প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

খাবার নেই, তাই রোগী আসে না যে হাসপাতালে!

ডেস্ক রিপোর্ট : হাসপাতালের সবগুলো সাধারণ ওয়ার্ডই ফাঁকা। সিটে কোনো রোগী নেই। ওয়ার্ডের নার্স ও কর্মচারী যে যার যার মতো গল্প করছিলেন। দ্বিতীয় তলায় মাত্র কয়েকটি কেবিনে সাতজন রোগী রয়েছেন। ৭৫ শয্যার রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতালটি রোগীর অভাবে এমনিভাবে খাঁ খাঁ করছে। গত ২৯শে অক্টোবর রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতালে সরজমিন গিয়ে এই চিত্র চোখে পড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাসপাতালটি দুই মন্ত্রণালয়ের টানাটানিতে পথ খুঁজে পাচ্ছে না। পাচ্ছে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো বরাদ্দও। হাসপাতালের কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী জানিয়েছেন, রেলওয়ে হাসপাতালকে জেনারেল হাসপাতাল ঘোষণা করা হলেও রেলের কর্মচারী ছাড়া কাউকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় না। কারণ এই হাসপাতালে রোগীর খাবার একটি মূল ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। রেলের কর্মচারী ছাড়া অন্যদের খাবার দেয়া হয় না। এমনকি রেলে জাতীয় বেতন স্কেলে যারা ১৫ নম্বর গ্রেডে বেতন পান তারাও হাসপাতালে ভর্তি হলে এখান থেকে খাবার পাবেন না। ১ থেকে ১৫ গ্রেডের বেতনভোগীরা যদি রেলওয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তাদের বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসতে হয়। এজন্য এই হাসপাতালে রোগী তেমন আসে না বলে তারা মনে করেন। গত বছর রেলওয়ে থেকে অবসরে গেছেন মোসলেম উদ্দিন। সমপ্রতি তিনি ইউরিন সমস্যায় ভুগছিলেন। এই সমস্যা নিয়ে রেলওয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। হাসপাতালের ৭ নম্বর কেবিনে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন তিনি। মোসলেম উদ্দিন জানান, চাকরি জীবনে তিনি কোনো দিন এই
হাসপাতালে আসেননি। কারণ হিসেবে বললেন, তার বেতন স্কেল ১৫ নম্বর গ্রেডের আগে। তাই হাসপাতালে ভর্তি হলে খাবার-দাবার বাসা থেকে নিয়ে আসতে হয়। এটা একটা ঝামেলা। এখন বিরাট সমস্যার কারণে বাধ্য হয়ে এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। প্রতিদিন বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসেন তার স্বজনরা। তিনি মনে করেন, এজন্য হয়তো বা রোগীর এই হাসপাতালে কম আসেন। এই হাসপাতাল নিয়ে প্রচারও কম। কর্মকর্তারা বলেন, সাধারণ মানুষ জানেই না, এখানে হাসপাতাল আছে। আবার হাসপাতাল থাকলেও মানুষের ধারণা, এটা শুধু রেলের লোকদের জন্য। এ হাসপাতালে যে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা হয়, সেটা কেউ জানে না। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও চায় না বেশি রোগী হাসপাতালে আসুক। এমনও অভিযোগ রয়েছে।
রেলওয়ের অতিরিক্ত বিভাগীয় চিকিৎসক আইএস আবদুল আহাদ বলেন, পথ খুঁজে পাচ্ছে না হাসপাতালটি। কোন্‌ দিকে যাবে। কখনও কখনও বলা হচ্ছে এটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধীনে যাবে। আবার বলা হচ্ছে স্বতন্ত্র হাসপাতাল হিসেবে থাকবে। দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে টানাটানিতে এই পরিস্থিতি। রোগীও কম আসে। একটি সমঝোতা চুক্তি হয়েছে। তা আবার রিভিউ করা হচ্ছে। হাসপাতালটিকে জেনারেল ঘোষণা করা হলেও কোন সক্রিয় কোনো ভূমিকা নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। অধিদপ্তর থেকে কোন বরাদ্দ বা ওষুধ দেয়া হয় না। একবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে কিছু ওষুধ এবং ঢাকার সিভিল সার্জান অফিস থেকে রেলওয়ে হাসপাতালের জন্য কিছু ওষুধ এসেছে। তিনি বলেন, কোড নম্বর না থাকলে ওষুধ পাওয়া যাবে না। এই হাসপাতালের কোড নম্বর নেই। হাসপাতালে খাবার দেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেক আগের একটি আইন আছে। সেই অনুযায়ী এখনও চলছে।
গত ২০১৫ সালে ৩০শে এপ্রিল ঢাকার রেলওয়ে হাসপাতালটি নতুন করে উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ও রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক। সব সরকারি হাসপাতালের মতো সবাইকে সেবা দেয়া ছিল উদ্দেশ্য। এই প্রেক্ষাপটেই সাড়ে পাঁচ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে হাসপাতাল, ঢাকা’র নাম পরিবর্তন করে ‘রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা’ নামকরণ করা হয়। গত বছর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। তবে হাসপাতালটিতে গিয়ে মনে হয়েছে, শুধু নামফলক লাগানো, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর, প্রজ্ঞাপন জারি এবং প্রেষণে ঢাকার বাইরের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে কিছু চিকিৎসককে নিয়ে আসা ছাড়া তেমন কিছু হয়নি। এখন পর্যন্ত সরকারি ওষুধের সরবরাহ শুরু হয়নি। কিছু কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও জরুরি বড় কোনো রোগনির্ণয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয় না। সূত্র জানান, ডাক্তার, নার্স ও কর্মচারী মিলে জনবল রয়েছেন মোট ১০০ জন। এর মধ্যে সাত জন ডাক্তার, ১৫ জন নার্স। ৭ জন চিকিৎসকের মধ্যে প্রেষণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে দুইজন চিকিৎসক এই হাসপাতালে বসেন। হাসপাতালটির নিচ তলায় ৯টি কেবিন পরিত্যক্ত। দ্বিতীয় তলায় ৯টির কেবিনের আবার একটি ফাঁকা রয়েছে। ৭৫টি শয্যা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে ভালো আছে ৪০ থেকে ৪২টি শয্যা। অন্য সিটগুলো ব্যবহার উপযোগী নয়। হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন ১০০ জন রোগী বহির্বিভাগে আসেন।
হাসপাতালটির দেখাশোনার দায়িত্বে আছেন বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা বিভাগীয় চিকিৎসক লুৎফর নাহার বেগম। তিনি জানান, হাসপাতালটি জেনারেল হাসপাতাল ঘোষণা করলেও এখানে জরুরি অপারেশন করার মতো কোনো যন্ত্রপাতি নেই। আর যেসব যন্ত্রপাতি আছে তা দিয়ে রোগীর জরুরি সমস্যা সমাধান করা যায় না। এই নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক হচ্ছে। গত মাসেও এই নিয়ে বৈঠক হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার পরিচালক ডা. কাজী জাহাঙ্গীর এই প্রসঙ্গে বলেন, রেলওয়ে হাসপাতালকে জেনারেল হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণার পর একটি চুক্তি হয়েছিল। তাতে কিছু ঝামেলা হয়েছে। স্টাফ নিয়ে। কারণ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যদি তত্ত্বাবধায়ক দেয়, তাহলে রেলওয়ের স্টাফরা কথা নাও শুনতে পারেন। কারণ অনেক সময়ে রেলওয়ের কর্মচারীদের ফিটনেস সার্টিফিকেট দিতে হয়। এজন্য এখন সিদ্ধান্ত হয়েছে তাদের (রেলের স্টাফদের) জন্য আলাদা একটি ছোট ইউনিট থাকবে। যেখানে তাদের নিজস্ব ডাক্তার থাকবেন। বাকিটা জেনারেল হাসপাতাল হিসেবে পারিচালিত হবে। যা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল হবে। যেটা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধীন চলবে। ওই হাসপাতালের পরিচালক ঢামেক হাসপাতাল থেকে প্রেষণে একজন ডিডিকে (উপ-পরিচালক) ওখানে নিয়োগ দেয়া হবে। পরবর্তীতে রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতালকে এক হাজার শয্যায় এবং কলেজে উন্নীত করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরো জানান, এ বিষয়ে খসড়া তৈরি করা হয়েছে। দু’মন্ত্রী বসে সই করলেই কাজ শুরু হয়ে যাবে। ডা. কাজী জাহাঙ্গীর আশা করছেন এই সরকারের সময়েই তা সম্পন্ন হবে। মানবজমিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ