শিরোনাম

প্রকাশিত : ২১ জুন, ২০২২, ০২:০৬ রাত
আপডেট : ২১ জুন, ২০২২, ১১:২৬ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কি উপলব্ধি শক্তি আছে?

ফাইল ছবি

টিমনিথ গেবরু ও মার্গারেট মিচেল: টেকজায়ান্ট গুগলের সর্বশেষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চ্যাটবট এলএএমডিএ। গুগল এআই প্রকৌশলী ব্লেইক লেমোইন সম্প্রতি দাবি করে বসেন, এই চ্যাটবটের অনুভব ক্ষমতা আছে। যা অনেকটা বিস্ময়করই বটে। এলএএমডিএ’র সঙ্গে তার কথোপকথন প্রকাশিত হওয়ার পর এ নিয়ে তিনি কথা বলা বন্ধ করে দেন।

গুগলের রেসপনসিবল এআই সংস্থায় কাজ করা এই প্রকৌশলী বলেন, ‘আমি যখন এটির সঙ্গে কথা বলি, তখন তাকে ব্যক্তি মনে হয়েছে।’ তবে তার দাবি উড়িয়ে দিয়েছে গুগল।

কিন্তু লেমোইন যখন বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন, তখন গোপনীয়তা নীতি লঙ্ঘনের দায়ে তাকে গুগল থেকে প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। তার এ দাবি সত্য তথা ‘অসাধারণ ও দারুণ’ হলেও তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

এ রকম কিছু ঘটতে পারে বলে ২০২০ সালেই আভাস দেওয়া হয়েছিল। তখন গুগলের চাকরি থেকে আমরা সরে আসি। বটের প্রলুব্ধ করার ক্ষমতা—যা মানুষের উপলব্ধি শক্তিকে নকল করতে পারে, আবার এই অগ্রযাত্রাকে ঘিরে উত্তেজনার কারণে এআই প্রকল্প-সহজাত বাস্তবিক সমস্যা থেকে মানুষ ভিন্নমুখী হয়ে যেতে পারে বলে আমরা সতর্ক করে দিয়েছিলাম।

ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল ফর ডায়ালগ অ্যাপলিকেশনসের সংক্ষিপ্ত রূপ এলএএমডিএ। ব্যাপক ভাষা মডেলের (এলএলএম) ওপর ভিত্তি করে এই ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। আর বিপুল বার্তা-উপাত্ত দিয়ে এই মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পরে ইন্টারনেট থেকে তাতে আরও ঘষাঁমাজা করা হয়েছে, যাতে সম্ভাব্য অনুক্রম নিয়ে এলএলএম পূর্বাভাস দিতে পারে। অর্থাৎ মানুষের অনুভূতি অনুসারে আগাম শব্দ চলে আসতে পারে।

২০২০ সালের শুরুর দিকে, আমরা গুগলের ইথিক্যাল এআই টিমের সহ-নেতৃত্বে ছিলাম। তখন এলএলএমের সম্ভাব্য ক্ষতি নিয়ে আমরা ক্রমাগত উদ্বেগ প্রকাশ করি। এ বিষয়ে অধ্যাপক এমিলি এম. বেন্ডর, তার শিক্ষার্থী ও আমাদের সহকর্মীদের সঙ্গে মিলে একটি নিবন্ধও লিখেছিলাম।

এই ব্যবস্থার নাম দিয়েছিলাম, ‘অনুমানের তোতাপাখি’। এটি সব শব্দকে একটি স্থানে জড়ো করে এবং আগে যেভাবে দেখেছিল, তার ওপর ভিত্তি করে হুবহু ভাষার প্রতিধ্বনি আসে এই তোতাপাখির কাছ থেকে। যদিও শব্দের অন্তনির্হিত অর্থের সঙ্গে এসব শব্দের কোনো সম্পর্ক থাকে না।

এতে যেসব ঝুঁকি আছে, তার মধ্যে একটি হলো—মানুষের মতো মনে হয়, এমন কিছুর ওপর লোকজন যোগাযোগের অভিপ্রায় চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। বিপুল উপাত্তের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর অনেকটা সামঞ্জস্যপূর্ণ বার্তা উৎপাদন করে এলএলএম। এতে লোকজন যখন দেখে যে শব্দের বিন্যাস মিলে যাচ্ছে এবং ক্রমাগত পূর্বাভাস দিতে পারছে, তখন এটার ‘মন’ আছে বলেও ধরে নেয়।

এতে প্রশিক্ষণ উপাত্ত—ইন্টারনেট থেকে পাওয়া টেক্সট—দৃষ্টিভঙ্গিকে সাংকেতিক করে দেয়, যা হতে পারে বৈষম্যমূলক এবং দুনিয়ার বিপুলসংখ্যক মানুষকে ধরায় না রেখেই এটি কাজ করতে পারে। এর অর্থ হচ্ছে, এই মডেলের অনুমাননির্ভর বুদ্ধিমত্তা বহু সংকট তৈরির কারণ হতে পারে—সমাধানের প্রশ্ন তো আসেই না।

যখন আমরা নিবন্ধ প্রকাশ করি, তখন জিপিটি-৩ নামের আরেকটি এলএলএম প্রকাশ করা হয়েছে। যদিও উপকারী এআই মিশনের অংশ হিসেবে এটি তৈরি করা হয়। কিন্তু এতে যে ফল পাওয়া যায়, কোনো কোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা বিষাক্ততা অনুকরণ করে তা পক্ষপাত ও ঘৃণায় পরিপূর্ণ থাকে। এক জরিপে দেখা যায়, মুসলমানদের সঙ্গে সহিংসতাকে জড়িয়ে এসব টেক্সট পূর্ণ করা হয়েছে।

নিবন্ধটি প্রকাশের লক্ষ্য ছিল, গুগল ও সাধারণ মানুষকে এলএলএমের সম্ভাব্য ক্ষতি সম্পর্কে সচেতন করে দেওয়া। কিন্তু তা পছন্দ করেনি গুগল। পরে প্রকাশ্যেই চাকরি ছেড়ে চলে আসতে হয়েছে আমাদের। এর দুবছর পরে, আমাদের কাজ আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বলয়, নিয়ন্ত্রণ, এগুলো কীভাবে কাজ করে তা না-বুঝেই আরও বড় বড় মডেল প্রয়োগ করার প্রতিযোগিতা করা হয়েছে। এমনকি প্রশিক্ষণ উপাত্তের ব্যবহার প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোতে আরও ত্বরান্বিত হয়েছে।

সবচেয়ে খারাপ দিকটি হলো—বর্তমান পদ্ধতির মধ্যে বুদ্ধিমত্তা দেখতে সাধারণের মানুষের উৎসাহে ইন্ধন দিচ্ছে কথিত এআই নেতারা। বলা হচ্ছে—এগুলোর সম্ভবত কিছুটা উপলব্ধি শক্তি আছে। এসব মডেল সত্যিকার অর্থে যা করে, তা অনেকটা দুর্বলভাবে বর্ণনা করা হচ্ছে। ব্লেইক লেমোইনের দাবি অস্বীকার করেন গুগলের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ব্লেইস আগুয়েরা ওয়াই আরকাস।

ইকনোমিস্টে লেখা এক নিবন্ধে তিনি বলেন, এলএএমডিএ হচ্ছে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিনির্ভর কোর্টেক্স। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বলে আসছে, এসব বৃহৎ মডেলের যুক্তি-বিচার ও উপলব্ধি শক্তি আছে। জরুরি শেখার সক্ষমতাও ভালো।

আর সংবাদমাধ্যমগুলো সেই প্রচারকে আরও বহুদূর নিয়ে গেছে। তারা বিপুল ভিত্তি মডেল...টার্বো-চার্জিং এআই অগ্রগতি সম্পর্কে বহু লেখালেখি করেছে। যদিও এগুলোর আসন্ন বৈশিষ্ট্যসীমা পুরোপুরি আজগুবি।

এসব বিবরণের মধ্যে লাভের একটি উদ্দেশ্য আছে। অনেক এআই গবেষক ও গবেষণা ফার্মের লক্ষ্য হচ্ছে, ‘সাধারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গড়ে তোলা’। আমরা এতদিন যা কল্পনাও করিনি, তার চেয়েও আরও বেশি বুদ্ধিমত্তার একটি কল্পিত পদ্ধতি হলো এটি। মানুষ যা করতে পারে, এগুলো তা ক্লান্তিহীনভাবে করে যেতে পারে এবং বিনামূল্যে।

এমন কিছু সম্ভব হবে বলে আগে কখনো কল্পনাও করা হয়নি। যেসব কোম্পানি এগুলো নিয়ে কাজ করছে, তারা বিপুলসংখ্যক তথ্য জড়ো করেছে। এসব করতে অনেক সময় সম্মতি নেওয়ারও প্রয়োজনবোধ করেনি। আর এতে যে শ্রমচর্চা হয়েছে, তাও শোষণমূলক।

এসব উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে এলএলএম পদ্ধতির সম্ভাব্য ক্ষতি অগ্রাহ্য করা হয়েছে। একটি পণ্যে ‘উপলব্ধি শক্তি’ আরোপ করার মধ্য দিয়ে এই আভাসই দেওয়া হচ্ছে—‘ভুল কিছু করা কেবল একটি স্বাধীন সত্তার কাজ’। এতে কোম্পানির কোনো অবদান নেই। অথচ সত্যিকার ব্যক্তিরাই এসব কোম্পানি গড়ে তুলেছে এবং তারাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

কাজেই গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই ভিন্নমুখিতা প্রতিরোধ ও অতি উত্তেজনা বন্ধে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতে মডেল তৈরিতে মনোযোগ দেওয়া উচিত বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের। উবার বুদ্ধিমত্তা তৈরির দাবির বদলে এভাবেই তার মূল্যায়ন করা দরকার। অর্থাৎ এআই কতটা মানুষের কাছে আসছে, তাদের সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখছে, সেদিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত। আর সংবাদমাধ্যমের উচিত জাদুকরী কৃত্রিম বুদ্ধির মোহে না-পড়ে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসতে বেশি করে জোর দেওয়া। কারণ কোম্পানিগুলোর অতিলোভ সাধারণ মানুষকে ভুলপথে নিয়ে যেতে পারে।

লেখক: টিমনিথ গেবরু, দ্য ডিস্ট্রিবিউটেড আর্টিফিশল ইন্টেলিজেন্স রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক। মার্গারেট মিচেল, এথিক্যাল এআই গবেষক, হাগিং ফেসের প্রধান ইথিক্যাল বিজ্ঞানী। লেখাটি ওয়াাশিংটন পোস্ট থেকে অনূদিত

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়