প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রতিদিন পোড়ানো হচ্ছে ৫০০ টন গাছ লতাগুল্ম

ডেস্ক রিপোর্ট : মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা নতুন-পুরনো প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গার খাদ্য ও অন্যান্য ত্রাণ সহায়তা মিললেও মিলছে না রান্নার জন্য লাকড়ি বা জ্বালানি। তাই বলে বিপুল সংখ্যক এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী থেমে নেই।

দৈনন্দিন রান্নার কাজে ব্যবহার করছে পাহাড়ি ও সামাজিক বনায়নের গাছ। এতে প্রতিদিন উজাড় হচ্ছে এখানকার পাহাড়ি বনভূমি, নিধন হচ্ছে নানা প্রজাতির গাছপালা ও লতাগুল্ম। হুমকির মুখে রয়েছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। বন বিভাগের হিসাবে, রোহিঙ্গারা রান্নার কাজে প্রতিদিন পোড়াচ্ছে ৫০০ টন পাহাড়ি গাছপালা ও লতাগুল্ম। কক্সবাজার ও নাইক্ষ্যংছড়ি বনভূমি এবং স্থানীয়দের উদ্যোগে গড়ে ওঠা সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের গাছ কেটে লাকড়ি বিক্রি এখন অনেক রোহিঙ্গার পেশায় পরিণত হয়েছে। এক মণ লাকড়ি খোলা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২৪০ থেকে ২৬০ টাকা। তাই নির্বিচারে পাহাড়ি বনভূমির গাছ কেটে লাকড়ি বানানোর এই লাভজনক পেশার দিকেই ঝুঁকছে রোহিঙ্গাদের একাংশ। রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে এখানকার পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের আর যেন ক্ষতি না হয়, সেদিকে প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের বিশেষ দৃষ্টি রাখা জরুরি হয়ে পড়েছে বলে জানান কক্সবাজারের সচেতন মহল ও পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতারা।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী, থাইংখালী, টেকনাফের হ্নীলা, হোয়াইক্যং, লেদা, মুছনী, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির চাকডালা, তুমব্রু, জলপাইতলী, ফুলতলী, বড় ছনখোলা, আশারতলী কলাবাগানসহ বিস্তৃত পাহাড় ও বনভূমির বাঁশ-গাছ উজাড় হয়ে যাচ্ছে রোহিঙ্গাদের থাবায়। আগের ৫ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার বসবাস থাকা সত্ত্বেও টেকনাফ, উখিয়ার বিস্তীর্ণ পাহাড়ে গত দুই মাসে আশ্রয় নিয়েছে আরও প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা। এত বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা দিনে দুই বেলা রান্না করতে প্রতিদিন প্রয়োজন হচ্ছে প্রায় ৫ লাখ কেজি বা ৫০০ টন জ্বালানি। আর এই জ্বালানির প্রধান উৎস হিসেবে তারা ব্যবহার করছে এখানকার পাহাড়ি গাছপালা ও বিচিত্র লতাগুল্ম।

আবার তাদের আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করতেও প্রতিদিন কাটা হচ্ছে হাজার হাজার বাঁশ ও গাছ। এত বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সংগ্রহ করতে এবং তাঁবু তৈরির বাঁশ-গাছের জোগান দিতেই উজাড় হচ্ছে এখানকার পাহাড়ি বনভূমি, লতাগুল্ম। বর্তমানে বাঁশ-গাছ ও লাকড়ি চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে এখানে। এই সুযোগে একটি চক্র সরকার ঘোষিত উখিয়ার বালুখালীতে হাতির অভয়ারণ্যের বাঁশ-গাছও কেটে ফেলছে বলে স্থানীয়দের সূত্রে জানা গেছে। সম্প্রতি এখানকার বন্যহাতিগুলো তাদের আবাসস্থল বিনষ্ট হচ্ছে বলে দুই দফা রোহিঙ্গা তাঁবুতে আক্রমণ চালিয়ে ৭ জনকে হত্যা করেছে। এদিকে উখিয়ার বালুখালী ও থাইংখালীর পাহাড়ে সরকারের প্রস্তাবিত মোট ৩ হাজার একর জায়গায় নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবির তৈরির কথা বলা হলেও অধিকাংশ পাহাড়ে রয়েছে সামাজিক বনায়ন। এ সামাজিক বনায়নের পেছনে স্থানীয়দের রয়েছে লাখ লাখ টাকার বিনিয়োগও। কিন্তু ইতিমধ্যে পাহাড়গুলো চলে গেছে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের দখলে। এর বাইরে আরও অন্তত ১০ থেকে ১৫ হাজার একর পাহাড়ি বনভূমিতে আশ্রয় শিবির গড়ে তুলেছে রোহিঙ্গারা। এতে সামাজিক বনায়ন প্রকল্পগুলো যেমন ধ্বংস হচ্ছে, তেমনি ধ্বংস হচ্ছে এখানকার নানা প্রজাতির লতাগুল্ম ও জীববৈচিত্র্য।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কক্সবাজার জেলা সভাপতি প্রফেসর এম এ বারী বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে তা ঠিক। কিন্তু আমাদের পরিবেশ-প্রতিবেশের কথাও চিন্তা করতে হবে প্রত্যেককে। আমাদের বন ও প্রাকৃতিক পরিবেশের যে ক্ষতি হয়েছে তা কখনো পূরণ হবে কিনা সন্দেহ। ’ তিনি বলেন, ‘বিশ্ব ঐতিহ্য কক্সবাজারের মতো একটি পর্যটন শহরের পাশেই লাখ লাখ উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে এখন পুরো পর্যটন শিল্পই হুমকির মুখে পড়েছে। সেই সঙ্গে এখানকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশও বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ’ কক্সবাজার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (দক্ষিণ) মো. আলী কবির বলেন, ‘সরকার ৩ হাজার একর পাহাড়ি ভূমিতে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবির গড়ে তোলার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানে তারা যে কত হাজার একর পাহাড়ি ভূমি দখল করে আছে তার হিসাব কারোই নেই।

এ ছাড়া জ্বালানির কাজে ব্যবহার ও বসতি গড়ে তোলার জন্য আমাদের যে পরিমাণ বাঁশ-গাছ ও লতাপাতা ধ্বংস করা হয়েছে এবং হচ্ছে তা কল্পনাতীত। ’ কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু জানান, ‘ইতিমধ্যে রোহিঙ্গারা যেসব বনভূমিতে আশ্রয় নিয়েছে, সেখানে রয়েছে হাজার হাজার সামাজিক বনায়নের গাছ। শুধু তাই নয়, বালুখালী বনভূমি হচ্ছে বন্যহাতির আবাসস্থল, পশুপাখিদের অভয়ারণ্য। এ ছাড়াও রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের জন্য প্রতিদিনই কাটা হচ্ছে লাখ লাখ বাঁশ-গাছ, লতাগুল্ম। ন্যাড়া হয়ে যাচ্ছে পাহাড়।
মারাত্মক হুমকির মুখে আমাদের জীববৈচিত্র্য। এখানকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে সবার আগে। ’

৭ হাজার একর জায়গাজুড়ে রোহিঙ্গা : নিজস্ব প্রতিবেদক চট্টগ্রাম জানান, বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল মান্নান বলেছেন, রোহিঙ্গারা এ পর্যন্ত কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের প্রায় ৭ হাজার একর জায়গাজুড়ে অবস্থান করছে। তবে তাদের কক্সবাজার ও টেকনাফের নির্দিষ্ট ক্যাম্প ছাড়া দেশের কোথাও থাকার সুযোগ নেই। দেশের যে স্থানেই পাওয়া যাবে, সরকারি নির্দেশনা মতে নির্দিষ্ট ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। ‘বাংলাদেশে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশকারী মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিকদের চিহ্নিতকরণ’ সংক্রান্ত বিভাগীয় কমিটির সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব তথ্য জানান। গতকাল দুপুরে বিভাগীয় কমিশনারের সভা কক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) শংকর রঞ্জন সাহা, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) সৈয়দা সারোয়ার জাহান, বিজিবির চট্টগ্রাম রিজিয়ন কমান্ডার মোহাম্মদ আল মাসুম, পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মনির-উজ জামান, বিজিবির পরিচালক (অপারেশন, দক্ষিণ পূর্ব রিজিয়ন) লে. কর্নেল এ আর এম নাসির উদ্দীন, বিজিবির পরিচালক (অপারেশন, অ্যাডহক, কক্সবাজার সদর দফতর) লে. কর্নেল মোহাম্মদ খালেদ, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আলী হোসেন প্রমুখ। বাংলাদেশ প্রতিদিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ