প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বেশুমার খেলারাম : যত খেলা তত ফাউল

মোস্তফা কামাল : ঘরে-বাইরে সবখানে খেলারামের মৌসুম বুঝে খেলায় নেমেছে পাকিস্তানও। অস্থির সময় টের পেয়ে বাংলাদেশ নিয়ে দেশি-বিদেশি নানা খেলার রেসে যোগ হলো দেশটি।

এর আগেও ঢাকায় পাকিস্তান দূতাবাস কর্মকর্তাদের কারও কারও খেলা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। ধরা পড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশও ছাড়তে হয়েছে পাকিস্তানি কোনো কোনো খেলারামের। এবারের ভার্চুয়াল খেলায় অ্যাকচুয়ালি কী টার্গেট ছিল তাদের? জবাব এখনো রহস্যাবৃত।

পাকিস্তান অ্যাফেয়ার্স নামে একটি ফেসবুক পেজে ছড়ানো হয়েছে ১৩ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও। এর বিষয়বস্তু একেবারেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ এবং বড় দুই দল আওয়ামী লীগ-বিএনপির দীর্ঘ বিতর্কিত উপাদান। পাকিস্তান হাইকমিশনের ফেসবুক পেজে শেয়ার করা ভিডিওতে বলা হয়েছে, শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতাই চাননি; তিনি চেয়েছিলেন স্বায়ত্তশাসন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নন, জিয়াউর রহমানই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক— এ কথাও বলা হয়েছে। ভিডিওর শেষদিকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানে আটক থাকার সময় তাঁর দেখভালকারী ছিলেন বলে দাবিদার এক পাকিস্তানি পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য। ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, ‘এমনকি ভুট্টো যখন মুজিবকে জানালেন যে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে এবং পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে, তখন মুজিব বলেছিলেন, এখনো সময় আছে।

তাকে রেডিও ও টেলিভিশনের মাধ্যমে জনগণের উদ্দেশে ভাষণ দিতে দেওয়া হোক। তিনি পুরোপুরি স্বাধীনতা থামাতে পারবেন। তবে ভুট্টো এটি প্রত্যাখ্যান করেন। পাকিস্তান হাইকমিশনের ফেসবুক পেজে অন্য দেশের প্রতি বিদ্বেষমূলক প্রচারণা চালানো হয়েছে এর আগেও। এবার বাংলাদেশ নিয়ে ভিডিওটি প্রকাশ করা হলো বড় অস্থির সময়ে। যখন নানা ইস্যুতে বাংলাদেশ এমনিতেই উত্তপ্ত।
এদিকে বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতের প্রচারণা খেলাও কিছুদিন ধরে মাত্রা ছাড়ানো। তাদের বিষয়বস্তু আলাদা। তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি নানা গল্প প্রচার করছে স্পর্শকাতর বিষয়েও। সরকারি কর্মকর্তা তথা সচিবরা কেন এ অসময়ে আরও সুবিধা হাসিলের দাবি তুলে প্রধানমন্ত্রীকে বিরক্ত করে ছাড়ছেন? নিয়মিত সুযোগ-সুবিধা বাড়ছেই তাদের। সদ্য নতুন সুবিধার মধ্যে রয়েছে, সচিব ও সচিব পদমর্যাদার চাকরিজীবীদের বাবুর্চি ও প্রহরীদের বেতন বাবদ মাসিক ৩২ হাজার টাকা করে ভাতা। সেটা এ দুই পদের লোক রাখলেও পাবেন, না রাখলেও পাবেন। এতেও তারা সন্তুষ্ট নন। ঠকছেন মনে করছেন। তারা আরও চান। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরও নিজেদের প্রাধিকার সুবিধা চান। অর্থাৎ অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) থাকার সময় গাড়ি, বাড়ি, গৃহকর্মীসহ যেসব সুবিধা তারা পান। পেনশন ভোগের সময়ও সেসব সুবিধা তারা চাচ্ছেন। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার বয়সসীমা চান ৬২ বছর। নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান প্রকাশের জন্য প্রতীক বরাদ্দ। সিনিয়র সচিবের পদ বাড়াতেও প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন সচিবরা। সিভিল প্রশাসন এগোবে, আর খেলারামের ক্রিয়াকর্মে পুলিশ পিছিয়ে থাকবে? তারাও আরও উপরি চায়। গণমাধ্যমে রাজধানীর ফকিরাপুল এলাকায় সিআইডির সাব-ইন্সপেক্টর সুশান্তর ৪৫ লাখ, ফরিদপুরের এসপি সুভাষ সাহার আট কোটি টাকা হাতানোর খবর কী বার্তা দেয়? লুকানোর মতো ঘটনা নয় যে, বাড়তি কামাই-রোজগারের মোহে গ্রেফতারবাণিজ্য আরও চাঙ্গা করে তুলেছে পুলিশ। ব্যবসায়ী ও তরুণদের বিরুদ্ধে ইয়াবাবাজির অভিযোগ তুলে পুলিশের বাড়তি আয়ের কয়েকটি ঘটনা প্রকাশ হয়ে পড়েছে। পকেটে বা জুতার ভিতরে ইয়াবা ঢুকিয়ে দিয়ে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের পথে পুলিশের জনরোষে পড়ে মার খাওয়ার কাণ্ডও ঘটেছে। এর মধ্যেই কক্সবাজারের টেকনাফে সেনাবাহিনীর হাতে মুক্তিপণের টাকাসহ হাতেনাতে ধরা পড়েছে ডিবি পুলিশের সাত সদস্য। আরেকজন পালাতে পেরেছে আমানে আছানে। একটা দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বাড়তি কামাইয়ের জন্য মানুষকে অপহরণ করছে। ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়ছে। এটি পুলিশের সামগ্রিক চিত্র নয়। তবে আংশিক চিত্র। এমন ঘটনা নিয়মিত বিরতিতে ঘটছে। নিয়মিত বিরতির ঘটনাকে একেবারে বিচ্ছিন্ন বলে উড়িয়েও দেওয়া যায় না। ঘটনা বা এর জের কি শেষ? এ ঘটনার আগে-পরে কিছু খেলা ও ফলোআপের কথাও কিন্তু বাতাসে উড়ছে।

যতসব খেলাবাজির মধ্যেই খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনা। রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখতে কক্সবাজার যাওয়ার পথে ফেনীতে তার গাড়িবহরে কারা হামলা করেছে তা আর কারও অজানার মধ্যে নেই। আওয়ামী লীগ থেকে বলা হয়েছে এটা বিএনপির সাজানো নাটক। ছবিতেই স্পষ্ট তারা সবাই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী। তাহলে কে সাজাল তাদের? কোন খেলারামরা করল এ আয়োজন? দায় এড়ানো মহল কি জানেন, এত বেশি খেললে ফাউলও বেশি হয়? একভাবে সাজানো ছক পরে আরেক ফরমেটে সেজে ওঠে। এক্ষেত্রে এসে যায় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার জনসভায় গ্রেনেড হামলার ঘটনার প্রসঙ্গ। ঘটনার পর ক্ষমতাসীন বিএনপির মন্ত্রী-নেতারা বলেছিলেন, সেটা আওয়ামী লীগেরই খেলা। শেখ হাসিনার ভ্যানিটি ব্যাগেই ছিল গ্রেনেড। কথা ও খেলার সেই বাতিক এখন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা নিয়েও। সেই ফাউল গেম শেষতক কোথায় গড়িয়েছে, খেলারামদেরই বা কী দশা এখন?

নানামুখী খেলার এ ময়দানে কেউ কাউকে ফেলনা ভাবছে না। স্বরাজ সবাই। নিজ নিজ গণ্ডিতে যার যার হুকুমত কায়েম। স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা প্রাইভেট ট্রেডিংয়ে উপরি কামাচ্ছেন। প্রশ্ন ফাঁসে অবদান রেখে বেনিফিশিয়ারি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কনসালটেন্সিতে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইভিনিং প্রোগ্রামে। ডাক্তাররা মত্ত প্রাইভেট প্র্যাকটিসে। হাসপাতালের রোগী পাঠাচ্ছেন বাইরের হাসপাতাল-ক্লিনিকে। ছুরি-কাঁচি, ব্যান্ডেজ ভিতরে রেখে পেট সেলাই। অপারেশন ফেলে সেলফিতে ব্যস্ততা। ইঞ্জিনিয়াররাও স্বরাজে। ঠিকাদারের সঙ্গে মিলে রডের কাজ সারছেন বাঁশ দিয়ে। আড়তদার, মজুতদার, দোকানদার সিন্ডিকেটিংয়ে বাজার গরম। বাড়িওয়ালা নানান ছুতায় ভাড়া বাড়াচ্ছেন। পুলিশ কনস্টেবলও স্যার না ডাকলে কষে মারে। ইন্টার্ন ডাক্তারেরও আশা রোগী এবং রোগীর স্বজনরা তাকে স্যার বা ম্যাডাম ডাকবে। নইলে মার। গণমাধ্যমে এসেছে সেই খবর। আবার জেলা প্রশাসক আশা করেন সরকারি ডাক্তার যখন-তখন তার ডাকে অফিসে বা বাসায় চিকিৎসা দিতে ছুটে আসবেন। নইলে ওএসডি। নিজের ফেলে আসা দলিত বা দুর্বল অবস্থানের প্রতিশোধ নিতে এ তাছিল্যের পরাক্রমশালীতার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আমরা টের পাচ্ছি মাঝেমধ্যে। কিন্তু যাবতীয় বদনাম সরকারের। দায় প্রধানমন্ত্রীর। সাফল্যের হকদার মন্ত্রীরা। আর বিভিন্ন মন্ত্রীর অনিয়ম, দুর্নীতি, ব্যর্থতার সমালোচনার ভাগিদার প্রধানমন্ত্রী। কাঁচা মরিচ, পিয়াজ, চালের চড়া দাম থেকে শুরু করে পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস পর্যন্ত যাবতীয় দুষ্কর্ম ও ব্যর্থতার জন্য দায়ী করা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীকে।

সময়ের এ অস্থিরতা ও কঠিন বাঁক মালুম করতে পেরে অসুস্থ চর্চা বেড়ে গেছে দেশের অভ্যন্তরেও। প্রাতিষ্ঠানিক এবং সাংগঠনিক ব্যক্তিদের পাল্টা চেহারা ধরা পড়ছে। আলো- আঁধারের খেলা আঁচ করতে পেরে তাদেরও সাধ্যমতো খেলারাম হওয়ার চেষ্টা। অতি উৎসাহীদের বাড়াবাড়ি সবখানে। রাজার চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে পারিষদ। বাঁশের চেয়ে কঞ্চির বাড়াবাড়ি। কী ক্ষমতাসীন, কী ক্ষমতাহীন! সব কঞ্চিই শক্তিধর। যার মন যা চায় বলছেন। যেখান দিয়ে পারছেন সাধ্যমতো কাণ্ডও ঘটিয়ে দিচ্ছেন। হিম্মতের ক্যারিশমায় তারা সবাই একেকটা আস্ত খেলারাম। কোথাও তেমন বাধায় পড়ছে না তারা। কারও কোনো ক্ষতিও হচ্ছে না। ফ্রি-স্টাইল এ সার্কাসে কেউ কারে নাহি ছাড়ে অবস্থা। অস্থিরতার সুযোগে সবাই জয় ঘরে তুলছেন কোনো না কোনোভাবে। সঙ্গে মিথ্যাচারের ছড়াছড়ি। অবলীলায় বেশুমার গুজব। সঙ্গে মনের মাধুরী মেশানো তথ্য। আজব কিসিমের গুজব ও মিথ্যাচারগুলো বাজারও যে একেবারে পাচ্ছে না- এমনও নয়। কথাবার্তা যার যার সুবিধা মতো। যার যার যুক্তিও কড়া। দ্রুত এবং রহস্যজনক এ পরিবর্তন অবশ্যই উদ্দেশ্যহীন বা খামাখা নয়। ভাবনমুনা দৃষ্টেই প্রশ্ন আসছে বিভিন্ন সেক্টরে এত উতলা-বেপরোয়া আছর কেন? সেখানকার খেলারাম কারা? সরকারদলীয় নেতা-কর্মীরা বাড়াবাড়ি বৃক্ষের মগডালে উঠে গেছে সেই কবেই। তাদের নিয়ন্ত্রণে আনা, না আনা সরকারের সিদ্ধান্তের ব্যাপার। এ খাইখাইদের শায়েস্তা করতে সরকারের দুই দিনের বেশি তিন দিন না-ও লাগতে পারে। কিন্তু সরকারের বিশ্বস্ত এবং সুবিধাভোগী মহলগুলো এভাবে আচমকা দর কষাকষিতে নামলেন কী বুঝে? কোন সিগন্যালে, কোন খেলায়। কোন খেলারামের সুতার টানে?

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট, বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।

সূত্র : বিডি প্রতিদিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত