প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কেন ব্যর্থ হলো খালেদের অভ্যুত্থান?

রাহাত মিনহাজ : মুক্তিযুদ্ধের পর অনেক ঘটনা আর দীর্ঘপথ পরিক্রমায় বাঙালি জাতির জীবনে আসে একটি কালো দিন। ১৫ আগস্ট। এক দল উচ্ছৃঙ্খল সেনা সদস্যের হাতে সপরিবারে নিহত হন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। খালেদ মোশাররফ তখন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে সেনবাহিনীর চিফ অব দ্য জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ঢাকার ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল শাফায়েত জামিল লিখেছেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সেনাবাহিনীতে যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল তা খালেদ মেনে নিতে পারেননি। তিনি এই পরিস্থিতির পরিবর্তন চাচ্ছিলেন। খালেদ একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। কর্নেল শাফায়েত জামিল লিখেছেন, খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থান শুরু হয় ৩ নভেম্বর রাত তিনটার দিকে। পরিকল্পনামাফিক ওই সময় বঙ্গভবনে মোতায়েন প্রথম বেঙ্গলের কোম্পানি দুইটি ক্যান্টনমেন্টে চলে আসে। বন্দী করা হয় সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে। নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হলো টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ও রেডিও-টেলিভিশনের। যদিও অভ্যুত্থানের সেই তিন দিন রেডিও বা টেলিভিশন ব্যবহার করেননি মোশাররফ। যার তার অভ্যুত্থানের ব্যর্থতাকে ত্বরান্বিত করে। এদিকে মোশতাক ও খুনি চক্রকে বশে আনতে ৩ নভেম্বর সকাল থেকেই বঙ্গভবনের ওপর চক্কর দিতে থাকে মিগ ও হেলিকপ্টার। এতে ভীত হয়ে পড়ে তারা। এমন পরিস্থিতিতে ক্যান্টনমেন্টে আর বঙ্গভবনের মধ্যে শুরু হয় ফোনালাপ। খুনি চক্র আত্মসমর্পণ করলেও দেশত্যাগের সুযোগ দাবি করে। এদিকে নানা মহলের মধ্যস্ততায় যখন ফোনালাপ চলছিল এরই মধ্যে একসময় জেলখানার অভ্যন্তরে সংঘঠিত হয় আরেক বর্বর হত্যাকা-। শাফায়েত জামিল লিখেছেন, এই হত্যাকা- সম্পর্কে তিনি বা খালেদ ঘুণাক্ষরেও কিছু জানতে পারেননি। আর যখন জেনেছেন তখন ফারুক-রশিদ খুনি চক্র হাত ফসকে বের হয়ে গেছে। এরপরই মোশতাককে সরিয়ে বিচারপতি সায়েমকে রাষ্ট্রপতি করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। বিচারপতি সায়েমকে রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণে রাজি করান খালেদ মোশাররফ, এম.জে. তাওয়াব ও এম.এইচ.খান। এমন পরিস্থিতিতে শারীরিক অবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি দায়িত্ব নিতে না চাইলেও পরে রাজি হন। ৬ নভেম্বর দুপুরে তিনি বঙ্গ ভবনে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। এর আগে সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন খালেদ। নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধান তার কাঁধে মেজর জেনারেলের র‌্যাংক ব্যাচ পড়িয়ে দেন। পরদিন পত্রিকায় সে ছবি ছাপা হয়। এদিক ৬ নভেম্বর বিকেল থেকেই সক্রিয় হয়ে ওঠে জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা। তারা ক্যান্টনমেন্টে উত্তেজনাকর লিফলেট বিলি করে। পরিকল্পনা অনুযায়ি রাত ১২টার পরপরই শুরু হয় সিপাহীদের বিপ¬ব বা অভ্যুত্থান। খালেদ, তিন বাহিনীর প্রধান আর কর্নেল শাফায়েত জামিল, কর্নেল হুদা, কর্নেল এটিএম হায়দার তখন বঙ্গভবনে। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের সাড়ে জড়িত না থাকলেও ঘটানচক্রে ঢাকায় এসে খালেদের সঙ্গে দেখা করেন হায়দার। তারপর ৭ নভেম্বর তার সাথেই নির্মমভাবে নিহত হন। বিদ্রোহের খবর শুনে কর্নেল হুদা ও হায়দারকে নিয়ে বঙ্গভবন থেকে বের হয়ে যান খালেদ। সেখান থেকে ধানমন্ডিতে তার এক আত্মীয়ের বাসায় যান। সেখানে পোশাক পাল্টে সিভিল পোশাকে তারা রওনা হন শেরে বাংলা নগরের দিকে। যেখানে অবস্থান করছে খালেদের বিশ্বস্ত দশক বেঙ্গল রেজিমেন্ট। রংপুর ব্রিগেড থেকে এই ইউনিটকে খালেদই ঢাকায় এনেছিলেন। সিপাহী বিদ্রোহের ঘটনা প্রবাহে বঙ্গবন্ধুর খুনি মেজর মহিউদ্দীনের নেতৃত্বে একটি দল জিয়াকে মুক্ত করে ফিল্ড রেজিমেন্টে নিয়ে আসে। তখন আবার ঘটনাপ্রবাহ নতুন করে মোড় নিতে শুরু করে। যাই হোক, দশম বেঙ্গলকে খালেদ নিরাপদ স্থান মনে করেছিলেন। যা তার জন্য শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়ায়। পরদিন সকালে অর্থাৎ ৭ নভেম্বর সকালে স্বাভাবিকভাবেই হায়দারকে সাথে নিয়ে নাশতা করেন তিনি। কর্নেল শাফায়েত জামিল লিখেছেন, বেলা এগারোটার দিকে খালেদ ও হায়দারকে হত্যা করা হয়। খুব কাছ থেকে খালেদকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে ঘাতকরা। শাফায়েতের ভাষ্য অনুযায়ী ওই রেজিমেন্টের এক অফিসারের নির্দেশে দশম বেঙ্গলের কয়েকজন অফিসার খালেদকে হত্যা করে। এই হত্যাকা-ের ঘটনা প্রবাহ নিয়ে বিভিন্ন মত পাওয়া যায়। এ নিয়ে কোনো বিচার বিভাগীয় কমিশন বা বিচার না হওয়ায় সেদিনের প্রকৃত ঘটনা আজও জাতির কাজে অজানা রয়ে গেছে। কিন্ত কেন কি কারণে ব্যর্থ হয়েছিলো খালেদের অভ্যুত্থান? আসুন সেই বিষয়গুলো একটু খতিয়ে দেখা যাক। অভ্যুত্থানের পর পরই খালেদকে ভারত ও রশিদের চর হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করে ষড়যন্ত্রকারীরা। যাতে তারা অনেকটা সফলও হয়। যেহেতু ডানপন্থী মোশতাক ও তার খুনি মেজরদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান তাই সবাই ধরেই নিয়েছিল এই অভ্যুত্থান তাদের বিরুদ্ধে। ভারতের পক্ষে। আরও একটা ঘটনা খালেদকে বেকায়দায় ফেলে দেয়। অভ্যুত্থানের পরপরই ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকা-ের প্রতিবাদে এক শোক র‌্যালি বের হয়। যাতে নেতৃত্ব দেন খালেদ মোশাররফের মা ও তার ভাই রাশেদ মোশাররফ (আওয়ামী লীগের এমপি)। অনেকেই উল্লেখ করেছেন শোক র‌্যালির সেই ছবি পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর খালেদ তার মা’কে ক্যান্টনমেন্ট থেকে ফোন করে উষ্মার সাথে বলেছিলেন, তোমরা দেখি আমার বাঁচার কোন পথ খোলা রাখবে না। এই ছবি খালেদকে ভারতপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করে। যদিও খালেদ কখনোই ভারতপন্থী ছিলেন না। এই বিষয়টি অভ্য্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রাখে। এছাড়া টানা তিন দিন রেডিও টেলিভিশন বন্ধ থাকায় সারাদেশে ব্যাপক উদ্বেগ উৎকন্ঠা তৈরি হয়েছিল। বলা যায় মোটামুটি দেশ প্রায় অন্ধাকারে ছিল। ছিল না কোন সরকার। বলিষ্ঠ নেতৃত্ব। এছাড়া খালেদের অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল জাসদ বা বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা সম্পর্কে অন্ধকারে থাকা। খালেদ তাদের তৎপরতা সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। ৭ নভেম্বর যখন তারা সশস্ত্র বিপ্লব শুরু করে তখন শাফায়েত জামিলের মাধ্যমে তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারেন।
অন্যদিকে সে সময় মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের আটক সবাই মেনে নিতে পারেনি। জিয়া সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। তাকে আটক আর তার বাধ্যতামূলক পদত্যাগ পরিস্থিতিকে খালেদের প্রতিকূলে নিয়ে যায়। এছাড়া খুনিদের সাথে দেন-দরবার, মোশতাকের সাথে দফায় দফায় বৈঠকও একটা নেতিবাচক আবহাওয়া তৈরি করে। যা চূড়ান্ত রূপ লাভ করে ৬ নভেম্বর। সেদিন নতুন সেনা প্রধান হিসেবে খালেদ দায়িত্ব নেন। তার হাস্য উজ্জ্বল ছবি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। বিষয়টি বিভিন্ন মহল ভালোভাবে মেনে নিতে পারেনি। এছাড়া দ্রুতত সিদ্ধান্ত নিতে না পারা ও নমনীয়ভাব প্রদর্শনের কারণেই তাকে এগিয়ে যেতে হয় এক নির্মম পরিণতির দিকে।
লেখক: প্রভাষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ