প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নৌকাডুবি এবং আমাদের শিক্ষাপ্রভুরা


মঞ্জুরুল আলম পান্না : সবাই খুব ব্যস্ত, ব্যস্ত অনেক বড় বড় বিষয় নিয়ে। প্রধান বিচারপতির সুস্থতা অসুস্থতা কিংবা ছুটি নিয়ে অনেক কথা হয়, রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীদের গাড়িবহরে হামলা নিয়ে উত্তপ্ত হয় রাজনৈতিক অঙ্গন, রোহিঙ্গা ইস্যুতেও রাজনীতিতে ব্যস্ত বড় দুই দল, বড় বড় অবকাঠামোর গড়ে তোলা নিয়ে সরকারের প্রচারণা যেমন সরগরম তেমনই সরগরম বিরোধীদলের প্রচার-প্রচারণা সেসব প্রকল্পের দুর্নীতি নিয়ে, নির্বাচন কমিশনের সংলাপ নিয়ে প্রত্যেকে ব্যস্ত নিজেদের সুবিধা মতো নির্বাচনী কৌশলের আবদার জানানোতে। অবশ্যই এগুলোর সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দেশের কোমলমতি শিশু-কিশোরদের শিক্ষা জীবন নিয়ে চরম উদাসীনতা আর কত?
প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকের পাঠ্যপুস্তকে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, পরীক্ষকদের প্রতি উত্তরপত্রে নম্বর বেশি করে দেওয়ার মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয় শতভাগ পাশ দেখানোর জন্য, লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জীবন পঙ্গু করে দেওয়া হলেও লাগাম টেনে ধরা যায় না হাজার হাজার কোটি টাকার কোচিং বাণিজ্যের, বছরের পর বছর ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা না গেলেও পরীক্ষা শুরুর আধ ঘণ্টা আগে কেন্দ্রে প্রবেশের অনৈতিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয় নিরাপরাধ পরীক্ষার্থীদের ওপর, একের পর এক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আর মেডিকেল কলেজের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করা হচ্ছে কেবল বিত্তবানদের সন্তানদের পড়াশুনার জন্য।
নৌকা ডুবি দুর্ঘটনার শিকার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার বীরগাঁও স্কুল অ্যান্ড কলেজের দেড় শতাধিক জেএসসি পরীক্ষার্থীকে নিয়ে কারোর সামান্যতম ভাবনা চোখে পড়ল না, তাদের কোনো কথা শোনা গেল না। জেএসসি পরীক্ষা শুরুর দিনে ওই দুর্ঘটনায় দুজন পরীক্ষার্থীর মৃত্যু হলো, কয়েক জনের ঠিকানা হলো হাসপাতাল। প্রথম দিনের পরীক্ষায় অনুপস্থিত রইল ১৮ জন, দ্বিতীয় পরীক্ষায়ও অনুপস্থিত ১১ জন। পাগলা নদীতে প্রবেশপত্র হারিয়েছে ৩২ জন। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে কাঁদা মাখা ভেজা শরীরে, খালি পায়ে, চোখে মুখে আতঙ্ক নিয়ে যেসব পরীক্ষার্থী শেষমেষ পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাল তারা কতোখানি কী লিখতে পেরেছে তা খুব সহজেই অনুমেয়। প্রথম পরীক্ষায় খারাপ করার পর প্রচ- হতাশা নিয়ে নিশ্চয় পরের পরীক্ষাগুলো দিয়ে যাচ্ছে আতঙ্কগ্রস্থ ছেলে-মেয়েগুলো। অথচ এ বিষয়ে গত চার দিনে শিক্ষা মন্ত্রনালয় কিংবা সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে কোনো কথা বলতে শোনা গেল না। ওই দেড় শতাধিক পরীক্ষার্থীর জীবন নিয়ে কোনো ভাবনাই যেন নেই উপরওয়ালাদের, দায়িত্ব তো দূরের কথা।
একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাবলিক পরীক্ষার কেন্দ্র অন্য বিদ্যালয়ে হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ব্যবস্থা যখন সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের জন্য হুমকী হয়ে দাঁড়ায় তার বিকল্প নিয়ে ভাববার প্রয়োজন রয়েছে। এমন অবস্থায় প্রয়োজনে ওই ধরনের বিদ্যালয়ে অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা এসে ডিউটি করবেন। তেমনটা তো হতেই পারে। খোঁজ নিয়ে জেনেছি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার বীরগাঁও স্কুল অ্যান্ড কলেজের কাছে আরেকটি স্কুল রয়েছে। সেখানে পরীক্ষা কেন্দ্রের ব্যবস্থা না করে পাঁচ কিলোমিটার দূরের তাও আবার নদী পার হয়ে যেতে হয় হয় এমন কোনো বিদ্যালয়ে অন্য বিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থীদের জন্য কেন্দ্র নির্ধারণের মতো এমন অসুস্থ’ সনাতনী সিদ্ধান্ত বছরের পর বহাল থাকে কী করে?
গত বুধবারের নৌকা ডুবির ঘটনায় গতানুগতিক ধারায় একটা তদন্ত কমিটি হয়েছে। ধরে নিলাম প্রয়োজনীয় সংখ্যক নৌকার ব্যবস্থা না করায় অতিরিক্ত চাপে নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে। ধরে নিলাম তদন্তে প্রমাণও হলো যে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে দুর্নীতি কিংবা গাফলতির জন্য বীরগাঁও স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কারণে ওই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। প্রমাণ পাওয়া গেলে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে যদি ব্যবস্থা নেওয়া হয় তো ভাল কথা। কিন্তু প্রথম পরীক্ষাটা ভাল করে দিতে না পারা কিংবা একেবারে অংশগ্রহণ করতে না পারায় যে চরম হতাশা গ্রাস করল দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীর জীবন তার কী হবে? হতভাগা ওই পরীক্ষার্থীরা আবার তাদের পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে তদন্ত কমিটির কাছে। তাদের এই দাবিপূরণ কি এতোটাই কঠিন, এতোটাই জটিল? আর জটিল কিংবা কঠিন যদি না হয়ে থাকে তবে তাদের দাবিপূরণের সিদ্ধান্ত যেন অতি দ্রুতই জানিয়ে দেওয়া হয়। তবে অন্তত বাকি পরীক্ষাগুলো প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত ওই শিক্ষার্থীরা খানিটা স্বস্তির সঙ্গে দিতে পারবে।

লেখক : সাংবাদিক
সম্পাদনা : আশিক রহমান

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ