প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রক্তপাতহীন পালাবদল চেয়ে নিজেই রক্তপাতের শিকার

নাসিমুল শুভ :  ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের দিন থেকেই জিয়ার অনুসারী সেনা এবং কর্নেল তাহেরের সৈনিক সংস্থা পাল্টা অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি নিতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধে ভারতে গেরিলা প্রশিক্ষণ দেয়া, ২ নম্বর সেক্টর এবং কে ফোর্সের বীর সেনা খালেদ মোশাররফকে ‘ভারতপন্থী’ বানিয়ে সেনানিবাসগুলোতে শুরু হয় প্রচারণা,বিলি করা হয় লিফলেট। এই প্রচার-অপপ্রচারের কারণে ৭ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধা সেনাদের রক্ত ঝরা অধ্যায়ের সূচনা দেখে বাংলাদেশ।

খালেদ মোশাররফ ভারতপন্থী প্রচারণার ফসল ৭ নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থানে কর্নেল তাহেরের বিপ্লবী সৈনিকেরা বন্দি থাকা জিয়াকে মুক্ত করে। জিয়ার মুক্তি পরবর্তী পরিস্থিতি ফুটে উঠেছে ৩ নভেম্বর অভ্যুত্থানের অন্যতম সেনা কর্মকর্তা শাফায়েত জামিলের বইয়ে।

‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, রক্তাক্ত মধ্য আগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর’ বইটিতে তিনি লিখেছেন,‘ ৬ নভেম্বর বিকেলেই ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ সেনানিবাসে উস্কানিমূলক লিফলেট ছড়িয়েছে। ওই রাতে আবারো বঙ্গভবন গিয়েছিলেন খালেদ মোশাররফ। শাফায়াত জামিলও গিয়েছিলেন আলাদাভাবে। নিজের বইতে শাফায়াত জামিলে লিখেছেন, “রাত ১০টার দিকে খালেদ মোশাররফের ফোন পেলাম। ফোনে তিনি আমাকে বঙ্গভবন যেতে বললেন। গাড়ীতে উঠছি, তখন ব্রিগেড মেজর হাফিজ আমাকে বললো, স্যার একটা জরুরী কথা আছে।” সে সময় মেজর হাফিজ শাফায়াত জামিলকে জানিয়েছিলেন রাতেই সিপাহিরা বিদ্রোহ করবে। জাসদ এবং সৈনিক সংস্থার আহ্বানেই তারা এটি করবে। একজন সুবেদার মেজর হাফিজকে একথাও বলেছিলেন যে তিনি এ কথাও শুনেছেন যে, খালেদ মোশাররফ ও শাফায়াত জামিলকে মেরে ফেলা হবে। পরে বঙ্গভবনেই শাফায়াত জামিল খালেদ মোশাররফকে সেনানিবাসের কথা জানিয়েছিলেন। রাত বারোটার দিকে ‘সিপাইদের বিপ্লব’ শুরুর কথা ফোনেই জেনেছিলেন শাফায়াত জামিল। কিন্তু তখন আর কোনো ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ ছিল না তাদের। ওই রাতেই মুক্ত হয়েছিলেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। রাত তিনটার দিকেই টেলিফোনে বঙ্গভবনে কথা বলেছেন কর্নেল শাফায়াত জামিলের সাথে। জিয়াউর রহমান বলেছিলেন “Forgive and forget, let’s unite the Army” অথচ জিয়া এই কথা বললেও ৭ নভেম্বর সকালে নিহত হয়েছিলেন খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হুদা ও মেজর হায়দার।’

 

৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের সঙ্গে সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড এবং সংবিধান সমুন্নত রাখার অভ্যুত্থানের পরিকল্পনাকারীদের একজন মেজর (অব.) নাসির উদ্দিন।

৭ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তিনি চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘৭ নভেম্বর পাল্টা অভ্যুত্থানে ওইদিন সকালে মুক্তিযোদ্ধা বীর সেনাদের হত্যায় অতি আগ্রহী সেনাদের বেশির ভাগই মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানে ছিলো। এদেরকে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে পুর্ণবাসনের সুযোগ দেয়া হয়েছিলো। এরাই প্রচারণা চালায় খালেদ মোশাররফ ভারতপন্থী এবং বাকশালকে ক্ষমতায় পুনপ্রতিষ্ঠিত করতে চান। জিয়া-তাহেরের অনুসারী সেনাদের এরকম প্রচারণায় ৭ নভেম্বর সকালে খালেদ মোশাররফকে ঠাণ্ডা মাথায় খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়।’

ওই সময়ের বিভিন্ন স্মৃতিচারণমূলক বইগুলো পড়লে বোঝা যায় ১৫ আগস্টের পর ৩ নভেম্বর পাল্টা ক্যু করে খালেদ মোশাররফ মোশতাককে অপসারণ করতে পেরেছিলেন। আর সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে বন্দি করে একটি পদত্যাগপত্র আদায় করতে পারলেও পুরো সেনাবাহিনীর ওপর তার কোনো কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ঢাকার সেনা কর্মকর্তা এবং সৈনিকদের ওপর আস্থা কম থাকায় রংপুর ব্রিগেড থেকে দুই ব্যাটালিয়ন এবং কুমিল্লা ব্রিগেড থেকে এক ব্যাটালিয়ন সৈন্য ঢাকায় পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন মাত্র কয়েকদিনের মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ। তার ডাকে সাড়া দিয়ে রংপুর থেকে ঢাকায় এসেছিলেন কর্নেল হুদা। তবে শেষ রক্ষা হয়নি।

সেসময় রক্ষীবাহিনীতে কর্মরত কর্নেল আনোয়ারুল আলম তার লেখা রক্ষীবাহিনীর সত্য-মিথ্যা বই-এর ১৭৮ পৃষ্ঠায় খালেদ মোশাররফ হত্যাকাণ্ড নিয়ে বলেছেন- অভ্যুত্থান ব্যর্থ হলে খালেদ মোশাররফ কর্নেল খোন্দকার নাজমুল হুদা, লেফটেন্যান্ট কর্নেল এটিএম হায়দারকে সঙ্গে নিয়ে শেরে বাংলা নগরে অবস্থানরত ১০ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের ইউনিটে যান। সেনাবাহিনীর সঙ্গে রক্ষীবাহিনীর আত্তিকরণের পর রক্ষীবাহিনীর প্রধান কার্যালয় মিনি ব্যারাক হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। সেখানে ছিল ১০ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অবস্থান। এই রেজিমেন্ট খালেদ মোশাররফের নির্দেশে রংপুর থেকে এসে সেখানে অবস্থান নিয়েছিল। খালেদ মোশাররফ ওই রেজিমেন্টের সদর দপ্তরকে নিরাপদ মনে করে খোন্দকার নাজমুল হুদা এবং এটিএম হায়দারকে নিয়ে সেখানে যান। দুর্ভাগ্যের বিষয়, খালেদ মোশাররফ যে স্থানে নিরাপদ মনে করেছিলেন সেখানেই তিনি নিহত হন। তার সঙ্গে নিহত হন খোন্দকার নাজমুল হুদা ও এটিএম হায়দারও।

 

লে. কর্নেল (অব.) এম. এ. হামিদ পিএসসির লেখা তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা বইয়ে খালেদ মোশাররফ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে ১৪২ পৃষ্ঠায় খালেদ যেভাবে মারা গেলেন অংশে বলা হয়েছে-রাত ১২টায় সেপাই বিপ্লবের খবর পেয়ে জেনারেল খালেদ মোশাররফ সঙ্গে সঙ্গে তার প্রাইভেট কার নিয়ে বঙ্গভবন থেকে দ্রুত বেরিয়ে যান। তিনি নিজেই ড্রাইভ করছিলেন। তার সাথে ছিল কর্নেল হুদা ও হায়দার। দুজন ওইদিনই ঢাকার বাইরে থেকে এসে খালেদের সঙ্গে যোগ দেন। খালেদ প্রথমে রক্ষী বাহিনী প্রধান ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামানের বাসায় যান। সেখানে তার সঙ্গে পরামর্শ করেন।

নুরুজ্জামান তাকে ড্রেস পাল্টে নিতে অনুরোধ করে। সে তার নিজের একটি প্যান্ট ও বুশ সার্ট খালেদকে পরতে দেয়। কপালের ফের! শেষ পর্যন্ত নুরুজ্জামানের ছোট সাইজের শার্ট প্যান্ট পরেই খালেদকে মৃত্যুবরণ করতে হয়। যাক, সেখান থেকে খালেদ কলাবাগানে তার এক আত্মীয়ের বাসায় যান। সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করেন এবং কয়েক জায়গায় ফোন করেন। ৪র্থ বেঙ্গলে সর্বশেষ ফোন করলে ডিউটি অফিসার লে. কামরুল ফোন ধরে। সে তাকে প্রকৃত অবস্থা অবহিত করে। এবার খালেদ বুঝতে পারেন অবস্থা খুবই নাজুক। তিনি অবস্থান পরিবর্তন করে শেরে বাংলা নগরে অবস্থিত ১০ম বেঙ্গল রেজিমেন্টে আশ্রয় গ্রহণ করতে যান। ১০ম বেঙ্গলকে বগুড়া থেকে তিনিই আনিয়েছিলেন তার নিরাপত্তার জন্য। পথে ফাতেমা নার্সিং হোমের কাছে তার গাড়ি খারাপ হয়ে গেলে তিনি কর্নেল হুদা ও হায়দারসহ পায়ে হেঁটেই ১০ম বেঙ্গলে গিয়ে পৌঁছেন।

প্রথমে নিরাপদেই তারা বিশ্বস্ত ইউনিটে আশ্রয় নেন। তখনো ওখানে বিপ্লবের কোন খবর হয়নি। কমান্ডিং অফিসার ছিলেন কর্নেল নওয়াজিশ। তাকে দেয়া হয় খালেদের আগমনের সংবাদ। তিনি তৎক্ষণাৎ টেলিফোনে টু-ফিল্ডে সদ্যমুক্ত জেনালের জিয়াউর রহমানকে তার ইউনিটে খালেদ মোশাররফের উপস্থিতির কথা জানিয়ে দেন। তখন ভোর প্রায় চারটা। জিয়ার সঙ্গে ফোনে তার কিছু আলাপ হয়। এরপর তিনি মেজর জলিলকে ফোন দিতে বলেন। জিয়ার সাথে মেজর জলিলের কিছু কথা হয়। তাদের মধ্যে কী কথা হয়, সঠিক কিছু বলা মুশকিল। তবে কর্নেল আমিনুল হক বলেছেন, তিনি ওই সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং জিয়াকে বলতে শুনেছেন যেন খালেদকে প্রাণে মারা না হয়।

এক পর্যায়ে ১০ম বেঙ্গলের সিপাহিরা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি কর্নেল নওয়াজিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তারা খালেদ ও তার সহযোগীদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। সিপাহিরা তাদের টেনে হিঁচড়ে বের করে। ইউনিটের অফিসার মেজর আসাদের বিবৃতি অনুসারে কর্নেল হায়দারকে তার চোখের সামনেই মেস থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে এনে প্রকাশ্যে সৈনিকরা গুলি করে হত্যা করে। বাকি দু’জন উপরে ছিলেন তাদের কিভাবে মারা হয় সে দেখতে পায়নি। তবে জানা যায় হায়দার, খালেদ ও হুদা অফিসার মেসে বসে সকালের নাস্তা করছিলেন। হুদা ভীত হয়ে পড়লেও খালেদ ছিলেন ধীর, স্থির, শান্ত।

কয়েকটি স্মৃতিচারণামূলক প্রকাশনা থেকে জানা যায়, মেজর জলিল কয়েকজন উত্তেজিত সৈনিক নিয়ে মেসের ভেতর প্রবেশ করে। তার সঙ্গে একজন বিপ্লবী হাবিলদারও ছিল। সে চিৎকার দিয়ে জেনারেল খালেদকে বলল, ‘আমরা তোমার বিচার চাই’! খালেদ শান্ত কণ্ঠে জবাব দেন, ‘ঠিক আছে তোমরা আমার বিচার করো। আমাকে জিয়ার কাছে নিয়ে চলো।’ স্বয়ংক্রিয় রাইফেল বাগিয়ে হাবিলদার চিৎকার করে বললো, ‘আমরা এখানেই তোমার বিচার করবো।’ খালেদ ধীর স্থির। বললেন, ‘ঠিক আছে, তোমরা আমার বিচার কর।’ খালেদ দু’হাত দিয়ে তার মুখ ঢাকলেন। একটি ব্রাশ ফায়ার! আগুনের ঝলক বেরিয়ে এলো বন্দুকের নল থেকে। মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানি খালেদ মোশাররফ। চ্যানেল আই

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ