প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ট্রাম্পের এশিয়া সফর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

ডেস্ক রিপোর্ট : ১২ দিনের সফরে ইতোমধ্যে এশিয়ার মাটিতে পা রেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত ২৫ বছরের মধ্যে কোনও মার্কিন প্রেসিডেন্টের এটাই সবচেয়ে দীর্ঘ সফর। শুরুতে সফরটির মেয়াদ ১১দিন থাকলেও একেবারে শেষ মুহূর্তে তা একদিন বাড়ানো হয়েছে তার প্রশান্ত মহাসাগরীয় এশিয়া সম্মেলনে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তে। এই সফরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে। পরমাণু ইস্যুতে উত্তর কোরিয়ার অবস্থান প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। তবে সব ছাপিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির দিকটি। বিগত ওবামা প্রশাসন তার বিদেশনীতির বিবেচনায় এশিয়াকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন ‘পিভট টু এশিয়া’ নীতির মধ্য দিয়ে। এবার ট্রাম্পের এ সফরের মধ্য দিয়ে এশিয়ায় মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি কোন পথে ধাবিত হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাবে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।

প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে গত দশ মাসে ট্রাম্পের সাংঘর্ষিক বক্তব্য ও তার উপদেষ্টাদের বিভিন্ন বক্তব্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নেতাদের সংশয়ে ফেলে দিয়েছে। ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করায় দেশটির সঙ্গে প্যাসিফিক অঞ্চলের ভবিষ্যৎ বাণিজ্য নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েন বাণিজ্যিক নেতারা। অথচ টিপিপি ছিল এক সময় এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের মূল কৌশল। একই সঙ্গে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মিশ্র বার্তা দিয়ে আসছেন। এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্প এশিয়া সফরে দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন সফর করবেন। ইতোমধ্যে তিনি জাপান পৌঁছে গেছেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এই সফরে ট্রাম্পের উপদেষ্টারা তিনটি গাইডলাইন তৈরি করেছেন। প্রথমত, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক হুমকির বিষয়ে কঠোর অবস্থান, দ্বিতীয়ত উন্মুক্ত ও মুক্ত প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতিশ্রুতি এবং তৃতীয়ত এশিয়ার অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা।

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স সফরের উদ্দেশ্য নিয়ে লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলছেন, ট্রাম্পের এই সফরের লক্ষ্য হচ্ছে, উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে আন্তর্জাতিক সমর্থন ও সহযোগিতা বাড়ানো।

এই সফরে উত্তর কোরিয়া কর্তৃক জাপানের নাগরিকদের অপহরণের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানিয়েছে জাপান টাইমস। দৃশ্যত সব আলোচনায় ট্রাম্প ঘুরে ফিরে উত্তর কোরিয়াকে নিয়ে আসবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া এই সফরেই ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করতে পারেন বলে নিজেই জানিয়েছেন।

 

ট্রাম্পের এই সফরে এশিয়ায় মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির গতিপথ অনেকখানিই স্পষ্ট হবে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’নীতি এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ কমিয়ে আনতে পারে। যদিও এ পর্যন্ত টিপিপি ছাড়া তেমন কোনও পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি। সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামা প্রশাসনের ‘এশিয়া পিভোট’ নীতিকে এখনও বাতিল করেননি ট্রাম্প। ওবামার নীতিতে এ অঞ্চলে মিত্রদের সমর্থন ও সহযোগিতায় মার্কিন উপস্থিতির প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। সফরের আগে হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতেও এই প্রতিশ্রুতির গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে।

আধুনিক কূটনীতির ক্ষেত্রে সশরীরে উপস্থিতি বিরাট ভূমিকা পালন করে। ফলে ট্রাম্পের এশিয়ার পাঁচটি দেশ সফর এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে। এর আগে অক্টোবরে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাথিস বেশ কয়েকটি এশীয় দেশ সফর করেছেন। এছাড়া আসিয়ানের মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিরক্ষা সম্মেলনেও উপস্থিত হয়েছিলেন।

ট্রাম্পের এশিয়া সফর এমন সময় হচ্ছে, যখন এশিয়ার দু’টি প্রধান অর্থনীতির দেশ জাপান ও চীনের নেতৃত্ব শক্তিশালী হয়েছে। জাপানে শিনজো অ্যাবে আগাম নির্বাচন আয়োজন করে পুনরায় নির্বাচিত হয়ে জনগণের ম্যান্ডেট পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র টিপিপি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করলেও বাকি ১১টি দেশকে নিয়ে চুক্তিটি বাস্তবায়নে জাপান চেষ্টা করছে। অনেক এশীয় দেশই জাপানের এই ভূমিকাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে।

এরইমধ্যে এশিয়ার মার্কিন সম্পর্ক জোরদারের আভাস দিয়েছেন ট্রাম্প। শুরুতে পূর্ব এশীয় সম্মেলনে যোগ দিতে আগ্রহী ছিলেন না বিতর্কিত এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সে সময় পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা এই সিদ্ধান্তের নেতিবাচক দিক নিয়ে তাকে সতর্ক করেছিলেন। পররাষ্ট্র বিশেষজ্ঞরা সে সময় আশঙ্কা জানিয়েছিলেন, ট্রাম্প সম্মেলনটি প্রত্যাখ্যান করলে পূর্ব-এশিয়া নামের অঞ্চলটির প্রতি মার্কিন অঙ্গীকার নিয়ে এশিয়ার বন্ধু রাষ্ট্রগুলো উদ্বিগ্ন হতে পারে। সম্মেলন প্রত্যাখ্যানের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তটি নিয়ে আলোচনা করেছেন সাবেক ওবামা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও। তারা বলেছিলেন, সম্মেলনে যোগ না দেওয়ার অর্থ অঞ্চলটিতে চীনা কর্তৃত্বকে নিরঙ্কুশ করা। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি সম্মেলনে অংশ না নেয়, তবে অঞ্চলটিতে নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে চীনা কর্তৃত্ব আরও নিরঙ্কুশ করবে।

আরেক মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্মেলনে উপস্থিত থাকবেন না বলে ট্রাম্প আগে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তা নিয়ে মার্কিন বিশ্লেষকরা উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) থেকে সরে আসা উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে অনেক বেশি প্রাধান্য দেওয়ায় কোনও কোনও বিশ্লেষক আশঙ্কা জানিয়েছিলেন, যদি পূর্ব-এশিয়া সম্মেলনে ট্রাম্প অংশ না নেন, তবে তা ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যতকে প্রশ্নের মুখে ঠেলবে। সফরসূচি পরিবর্তন করে ট্রাম্পের সম্মেলনে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এশিয়া নিয়ে তার আগ্রহের আভাস মেলে।

এদিকে চীনের শি জিনপিং দেশটির কমিউনিস্ট পার্টির গঠনতন্ত্রে নিজের নীতি স্থাপন করে নিজেকে আরও ক্ষমতাশালী করেছেন। পার্টি কংগ্রেসে শি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ক্ষেত্রে চীনের নতুন ভূমিকা পালন ও এশিয়ায় নতুন সমতার লক্ষ্য তুলে ধরেছেন। এ পরিকল্পনার লক্ষ্য, বিশ্বের প্রভাবশালী নেতা হিসেবে শি জিনপিংকে প্রতিষ্ঠা করা। ফলে এটি স্পষ্ট যে, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ক্ষমতার যে কোনও শূন্যতা পূরণের সুযোগ গ্রহণ করবে চীন।

এ সফরে ট্রাম্প শি ও অ্যাবের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করার চেষ্টা করবেন। এই দু’জনের মাধ্যমে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্কের উন্নতি আশা করছে যুক্তরাষ্ট্র।

রাশিয়া সংযোগের তদন্তের নতুন বাঁক বদলের পর ট্রাম্পে এশিয়া সফর হোয়াইট হাউসের একটি অলিখিত নিয়মের ধারাবাহিকতা দৃশ্যমান হচ্ছে। তা হচ্ছে, দেশে যখন পরিস্থিতি খারাপ থাকে তখন বিদেশ সফর করবেন ট্রাম্প। এনপিআর-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প রাশিয়া সংযোগকে পেছনে ফেলতে আলোচনায় নিয়ে আসবেন উত্তর কোরিয়াকে। এমনিতেই ট্রাম্প নিজ দেশে নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছেন। ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই তার ঘাড়ে রাশিয়া সংযোগের অভিযোগ ঝুলে আছে। সর্বশেষ তার সাবেক প্রচারণা ম্যানেজার পল মানাফর্টের আত্মসমর্পণ ও এক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগে নির্বাচনে ট্রাম্পকে রাশিয়ার সহযোগিতার অভিযোগ আরও ডালপালা মেলছে।

এনপিআর-এর স্কট হর্সলে মর্নিং এডিশনকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা এই সফরে প্রধান আলোচ্য বিষয় থাকবে। নির্বাচনি প্রচারণার সময় ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়ার মিত্র দেশ জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সমালোচনা করেছেন। তিনি দাবি করেছিলেন, দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষায় ব্যয় বেশি করছে না, এতে করে যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের অর্থ সেখানে ব্যয় হচ্ছে।

স্কট আরও বলেন, কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প প্রথাগত অবস্থানই নিয়েছেন। মিত্রদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলেছেন। বিশেষ উত্তর কোরিয়ার হুমকি থেকে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে রক্ষার কথা প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যে অসমতার বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনা করে আসছেন ট্রাম্প। কোনও সন্দেহ নেই একই ধরনের বার্তা তিনি ভিয়েতনামে অ্যাপেক সম্মেলনেও দেবেন। জাপানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (এফটিএ) স্বাক্ষর করতে চায়। যুক্তরাষ্ট্রে অ্যাবের সঙ্গে প্রথম বৈঠকেই চুক্তির বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন ট্রাম্প। অ্যাবে হয়ত দ্বিপক্ষীয় এফটিএ প্রত্যাখ্যান করবেন না। এতে টিপিপি রক্ষায় জাপানের শেষ আশাটুকুও শেষ হয়ে যেতে পারে।

সফরে ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়াতে জোর দেবেন। উভয় দেশ ২০১২ সালের কোরাস এফটিএ চুক্তি নিয়ে পুনরায় আলোচনায় শুরু করেছে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা তাকে পরামর্শ দিয়েছেন চুক্তি বাতিল না করার জন্য। ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টি সামনে নিয়ে আসতে পারেন। করাস স্বাক্ষর হওয়ার পর এই বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ১৩ বিলিয়ন থেকে ২৭ বিলিয়নে দাঁড়িয়েছে।

চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক ঘাটতির কথা শির সঙ্গে বৈঠকে নিশ্চিতভাবেই তুলবেন ট্রাম্প। চীনে যুক্তরাষ্ট্রের আরও প্রবেশাধিকার চাইবেন তিনি। বাণিজ্যমন্ত্রী উইলবার রস এই সফরের সময়েই ২৯জন মার্কিন সিইও প্রতিনিধি নিয়ে চীন সফর করবেন। উভয় দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে সমতা আনতে হোয়াইট হাউসের দৃঢ় প্রতিজ্ঞার ফল এটি। ট্রাম্প কখনও চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতির কথা গোপন করেননি। ২০১৬ সালে এই বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছিল ৩০০ বিলিয়ন ডলার।

সর্বাধিক পঠিত