প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

হাড়হিম করা অভিজ্ঞতা! তবুও রক্তমাখা ভিটেতেই ফিরতে চায় রোহিঙ্গারা

 অরজিৎ দাস চৌধুরি, কলকাতা থেকে: দিনটা ছিল শুক্রবার। দুপুরের নমাজ পড়ে সবে দোকানে গিয়েছিলেন তিনি। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে একটা হইচই ভেসে এল। প্রথমেই ছুটে গেল বড় মেয়ে সাকিনা। কিন্তু আধঘণ্টা কেটে গেলেও সেও ফিরল না। বিপদ আঁচ করে বাধ্য হয়ে রান্না ফেলে বাইরে এগোলাম।
তিন চার পায়ের বেশি এগোতে পারলাম না। ঘরে ততক্ষণে ঢুকে এসেছে জনা চারেক ষণ্ডামার্কা মগ যুবক। পিছন পিছন সেনাবাহিনীর আরাকান জওয়ানরা নিয়ে এল স্বামী ও মেয়েকে। দেখলাম, ১৭ বছর বয়সি মেয়ের শরীরের অর্ধেকের বেশি জামা ছেঁড়া। স্বামী এনামুলের পেট ও মুখ থেকে দর দর করে রক্ত ঝরছে। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেলেও লজ্জায় মুখ বন্ধ করে রেখেছে সাকিনা। দেখে যেই না আর্তনাদ করে উঠেছি সেই ছুটে এসে মুখ চেপে ধরল মগরা। অন্য বাচ্চাগুলোকে একটা ঘরে ঢুকিয়ে দিল। পিঠ মোড়া দিয়ে আমায় বাঁধল, সঙ্গে মুখেও কাপড়। স্বামী আপত্তি করতে ফের বেয়নেট দিয়ে পর পর দুই বার পেটে ঢুকিয়ে দিল আরাকান সেনারা। আর মেয়েটাকে নিয়ে রীতিমতো লোফালুফি করছিল মগ গুন্ডারা। পরে বাবা-মায়ের সামনেই কার্যত সমস্ত জামাকাপড় ছুরি দিয়ে কেটে কেটে ফালাফালা করল দস্যুরা। যতবার মেয়ের উপর হামলা হচ্ছিল, ততবারই বাবা প্রতিবাদ করেছে। আর ততবারই ছুরি আর বেয়নেট ঢুকছে তার শরীরে। একসময় স্বামী নিস্তেজ হয়ে প্রাণ হারালেন চোখের সামনে। পর পর অমানুষিক পাশবিক অত্যাচার করে শেষে গলা কেটে দিয়ে গেল মেয়ের। চোখের সামনে স্বামী আর মেয়েকে খুন আর ধর্ষণের নির্মম দৃশ্যের বর্ণনা দিচ্ছিলেন রাখাইনের মংডু জেলার রারাং গ্রামের লায়লা বেওয়া।
কক্সবাজার থেকে প্রায় ৪৮ কিমি রাস্তা পেরিয়ে মিয়ানমার সীমান্তের উখিয়ার বালুখালি-১ শরণার্থী শিবিরে যখন লায়লার মুখোমুখি হলাম তখন সূর্য মাথার উপরে। ঘড়িতে বৃহস্পতিবার দুপুর দুইটা বেজে গেলেও দিনের খাবার জোটেনি। ত্রাণ নিতে এসে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। সঙ্গে চারটি শিশু আর বৃদ্ধা শাশুড়ি। প্রাণ বাঁচাতে নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশ পালিয়ে আসার সময় স্রোতে ভেসে গিয়েছে সাত বছর বয়সি ছেলে আশরাফ। জ্বরে ভুগছে চার বছর বয়সি সুরাইয়া। বাংলা শব্দ দু’একটি থাকলেও রোহিঙ্গা জাতির নিজস্ব ভাষায় কথা বলছিলেন লায়লা। চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথার মিল থাকলেও বার্মিজ ভাষায় লেখাপড়া করেছেন। দোভাষী হিসাবে কক্সবাজার থেকে সঙ্গে যাওয়া শঙ্কর বড়ুয়াই প্রতিটি কথার অর্থ বলছিলেন। কিন্তু চোখে মুখে যে যন্ত্রণা ও লড়াই—জেহাদের অভিব্যক্তি ফুটে উঠছিল তা চমকে দেওয়ার মতোই। বাঁশের অস্থায়ী শিবিরে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, “বার্মিজ সরকারকে রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি দিতেই হবে। যেদিন জাতিকে অধিকার দেবে সেদিনই ফিরে যাব।” এত ভয়াবহ পাশবিক অত্যাচার দেখার পরেও ফিরবেন ? প্রশ্ন শেষ করতে দিলেন না চার সন্তানকে নিয়ে বাঁচার লড়াইয়ে নামা ৪০ পেরনো লায়লা। বললেন,“ওই মাটিতে আমার স্বামী-মেয়ে মারা গিয়েছে। ওখানে আমার সন্তান-স্বামীর রক্ত মিশে গিয়েছে। যতই ওরা বাড়ি ঘর পুড়িয়ে দিক না কেন, ওখানে ফিরবই।” পাশ থেকে একইভাবে সমর্থন জানালেন আরেক সর্বস্ব হারানো বৃদ্ধা আমিনা বেওয়া।
উপমহাদেশের এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় সংকট রোহিঙ্গা শিবির দেখতে বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকায় হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরে পা দেওয়ার পর থেকেই মায়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে আমজনতার উত্তাপ টের পেলাম। বিমানকর্মী থেকে যাত্রী, বা বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্বশীল অফিসার- সবার মুখেই রোহিঙ্গা সমস্যা। এবং তা সমাধানের পথ অন্বেষণ। আন্তর্জাতিক লাউঞ্জ থেকে ডোমেস্টিক লাউঞ্জে পা দিলাম, কক্সবাজারের বিমান ধরব। কানে এল- “দাদা চললেন কোথায়?” পিছন ফিরে দেখি, কলকাতায় এক সময় ডেপুটি হাই কমিশনার পদে থাকা আবিদা ইসলাম। সঙ্গে আরেক কূটনীতিক মাহবুব আলম সালেহ। আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টের একটা উচ্চ পর্যায়ের টিম নিয়ে এই দু’জনে শরণার্থী শিবিরে যাচ্ছেন। রাখাইনে কতটা নির্মম ও অমানবিক অত্যাচার চালাচ্ছে সু কি সরকার তা আজ দেখানো হবে আমেরিকান টিমকে।
উখিয়া চেকপোস্ট পেরিয়ে কুতুপালং এলাকা দিয়ে যখন শরণার্থী শিবিরে ঢুকছিলাম তখন রাস্তার দু’পাশে দেখে শুধুই কালো কালো বোরখা পরা মহিলা। কোলে শিশু, সঙ্গে কিশোর। রোহিঙ্গাদের একটা নির্দিষ্ট জোনে আটকে রাখতে চাইছে শেখ হাসিনা সরকার। তাই প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে হাজার হাজার কালো ত্রিপলের বাড়ি। পাহাড়ি জঙ্গল কেটে দ্রুত ঘর তৈরি করে নিচ্ছেন শরণার্থীরা। কাঠ ও বাঁশ দিয়ে রোহিঙ্গারাই নিজস্ব বাজার থেকে শুরু করে মসজিদ বানিয়েছেন। তবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সরকারি টাকায় তৈরি মাইলের পর মাইল সবুজ অরণ্য, সামাজিক বনসৃজন প্রকল্প। হাসিনা সরকার এদিনও একটা বস্তায় মশারি, চিঁড়ে, ডাল ও জামাকাপড় দিল। তা নিতে ছবি দেওয়া নতুন রেজিস্ট্রেশন কার্ড হাতে শিশু-বৃদ্ধা-মধ্যবয়স্ক সবাই ভিড় করেছে। সেই লাইনে যেমন লায়লা বেওয়া দাড়িয়ে তেমনই মংড়ুর একটা পঞ্চায়েতের (স্থানীয় ভাষায় ওকাড়া) প্রধান নুরুজ্জামানও আছে। তবে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে কিন্তু শুধু মুসলিম নেই, আছেন হাজারখানেক হিন্দুও। তাঁদের জন্য অবশ্য আলাদা ক্যাম্প হয়েছে।
সূত্র- সংবাদ প্রতিদিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ