প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গণপরিবহনে নৈরাজ্যের শেষ কোথায়?

ডেস্ক রিপোর্ট : ঢাকা মহানগরীতে যাত্রী পরিবহনে সিটিং সার্ভিস বাসের বিষয়ে গঠিত কমিটির চলতি সপ্তাহে প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় বলছে, প্রতিবেদনের সুপারিশমালা পর্যালোচনা করে পরবর্তী এক সপ্তাহের মধ্যে সিটিং সার্ভিসের বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে। কিন্তু তর সইছে না পরিবহন মালিকদের। রাতারাতি সিটিং হচ্ছে লোকাল বাসগুলো। বাড়তি আয়ের আশায় বেশিরভাগ পরিবহন সিটিং চলার পক্ষে। অথচ নির্বিকার মন্ত্রণালয় ও বিআরটিএ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবহন মালিকদের কাছে জিম্মি সরকার। তাই তাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড গুলোও সরকারের মেনে নেয়া ছাড়া বিকল্প থাকে না। এই সুযোগে যতটা স্বেচ্ছাচারিতা করা প্রয়োজন ততটাই করছে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা বিআরটিসিকে অকার্যকর করে রাখা ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাই জনস্বার্থে মন্ত্রণালয়কে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) কর্মকর্তারা বলছেন, ছালছাবিল, অনাবিল পরিবহন চলাচলের শর্তে কোন পরিবর্তন আনা হয়নি। অর্থাৎ লোকাল সার্ভিস হিসেবেই এসব পরিবহনের অনুমোদন রয়েছে। অথচ নিজেদের ইচ্ছামতো সিটিং সার্ভিসের নামে দ্বিগুণ ভাড়ায় চলছে এ দুটি পরিবহন। স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদের গাড়িতে তোলা হচ্ছে না। বাসের দরজা বন্ধ করে ইচ্ছামতো স্থানে যাত্রী তোলা বা নামানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কোম্পানির চালকরা বলছেন, মালিকের নির্দেশমতো গাড়ি চালানো হচ্ছে। এতে বাড়তি আয়ের কথাও জানিয়েছেন তারা।

সিটিং সার্ভিসের বৈধতা আসছে শুনে লোকাল হয়ে চলা বলাকা, নিউ ভিশন, ছয় নম্বর হিসেবে খ্যাত বনানী ট্রান্সপোর্ট এখন সিটিং সার্ভিস হয়ে চলছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীতে অর্ধশতাধিকের বেশি পরিবহন নিজেদের ইচ্ছামতো সিটিং সার্ভিস বানিয়ে বাড়তি ভাড়া আদায়ের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। গত এক বছরে প্রায় ৩০টির মতো নতুন পরিবহন কোম্পানি রাস্তায় নামলেও প্রত্যেকটি শুরুতেই অনুমোদন চুক্তি ভঙ্গ করেছে। বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ বলছে, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দোষীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া চলমান।

সিটিং সার্ভিসের নামে রাজধানীজুড়েই চলছে এ রকম অরাজকতা। প্রতারণা। ‘কম স্টপেজ’ বা ‘সিটিং সার্ভিস’ লিখে যে যার ইচ্ছামতো বাড়তি ভাড়া আদায় করছে। কারও কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। নেই জবাবদিহিতা। অথচ এভাবে বাড়তি অর্থ আদায়ের বৈধতা একটি কোম্পানিরও নেই। নামমাত্র মোবাইলকোর্ট পরিচালনা করেই দায় সাড়তে চায় বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা।

নানা সমালোচনার মুখে গত মে মাসের শুরুতে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পর মালিক সমিতির উদ্যোগে রাজধানীতে সিটিং সার্ভিস বাস বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু এ নিয়ে পরিবহন শ্রমিকদের অসন্তোষ ও কর্মবিরতির প্রেক্ষিতে সিটিং সার্ভিসের নামে চলাচলকারী পরিবহনগুলোকে আরও তিন মাস সময় দেয়া হয়। তবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ৮ সদস্য বিশিষ্ট সুপারিশ কমিটি গঠন করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। বাস্তবতা হলো, বছরের পর বছর যাত্রীদের কাছ থেকে পরিবহনসংশ্লিষ্টদের অবৈধভাবে বাড়তি অর্থ হাতিয়ে নেয়ার দায় কে নেবে?

জনস্বার্থে সিটিং সার্ভিস বহাল রাখা যাবে, নাকি বন্ধ করা হবে এসব বিষয় খতিয়ে দেখে তিন মাসের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। কমিটির প্রধান করা হয় বিআরটিএর রোড সেফটি বিভাগের পরিচালক শেখ মোঃ মাহবুব-ই রব্বানীকে। গত ১৫ অক্টোবর এ কমিটি প্রতিবেদন দাখিল করে বিআরটিএতে। প্রতিবেদনে ২৬ দফা পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে কমিটি। এসবের মধ্যে রয়েছে- সিটিং বাসের রং হবে লোকালের চেয়ে ভিন্ন, স্টপেজ সংখ্যা হবে লোকালের চেয়ে কম, কোন রুটে কত সংখ্যক ‘সিটিং বাস’ চলবে তা নির্ধারণ করবে সরকার, অনুমতি ছাড়া লোকাল বাসকে সিটিংয়ে রূপান্তর করা যাবে না, সিটিং বাসে দাঁড়িয়ে যাত্রী পরিবহন করা যাবে না ইত্যাদি। এসব পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে জমার পর এক সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়া হবে বলে জানান সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। যদিও কমিটি ভাড়া নির্ধারণ করেনি। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রণালয়।

সরেজমিন দেখা গেছে, সিটিং সার্ভিসের নামে বাড়তি ভাড়া নেয়া হলেও যাত্রীসেবার মান বাড়েনি। বেশিরভাগ সিটিং সার্ভিস বাসে ফ্যানের কোন ব্যবস্থা নেই। এক সিটের চেয়ে অন্য সিটের দূরত্ব কম। থামানো হয় সবখানেই। জানালা ও আসন ভাঙ্গাচোরা। তেমনি যাত্রীও তোলা হয় যেখানে সেখানে। ছারপোকার দৌরাত্ম্য। লক্কড় ঝক্কড় বাস। ইঞ্জিনের ওপর বসানো হয় যাত্রী। সব মিলিয়ে মানসম্মত গণপরিবহন একেবারেই নেই বললেই চলে।

সাভার-যাত্রাবাড়ী রুটে চলা লাব্বাইক পরিবহন লোকাল সার্ভিস হিসেবে অনুমোদন নেয়। কিন্তু যাত্রার শুরুতেই পরিবহনটি সিটিং সার্ভিস হিসেবে ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করছে। অথচ বেশিরভাগ বাসে দাঁডিয়ে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে নিয়মিত। পোস্তগোলা ব্রিজ থেকে নতুনবাজার রুটে চলা নতুন সার্ভিস রাইদা। সিটিং হিসেবে শুরু থেকেই বাসটি চলছে। এতে সর্বনিম্ন ভাড়া ধরা হয়েছে ১৫ টাকা। অর্থাৎ মালিবাগ রেলগেট থেকে বাসাবো পর্যন্ত তিন কিলোমিটারের কম পথে এই টাকা গুনতে হয়। মিনিবাসে প্রতি কিলোমিটারে ১ টাকা ৬০ পয়সা সরকারীভাবে নির্ধারণ করা আছে। ১৫ টাকায় অন্তত ১০ কিলোমিটার রাস্তা যাওয়া সম্ভব। এই পরিবহনে সর্বনিম্ন ভাড়া ৫ টাকার বালাই নেই।

লাব্বাইক পরিবহনের চালক সাহেদ মিয়া জানালেন, বাড়তি ভাড়া নেয়ার অভিযোগ সত্য নয়। আমাদের সার্ভিস ভাল। তাই যাত্রীদের ভাড়া নিয়ে কোন ক্ষোভ নেই। মতিঝিল থেকে মিরপুর রোডে নতুন সিটিং সার্ভিস ‘র‌্যাম্প পরিবহন’। এই গাড়িটির বিরুদ্ধেও বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ যাত্রীদের। ফার্মগেট থেকে মতিঝিলের ভাড়া নেয়া হচ্ছে ১৫ টাকা। খিলক্ষেত থেকে নিউ মার্কেট পর্যন্ত উইনার ট্রান্সপোর্ট, দ্বিপ বাংলা পরিবহন সিটিং সার্ভিস হিসেবে জনপ্রতি ভাড়া আদায় করছে ৬০ টাকা। কামারপাড়া থেকে মতিঝিল পর্যন্ত বেস্ট শতাব্দী পরিবহনে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০টাকা। খিলক্ষেত থেকে মগবাজার আসলেও এই পরিবহনে পরিশোধ করতে হয় সমপরিমাণ ভাড়া।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতারাতি সাধারণ বাসগুলো সিটিং সার্ভিস হিসেবে চালানো হচ্ছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, সিটিং সার্ভিসের নামে রাজধানীতে ৮৭ ভাগ পরিবহন যাত্রীদের থেকে বাড়তি অর্থ আদায় করছে। জানতে চাইলে বিআরটিএ সচিব শওকত আলী কে বলেন, আমরা পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। অভিযান চলমান রয়েছে। কেউ বাড়তি ভাড়া আদায় করলে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানান তিনি।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ কে বলেন, আমরা চেয়েছিলাম সিটিং সার্ভিস না চলুক। কিন্তু পরিস্থিতি উল্টো হয়েছে। তিনি বলেন, কোন পরিবহন কোম্পানি যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নেয়ার কথা নয়। কেউ যদি বাড়তি ভাড়া আদায় করে তাহলে কোম্পানিসংশ্লিষ্টদের সমিতির পক্ষ থেকে সতর্ক করা হবে। তাছাড়া এ বিষয়ে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, রুট পারমিটে সিটিং সার্ভিস বলতে কিছু নেই। সিটিং সার্ভিস হিসেবে বিআরটিএ কোন বাস অনুমোদন দেয় না। তবুও অনেকে সিটিং হিসেবে গাড়ি চালাচ্ছেন। এটা ঠিক নয়। এ কারণে বাড়তি ভাড়া নেয়ার অভিযোগও আসছে। গুলিস্তান থেকে চিড়িয়াখানাগামী বসুমতি ট্রান্সপোর্ট আগের ২৩ টাকা থেকে ৫ টাকা বাড়িয়ে জনপ্রতি ২৮ টাকা করে ভাড়া আদায় করছে। কাজল নামের বসুমতির কর্মী বলেন, বিআরটিএর নিয়ম অনুযায়ী তারা ভাড়া আদায় করছেন। নতুন নিয়মে আগের চেয়ে পাঁচ টাকা ভাড়া বেড়েছে। যদিও গুলিস্তান থেকে চিড়িয়াখানার দূরত্ব ১৬ কিলোমিটারের বেশি নয়; সে হিসেবে ভাড়া বাড়ার কথা সর্বোচ্চ দুই টাকা।

মতিঝিল থেকে নিউ ভিশন পরিবহনে চিড়িয়াখানা পর্যন্ত ভাড়া ২৮ টাকা থাকলেও এখন তা ২৬ টাকা করা হয়েছে। কিন্তু মতিঝিল থেকে পল্টন যেতে গুনতে হচ্ছে ১০ টাকা ভাড়া।

গুলিস্তান থেকে আব্দুল্লাহপুরগামী বঙ্গবন্ধু এভিনিউ পরিবহনে (৩ নম্বর বাস) আগে শাহবাগ থেকে মহাখালী যেতে ছয় টাকা ভাড়া দিতে হতো। তবে নতুন ভাড়া কার্যকরের দিন থেকে যাত্রীদের কাছ থেকে ৮/১০ টাকা করে আদায় করছে তারা। মতিঝিল থেকে সাভার রুটে সিটিং সার্ভিস হিসেবে চলছে ওয়েলকাম পরিবহন। শাহবাগ থেকে গাবতলী পর্যন্ত ভাড়া নেয়া হচ্ছে ২০ টাকা। সর্বোচ্চ ১০ কিলোমিটার রাস্তায় ভাড়া আদায় হচ্ছে দ্বিগুণ। মতিঝিল থেকে চলা ৭১ পরিবহন, বায়ান্নসহ কয়েকটি পরিবহন কোম্পানির বিরুদ্ধে সিটিং সার্ভিসের নামে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সরকারী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত বছরের ১ অক্টোবর থেকে রাজধানীতে বাসের ভাড়া প্রতি কিলেমিটারে ১০ পয়সা বাড়িয়ে এক টাকা ৭০ পয়সা করা হয়। মিনিবাসের ভাড়াও ১০ পয়সা বেড়ে এক টাকা ৬০ পয়সা হয়েছে। সে হিসেবে ১০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করলে বাসগুলোতে মাত্র এক টাকা বেশি ভাড়া নেয়ার কথা। কিন্তু এই পরিমাণ দূরত্বে ঢাকার বিভিন্ন রুটের পরিবহনগুলোকে নতুন ভাড়া কার্যকরের অজুহাতে দুই টাকা থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেশি ভাড়া আদায় করতে দেখা গেছে। এছাড়া ‘লোকাল’ বাসগুলো আগে যেখানে পাঁচ টাকা ভাড়া নিত এখন সেখানে ছয় টাকা নিচ্ছে। আবার আগের ৭/৮ টাকার ভাড়া নিচ্ছে ১০ টাকা হারে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক বলেন, রাজধানীতে সিটিং সার্ভিস চালানোর কোন বৈধতা নেই। কারণ গাড়ির আসন বিবেচনা করে বিআরটিএ থেকে ভাড়া নির্ধারণ করা আছে। এই হিসেবে কোন পরিবহনেই দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলার কথা নয়। কিন্তু একদিকে বাস কোম্পানিগুলো দাঁড়িয়ে যাত্রী নিচ্ছে অন্যদিকে সিটিংয়ের নামে বাড়তি ভাড়াও নিচ্ছে। এখন প্রকাশ্যে স্টিকার লাগিয়ে সিটিং সার্ভিস চলছে। এসব বাস কোম্পানিকে সহজেই চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব বলে মত দেন তিনি।

রাতারাতি সিটিং সার্ভিস চালুর কারণ জানতে চাইলে বিপ্লবী সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আলী রেজা বলেন, বাড়তি সুবিধা লাভের আশা ও কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাবে এমন হচ্ছে। তিনি বলেন, নাগরিকের প্রতি কারো কোন দায়িত্ববোধ নেই। যার যা ইচ্ছা তাই করছে। ফলে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে যাচ্ছে বাড়তি অর্থ। কিন্তু শ্রমিকরা লাভবান হচ্ছে না। মালিকরাই লাভবান হচ্ছেন। জনকণ্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত