প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সহিংস শীতকাল

তারেক : কক্সবাজারে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু শিবিরে যাওয়ার পথে বিএনপি [বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি]’র চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা চালানো হয়। অবশ্য এতে যারা আহত হয়েছেন তাদের বেশিরভাগ ছিলেন গাড়িবহরের সঙ্গে সফরকারী সাংবাদিক। ফেরার পথে তার গাড়িবহর অতিক্রম করে চলে যাওয়ার ঠিক পর মুহূর্তে দুটি বাসে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এসব ঘটনা ঘটে ফেনীতে, খালেদার নির্বাচনী এলাকায়।
এরপর প্রত্যাশা অনুযায়ী অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ চালাচালি হয়। তবে, এঘটনায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে সহিংসতা যে সবচেয়ে অটল ও নির্ভরযোগ্য ফ্যাক্টর তা আবার প্রমাণিত হয়েছে।
এই হামলা বিএনপি’র জন্য আওয়ামী লীগের দুর্বৃত্তপনার প্রমাণ। সংবাদ মাধ্যমের ফুটেজে দেখা যায় আওয়ামী লীগ কর্মীরা হামলা করছে।
হামলা যখন চলছিলো তখন পুলিশ বাহিনীকে নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। আওয়ামী লীগ পাল্টা দাবি করে বলেছে তারা হামলা করলে খালেদা জিয়া ও বিএনপি যে বিপুল প্রচারণা পাবে তাতে তাদের কোনো লাভ নেই।
কিন্তু এবার আরেকটি মাত্রা হলো: মিডিয়া কর্মীদের বহনকারী গাড়িগুলোর ওপর হামলা। বিভিন্ন টিভি স্টেশনের লোগো বসানো গাড়িগুলোর ওপর এসব হামলা হয় এবং এতে মিডিয়া কর্মীরা আহত হন। দু’পক্ষই এসব হামলায় জড়িত থাকার জন্য প্রতিপক্ষকে দায়ী করছে। তবে পুরো মিডিয়া গ্রুপের ওপর হামলা প্রমাণ করলো মিডিয়ার সঙ্গে সহাবস্থান করতে রাজনীতি অপারগ। মিডিয়ার কাজ হলো স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। ধূলিমলিন শীত মওসুমের শুরুতে এই ঘটনা অশান্তির ছিটেফোঁটা মাত্র।
সমস্যার তালিকা
এটা হয়তো কাকতালীয়, কিন্তু রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের আগমন শুরুর পর থেকেই বাংলাদেশে সমস্যা চলছে। অপ্রত্যাশিত একটি উপাদানের আকস্মিক প্রবেশ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রে খুবই বিরক্তিকর আরেকটি উপাদান যোগ করেছে। খালেদা জিয়া রোহিঙ্গা শিবিরে ত্রাণ বিতরণের জন্য যাচ্ছিলেন। অন্যদিকে, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে সঙ্গে অধিকতর বিষাক্ত মসলার মতো আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ষড়যন্ত্র এসেও হাজির হয়েছে, যা রাজনীতিকে আরো বেশি অস্থির ও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যদি একটি সংকট হয়, তাহলে সশস্ত্র শক্তিগুলোর পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট উৎকণ্ঠা সৃষ্টিকারী খবরগুলোও নিয়মিত হয়ে পড়বে। বাংলাদেশি সমাজের রাজনীতি ও নিরাপত্তা এজেন্সিগুলোতে গভীর শেকড়ের সুবাদে ভারতীয় মিডিয়ায় এসব খবর প্রথম উদয় হচ্ছে, ঘটনাবলীকে আরো উদ্বেগজনক করে তুলছে।
প্রথম খবরটি প্রকাশিত হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা প্রচেষ্টা সম্পর্কে, দ্বিতীয় খবরটি ছিলো প্রধান বিচারপতি সিনহার সরকার উৎখাত পরিকল্পনা সম্পর্কিত এবং তৃতীয়টি ছিলো কিছু কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের বৈঠক নিয়ে। এর সবগুলোই একটি বিরক্তিকর প্রবণতার ইঙ্গিত। যদিও প্রতিটি খবর অস্বীকার করেছে বাংলাদেশ সরকার। তবে, এসব খবর শেখ হাসিনাকে বিচলিত করতে পারেনি।
বিচারপতি সিনহার অত্যন্ত অসম্মানজনক বিদায় আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ধূসর রেখাটি মনে করিয়ে দেয়। এটা রাষ্ট্রকাঠামোর দুর্বলতারই পরিচায়ক। এই পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে, শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরে সক্ষম কোনো শাসক মহলের দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা নিকট ভবিষ্যতে দেখা যাচ্ছে না।
তবে, মিডিয়া কর্মীদের ওপর সরাসরি হামলা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয়। ক্ষমতাসীন শ্রেণি যে সুবিবেচনা ও সহিষ্ণুতাকে কোনোভাবেই সহ্য করতে পারছে না এটি তার বহিঃপ্রকাশ। অর্থনৈতিক খাত যেভাবে কাজ করছে তা বিবেচনায় নিয়ে বলতে হয়, মিডিয়ার জানার অধিকারটি সিস্টেমের সঙ্গে একটি দ্বন্দ্ব তৈরি করছে। তাই ওই সিস্টেমের স্বার্থেই একে দাবিয়ে রাখতে হবে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিপক্ষগুলোকে যেভাবে উৎখাত করা হয়েছে এবং অন্তর্কোন্দল সাধারণ ঘটনা হয়ে পড়েছে, এখন ওই আঘাত একেবারে সরাসরি ও ঘন ঘন মিডিয়ার গায়ে লাগছে।
মিডিয়া মালিকদের প্রায় সবাই অনুগত। একটি স্টেশন দাঁড় করানোর জন্য অর্থের প্রয়োজন হয়, বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। তাই কোনো ধনকুবের সরকারের বিরুদ্ধে যাওয়ার মতো ততটা বোকা নন। কিন্তু এই ডিজিটাল যুগে সমস্যা হলো শুধু স্থানীয় মিডিয়াই তথ্যের উৎস নয়। তাই দর্শক আকৃষ্ট করতে মিডিয়াকে খবর প্রচারের ক্ষেত্রে অনেক বেশি নিরপেক্ষ হওয়া উচিত ছিলো। কিন্তু, বাংলাদেশের মিডিয়া এখন এমন এক বাজার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে যেখানে ভারতীয় মিডিয়ার উপস্থিতি প্রবল। সেন্সরশিপেরও সীমা আছে এখন।
এই সবগুলো কণ্টক গত তিন মাসে বাংলাদেশে এসে হাজির হয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীরা প্রবেশ শুরু করে, ষোড়শ সংশোধনী সংকট, বিচারব্যবস্থার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে বিচারপতি সিনহার বিদায়, অভ্যুত্থান ও হত্যা প্রচেষ্টার বহুসংখ্যক খবর, রাজনৈতিক সহিংসতা ও মিডিয়া কর্মীদের ওপর হামলা। এই সবগুলো ঘটনাই ঘটেছে অত্যন্ত স্বল্পসময়ে মাত্র তিন মাসের মধ্যে। মানুষের মন আচ্ছন্ন করেছে ঢাকার ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। এই চরম অনিশ্চয়তা বা বাংলাদেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে একটি শক্তি ফায়দা হাসিল করতে চায় বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। রাজনীতিতে সবকিছু সম্ভব বলে ষড়যন্ত্র তত্ত্বে কান না দেয়ার মানে হলো, প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়া সিস্টেমটি ওই বিন্দু পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
কোনো বিপর্যয় ঘটলে, বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। আর যদি তা না ঘটে এবং একই অবস্থা চলতে থাকে রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্টরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও জনগণের কাছ থেকে খুব বেশি বিলাপ শোনা যাবে না। কিন্তু যে সমাজে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রবল শত্রু হিসেবে দেখা হয় সেখানে অভ্যন্ত কাজগুলো দ্রুত ফুরিয়ে যাবে। এমনটা মনে করার কারণ নেই। রাজনীতি ঠিক এভাবে কাজ করে না।
সূত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটর । মানবজমিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ