প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দুই জোড়া খুনে চাঞ্চল্য
মা-ছেলে খুনে ফিল্মি রহস্য

শিমুল : ‘বন্ধু তুমি, শত্রু তুমি’। শাওন কথাচিত্রের ব্যানারে গত ২০১১ সালে মুক্তি পাওয়া এই চলচ্চিত্রের প্রযোজক ছিলেন শেখ আবদুল করিম।

এ ছাড়াও ‘মাই নেম ইজ খান’সহ অনেক চলচ্চিত্রের প্রযোজক আবদুল করিম। গত বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর কাকরাইলে নিজ বাসায় নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন তার প্রথম স্ত্রী শামসুন্নাহার ও ছেলে শাওন। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজন হিসেবে তারই তৃতীয় স্ত্রী শারমিন আক্তার মুক্তাকে আটক করেছে পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্দার কাহিনীই যেন এবার করিমের নিজের জীবনে এসে ধরা দিয়েছে। প্রথম স্ত্রী ও সন্তান খুনের ঘটনায় তারই আরেক স্ত্রীকে আটক করা হয়েছে। হয়ত শিগগিরই পুরো রহস্য উন্মোচিত হবে। কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া খুনিদেরও আইনের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে। বুধবার গভীর রাতে নয়া পল্টনের ৩৮/বি নম্বর বাড়ি থেকে আবদুল করিমের তৃতীয় স্ত্রী মুক্তাকে আটক করা হয়। এর আগে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয় গৃহকর্তা আবদুল করিম, দায়োয়ান নোমান এবং গৃহকর্মী রাশিদাকে। গতকাল দুপুরে শামসুন্নাহারের ভাই মুফতি আশরাফ আলী বাদী হয়ে অজ্ঞাতদের আসামি করে রমনা থানায় একটি মামলা করেছেন।

জানা গেছে, আবদুল করিম তিনটি বিয়ে করেছেন। ঢাকাই চলচ্চিত্রের প্রযোজক হওয়ার কারণে তার অনেক ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ছিল। তাদের অনেককে নিয়ে তিনি মাঝে মাঝেই বিদেশে উড়াল দিতেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ির পর চার বছর আগে তিনি মুক্তাকে বিয়ে করেন। মুক্তাও চলচ্চিত্রে অভিনয় করতেন। করিমের তিন স্ত্রীই ঢাকায় থাকেন। প্রথম সংসারে তার তিন ছেলে। বড় সন্তান মুন্না যুক্তরাজ্য প্রবাসী, দ্বিতীয় ছেলে অনিক কানাডা প্রবাসী তৃতীয় ছেলে শাওন মায়ের সঙ্গে নৃশংসভাবে খুন হয়েছে। দ্বিতীয় সংসারে রয়েছে এক ছেলে (১৭)। ডিভোর্সের পর ছেলেকে নিয়ে দ্বিতীয় স্ত্রী ঢাকাতেই বসবাস করতেন। একাধিক নারীসঙ্গ এবং একের পর এক বিয়ের কারণে করিমের সংসারে দীর্ঘদিন ধরেই অশান্তি চলে আসছিল বলে আশপাশের ভবনের বাসিন্দারা  জানিয়েছেন। এ কারণে মাঝেমধ্যেই প্রথম স্ত্রী শামসুন্নাহারকে মারধর করতেন করিম। কাকরাইলের একটি ছয় তলা বাড়ির মালিকানা ছিল নিহত শামসুন্নাহারের নামে। এজন্য মুক্তা একটি বাড়ি তার নামে রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার জন্য করিমকে চাপ দিয়ে আসছিলেন। নিহত শামসুন্নাহারের ভাই মুফতি আশরাফ আলী জানান, যখন তার বোন শামসুন্নাহারের বিয়ে হয় তখন আবদুল করিম দরিদ্র ছিল। পুরান ঢাকার শ্যামপুরে আড়ৎ ব্যবসা তার জীবন পাল্টে দিয়েছে। পরে ফিল্ম ব্যবসাও শুরু করেন। এই সুবাদে নায়িকাদের সঙ্গে দেশ-বিদেশে ভ্রমণ করতেন। তার ভগ্নিপতি করিম এ পর্যন্ত চারটি বিয়ে করেছেন। সর্বশেষ বিয়ে করেন অভিনয় শিল্পী মুক্তাকে। তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি মুক্তা ও করিম কাকরাইলের ভিআইপি রোডের ৭৯/১ নম্বর মায়া কানন বাড়িতে গিয়ে ভাঙচুর ও তার বোনকে মারধর করেন। এ ঘটনায় শামসুন্নাহার থানায় জিডি করার জন্য তার সঙ্গে পরামর্শ করেন। জিডি করব করব বলে করা হয়নি। এর মধ্যেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে গেল। মুক্তা ও করিম দুজনে তার বোন শামসুন্নাহার ও তার ভাগ্নে শাওনকে খুন করেছে বলে ধারণা আশরাফের। জানা গেছে, আবদুল করিম এক সময় মাথায় করে তরকারি বিক্রি করতেন। কিন্তু কালের পরিক্রমায় তিনি কোটিপতি বনে গেছেন। এর পেছনে পুরান ঢাকার আড়ত ব্যবসা, জমিজমা ও বাড়ি দখল অন্যতম। তার বিরুদ্ধে আদালতে অর্ধশত মামলা রয়েছে। এক পর্যায়ে চলচ্চিত্রে ছবি প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত হন করিম। তার প্রথম স্ত্রী শামসুন্নাহার খুবই পর্দানসিন ছিলেন। তিনি বাড়ির দারোয়ান নোমানকে দিয়ে ভাড়া উঠাতেন। মায়া কানন ভবনের ষষ্ঠ তলার ভাড়াটিয়া জাকির হোসেন বলেন, করিমের নৈতিক অধঃপতন দেখে প্রথম স্ত্রী বাধা দিতেন। এজন্য তাকে প্রায়ই মারধরও করা হতো। কিন্তু তিনি নীরবে সয়ে গেছেন। তার বড় ছেলে মিশু লন্ডন রয়েছেন। মেঝো ছেলে অনিককে ৬ মাস আগে কানাডায় পাঠানো হয়েছে। আর ছোট ছেলে শাওন উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের ও লেভেলে পড়ত। মায়ের খুনিদের বাধা দেওয়ায় শাওনকেও খুন করা হয়েছে বলে তার ধারণা। প্রতিবেশী মোজাম্মেল জানান, নিহত শামসুন্নাহার খুবই ধার্মিক মহিলা ছিলেন। তিনি সবার সুবিধার জন্য বাড়ির নিচে নামাজের জায়গা করে দিয়েছিলেন। গতকাল সকালে মায়া কানন বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির নিচের কলাপসিবল গেট খোলা রয়েছে। সিঁড়িতে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। এই ভবনেরই ৪র্থ তলায় রক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে। সেখানেই খুন হন মা-ছেলে। ৪র্থ ও ৫ম তলার প্রতিটি ফ্ল্যাটই তালাবদ্ধ। দ্বিতীয় তলায় বসবাস করেন উইলস লিটন ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক আবদুল আজিজ। তৃতীয় তলায় রয়েছে একটি অফিস। ঘটনাস্থলে পুলিশের অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তাদেরই একজন পুলিশের রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার নাবিদ কামাল শৈবাল জানান, গত বুধবারের ঘটনায় আজ (বৃহস্পতিবার) মামলা হয়েছে। পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করেই এ হত্যাকাণ্ড বলে আমাদের ধারণা। ২/১ দিনের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন হবে বলে আশা করছি। জানা গেছে, করিমের তৃতীয় স্ত্রী মুক্তার বাড়ি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে। মুক্তার বাবা পুলিশের একজন কনস্টেবল। অভিনয়ের সূত্র ধরেই করিমের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এক পর্যায়ে তারা বিয়ে করেন।

সূত্র : বিডি-প্রতিদিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত