প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ইন্দিরা পরিবারে অন্তঃকলহ

সোহরাব হাসান :প্রণব মুখার্জি তাঁর বইয়ে ইন্দিরা গান্ধী পরিবারের ‘অন্দরমহলের’ কোনো খবর দেননি। রাজনীতির সূত্রে তিনি এই পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছেন। বিশেষ করে, ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের পরাজয়ের পর জনতা পার্টির সরকার যখন নানাভাবে ইন্দিরাকে নাজেহাল করছিল, তখন প্রণব গান্ধী পরিবারের পাশে দাঁড়ান, যা রাজনীতি ছাড়িয়ে পারিবারিক সম্পর্কে রূপ নেয়। আজতক সেই সম্পর্ক অটুট আছে। ২০১২ সালে প্রণব রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হওয়ার পর সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যান। প্রণব তাঁকে বলেছিলেন, ‘ম্যাডাম, এটাই হয়তো আপনার বাড়িতে আমার শেষ আসা, ২৫ জুলাইয়ের পর আমার পক্ষে হয়তো আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসা সম্ভব হবে না। ১৯৯০ সালে রাজীব গান্ধী এখানে চলে আসার পর গত দুই দশকে অসংখ্যবার এখানে এসেছি, বহু বিষয়ে মতবিনিময় করেছি, যুক্তিতর্কও করেছি।

তিনি দৃশ্যত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন এবং আর্দ্রকণ্ঠে বললেন, ‘প্রণবজি, আমি আপনাকে মিস করব।’ উত্তরে আমি তাঁকে বলি, ‘এটি আমার জন্য স্মরণীয় স্মৃতি হয়ে থাকবে। এবং আমি সেখান থেকে চলে এলাম।’

ঘটনা প্রসঙ্গে প্রণব কয়েকবার মানেকার কথা উল্লেখ করলেও বিশদ কিছু লেখেননি। কিন্তু ইন্দিরার জীবনীকার ক্যাথেরিন ফ্রাংক ও পিপুল জয়াকারের বর্ণনায় বিস্তারিত বিবরণ আছে। পিপুল লিখেছেন, ‘১৯৬৪ সালে ইন্দিরা লন্ডন সফরের সময়ই জানতে পারেন তাঁর বড় ছেলে রাজীব সোনিয়া মাইনো নামে এক ইতালীয় মেয়েকে ভালোবাসে। রাজীব তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলে ইন্দিরা মৃদুভাষী ও ভদ্র মেয়েটিকে পছন্দ করেন। ১৯৬৮ সালে রাজীবের সঙ্গে সোনিয়ার বিয়ে হয়।’

এরপর ইন্দিরা গান্ধী তাঁর ছোট ছেলের জন্য এক কাশ্মীরি সুন্দরী পাত্রীর সন্ধান করতে থাকেন। কিন্তু সঞ্জয় গান্ধীর অন্য উদ্দেশ্য ছিল। ১৯৭৪ সালে ইন্দিরা যখন জানলেন, তিনি শিখ সেনা কর্মকর্তার মেয়ে মানেকাকে বিয়ে করতে চান, তখন তিনি মুষড়ে পড়েন। বিয়ের পর ১৭ বছর বয়সী মানেকা প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতে আসেন। শুরু থেকে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে মানেকার খটমট লেগে ছিল। কিন্তু সঞ্জয়ের মৃত্যুর পর সেটি আরও প্রকট হয়। ইন্দিরা পিপুলকে উদ্বেগের সঙ্গে জানান, মানেকার মা আমতেশ্বর আনন্দ খুব উচ্চাভিলাষী এবং তিনি চান মানেকা সঞ্জয়ের জায়গাটি নিক।

সঞ্জয়ের মৃত্যু ১ সফদরজং রোডে মানেকার অবস্থান বদলে দেয়। ইন্দিরার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তিনি সব সময় ইন্দিরাকে ভয় করতেন। কিন্তু এখন মুখোমুখি হলেন। দুজনের মধ্যে একমাত্র সেতুবন্ধ ফিরোজ বরুণ—সঞ্জয় ও মানেকার পুত্র। বরুণ রাতে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গেই ঘুমাত।

সঞ্জয়ের মৃত্যুর পাঁচ দিন পর ২৮ জুন মানেকা হিন্দুস্তান টাইমস-এ নিজের নামে কলাম লেখেন। এই লেখাও মানেকা ও ইন্দিরার মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টি করে। তাঁর মন্তব্য ছিল ‘বাঘের পিঠে দুর্গা উঠেছে’।

ইন্দিরা একপর্যায়ে মানেকাকে তাঁর ব্যক্তিগত সচিব করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু সেটি সোনিয়াকে হতাশ করে। এ নিয়ে শাশুড়ি ও পুত্রবধূর মধ্যে চিঠি চালাচালি হয়। ইন্দিরা উপলব্ধি করলেন, রাজীব ও সোনিয়াকে তাঁর দরকার। তিনি মানেকাকে দেওয়া প্রস্তাব ফিরিয়ে নিলেন। ১৯৮০ সালের শরতে ইন্দিরা ও সোনিয়ার সম্পর্ক নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। বড় পুত্রবধূ সেই জায়গা পূরণ করেন।

জুলাইতে পত্রিকায় রিপোর্ট হয়, সব দলীয় দপ্তরে মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হয় যে মানেকার পক্ষে কোনো প্রচার চালানো যাবে না। ইন্দিরা গান্ধীর অনুমতি ছাড়া মানেকাকে সরকারি অনুষ্ঠানেও আমন্ত্রণ জানানো যাবে না। এর ফলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, মানেকার সমর্থকেরা নিজেদের ভিন্নভাবে প্রস্তুত করতে থাকেন।

ইতিমধ্যে রাজীব ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনস থেকে পদত্যাগ করে কংগ্রেস পার্টিতে যোগ দেন।

২১ বছর বয়সে মানেকা স্বামীকে হারান, এই বয়সেই ইন্দিরা বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ফিরোজ গান্ধীকে বিয়ে করেছিলেন। ৪১ বছর পর তিনি ফের বিদ্রোহের মুখোমুখি হলেন। মানেকা ছিলেন তরুণী, উদ্যমী ও উচ্চাভিলাষী। বিয়ের পর রাজনৈতিক আবহে বসবাস করেছেন। উচ্চপদে আসীন স্বামী তাঁকে ক্ষমতার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তিনি নিজেকে কিছু থেকে প্রত্যাহার করতে রাজি নন।

ক্যাথেরিন ফ্রাংক লিখেছেন, ১৯৮১ সালে কেনিয়া সফর থেকে ফিরে আসার পর এটি সবার কাছে স্পষ্ট যে ইন্দিরা সোনিয়ার পক্ষ নিয়েছেন এবং মানেকা তাঁকে যথেষ্ট বিরক্ত করছেন। আনুষ্ঠানিক নৈশভোজে মানেকাকে আলাদা টেবিলে বসানোর ব্যবস্থা করা হয়। ইন্দিরার ভয়, তিনি এমন কিছু বলে ফেলতে পারেন, যা অতিথিদের জন্য বিব্রতকর হয়। ইন্দিরা তখন ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস-এর সম্পাদক খুশবন্ত সিংকে জানান, তিনি যেন মানেকাকে জিজ্ঞেস করেন, কেন প্রধানমন্ত্রীর জন্য সমস্যা তৈরি করছেন। খুশবন্ত যখন মানেকার
কাছে বিষয়টি তোলেন, তিনি উত্তর দেন, ওই বুড়ো বদমেজাজি মহিলা তাঁর সঙ্গে ‘নোংরা’ আচরণ করছেন।

এরপর ইন্দিরার ওপর প্রতিশোধ নিতে মানেকা তাঁর সচিত্র সাময়িকী সুরিয়া (surya) হিন্দু মৌলবাদীদের কাছে বিক্রি করে দেন। এ ছাড়া তিনি চিঠিপত্রসহ প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির সংবেদনশীল খবরাখবর ফাঁস করে দেন বলেও অভিযোগ আছে। এই পারিবারিক ‘যুদ্ধে’ মানেকার মা অমেশ্বর ও বোন অম্বিকাও যোগ দেন।

১৯৮২ সালের মার্চে মানেকা যখন লখনৌতে আয়োজিত ‘সঞ্জয় সমর্থকদের সম্মেলেনে’ যোগ দেন, তখন ইন্দিরা ছিলেন লন্ডনে। সেখান থেকেই তিনি মানেকার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাঁকে সেখানে যেতে নিষেধ করেন। ২৭ মার্চ দিল্লি ফিরে বিমানবন্দরেই ইন্দিরা জানতে পারেন, মানেকা লখনৌ চলে গেছেন। ইন্দিরা তাঁকে ক্রুদ্ধ ভাষায় লেখা চিঠিতে জানান, মানেকা যদি সম্মেলনে বক্তৃতা দেন, তাহলে তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি ছাড়তে হবে। এই হুঁশিয়ারিও মানেকাকে বক্তৃতা দেওয়া থেকে বিরত রাখতে পারেনি। এরপর অগ্নিশর্মা ইন্দিরা পুত্রবধূর সঙ্গে ‘যুদ্ধে’ লিপ্ত হলেন। তিনি মানেকার বংশপরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তুললেন। জবাবে মানেকা লিখলেন, ইন্দিরার ভাষা পত্রিকায় প্রকাশযোগ্য নয়। ইন্দিরা তাঁকে শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত করেছেন বলেও অভিযোগ করেন।

মানেকার চিঠি প্রকাশিত হওয়ার পর ইন্দিরার তথ্য উপদেষ্টা শারদা প্রসাদ একটি বিবৃতি দেন, যাতে বলা হয়: মানেকা যখন আরএসএস নেতা শারদার অ্যাংরির কাছে সুরিয়া সাময়িকী বিক্রির জন্য গোপন চুক্তি করেন, তখনই ইন্দিরা ও তাঁর পুত্রবধূর মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। ভিন্ন পারিবারিক পটভূমি সত্ত্বেও ইন্দিরা গান্ধী সঞ্জয়ের জীবনসঙ্গিনীকে নির্দ্বিধায় গ্রহণ করেছিলেন।

২৯ মার্চ বিকেলে মানেকা ১ সফদর জং রোড থেকে বিতাড়িত হন। এর আগে মানেকা এক বন্ধুর মাধ্যমে তাঁর অন্যান্য বন্ধু ও সাংবাদিকদের এই খবরটি জানাতে বলেন যে ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে ঘর থেকে বের করে দিচ্ছেন। যখন মালপত্র গোছানো হচ্ছিল, তখন মানেকা ও তাঁর বোন অম্বিকা কয়েক ঘণ্টা ধরে ভিডিও দেখে সময় কাটান। যখন সাংবাদিকেরা ভিড় জমান, তখনই মানেকা বাড়ি ছেড়ে দেন।

শাশুড়ি-পুত্রবধূর বিবাদ নিয়ে ভারতে অনেক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। কিন্তু সেই ঘটনা যে প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি পর্যন্ত যাবে, সেটি অনেকেই ভাবতে পারেননি।

আগামীকাল: প্রণবের চোখে মমতা, জ্যোতি বসু ও অন্যরা

সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।

[email protected] । প্রথম আলো

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ