেপ্টেম্বরের তুলনায় ১.১ শতাংশ কমেছে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বলছে, অক্টোবর মাসে পাম অয়েল ও সোয়াবিন তেলের দাম কমেছে। এছাড়া এই মাসে চিনির সার্বিক দামও কমেছে। সেপ্টেম্বর মাসের তুলনায় পণ্যটির দাম কমেছে ০.৭ শতাংশ। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চাল ও গমের বাড়তি চাহিদার কারণে এই জাতীয় পণ্যের দাম ০.৪ শতাংশ বেড়েছে বলে মনে করছে এফএও।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যেও দেখা যাচ্ছে গত কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। অর্থাৎ জিনিসপাতির দাম বেড়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সাধারণ গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৫.৮৬ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৫.৪৩ ভাগ। বিবিএসের প্রতিবেদন মতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই ধারাবাহিকভাবে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। জুলাই মাসে ৫.৫৭, অগাস্ট মাসে ৫.৮৯ এবং সেপ্টেম্বর মাসে ৬.১২ শতাংশ।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছিলেন, একদিকে ফসলের ক্ষতি হয়েছে অন্যদিকে যোগাযোগ ব্যবস্থায় সমস্যা হয়েছে। যে কারণে সঠিকভাবে পণ্য সরবরাহ হয়নি। গেল তিন মাসে খাদ্য খাতের চাহিদা এবং জোগানের মধ্যে সমন্বয় ছিল না। ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। পরিকল্পনামন্ত্রী আশা করছেন, চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে মূল্যস্ফীতির এ হার কমে আসবে। চাহিদা আর জোগানেরও সমন্বয় হবে।
বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ ভোগ্যপণ্যের অন্যতম আমদানিকারক দেশ। এখানে জিনিসপত্রের দাম অনেকটাই আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভর হওয়ার কথা। কিন্তু বাজার চলছে উল্টো পথে। মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা গেছে বাজার স্বাভাবিক গতিতে চলবে বলে আশা করেন তিনি।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত এপ্রিল মাসের শুরু দিকে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মোটা চালের দাম ছিল ৩৮ থেকে ৪০ টাকা। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এসে একই চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৮ থেকে ৫০ টাকা কেজিদরে। মাঝে গুজবের তোড়ে আরো কিছুটা বেড়েছিল। অথচ এটি কোনো পচনশীল পণ্য নয়। এ সময়ে অস্বাভাবিক দাম বেড়েছে সরু চালেরও। এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে যে চাল ৫০ থেকে ৫২ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, ছয় মাসের ব্যবধানে বর্তমান দর ৬২ থেকে ৭০ টাকা। সরকারের কড়া নজরদারি আর মজুতদারবিরোধী অভিযানে এই চালের দাম কিছুটা কমে এসেছে। কিন্তু স্বল্প এবং সীমিত আয়ের মানুষের নাভিশ্বাস কমছে না। কারণ এক বছর আগে এই চালের দাম ছিল ৪৮ থেকে ৫০ টাকা। এক বছরে দাম বেড়েছে ২০-২৫ শতাংশ। ৩০-৩২ শতাংশ দাম বেড়েছে ছয় মাসের ব্যবধানে। গত এপ্রিল মাসে খুচরা বাজারে ২৪ থেকে ৩০ টাকা দরে দেশি পিয়াজ বিক্রি হলেও ছয় মাসের ব্যবধানে পণ্যটির দাম এখন ৯০ থেকে ১০০ টাকা। ১৮ থেকে ২০ টাকা দামের ভারতীয় পিয়াজ বর্তমানে ৭০ থেকে ৭৫ টাকা দরে বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। ছয় মাস আগে যে করলা ২০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকায়। ১২০ টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে এক কেজি টমেটো কেনার জন্য। ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, ধুন্দুল, কাঁকরোল প্রভৃতি সবজির পেছনে ব্যয় করতে হচ্ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকা।
বাজারের সাধারণ ক্রেতাদের মতে, মাছে-ভাতে বাঙালির দৈনন্দিন জীবনে ছন্দপতন ঘটাচ্ছে চাল-সবজির দরবৃদ্ধি। নিম্ন আয়ের মানুষ আয়ের বড় অংশই খরচ করছেন চালের পেছনে।
ব্যতিক্রম কেবল আলু। গত ছয় মাসে সব সবজির দাম ৫০ থেকে ১০০ ভাগ বাড়লেও আলুর দাম উল্টো ১০ টাকা কমেছে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে যে আলু ২৮ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল, বর্তমানে সেই আলুর দাম ১৮-২০ টাকা।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, শুধু আমদানি সংকটই দায়ী নয়। বর্তমানে অস্বাভাবিক বাজার সৃষ্টিতে ব্যবসায়ীদের হাত রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি জানান, চালের বাজারে দাম বাড়ার পর পিয়াজের বাজারেও এখন আগুন। দেশে প্রাকৃতিক সংকটের কারণে আমদানি ঘাটতি থাকতে পারে। তার কারণে হয়তো সামান্য দাম বাড়তে পারে। কিন্তু এতোটা মেনে নেয়া যায় না। এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, সামনে শীতের মৌসুম। শীতের সবজি ও নতুন পণ্য বাজারে ঢুকলেই বাজারে স্বস্তি আসবে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর হিসেবে গত এক বছরের ব্যবধানে পিয়াজের দাম ১৬০ শতাংশ, আদা ৫২ শতাংশ, খোলা সাদা আটা ৯ শতাংশ, বোতলজাত সয়াবিন তেল ৮ শতাংশ, মুগডাল ২৮ শতাংশ, খাসির মাংস ২৬ শতাংশ, গরুর মাংশ ১৭ শতাংশ ও ইলিশ মাছের দাম ১৫ শতাংশ বেড়েছে। চালের দাম কমার কথা বলা হলেও সংস্থাটির হিসেবে এখনো তা গত বছরের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
টিসিবির হিসেবে উল্লেখযোগ্য নিত্যপণ্যের মধ্যে বর্তমানে মোটা চাল ৪৪ থেকে ৪৬ টাকা, সরু চাল ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা, আটা ২৮ থেকে ৩৪ টাকা, ময়দা ৩৪ থেকে ৪৪ টাকা, ১ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন ১০৪ থেকে ১০৯ টাকা, দেশি মসুর ডাল ১০০ থেকে ১৩০ টাকা, মুগ ডাল ১০০ থেকে ১৫০ টাকা কজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে বাস্তবে বাজারে অধিকাংশ পণ্যই এরচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) হিসাবে গত ৮ বছরে (২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল) রাজধানীতে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৭১ শতাংশ। ক্যাবের এই হিসাব ১১৪টি খাদ্যপণ্য, ২২টি নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী এবং ১৪টি সেবার তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়েছে। মানবজমিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ