শিরোনাম

প্রকাশিত : ০৬ আগস্ট, ২০২২, ১০:৩২ রাত
আপডেট : ০৬ আগস্ট, ২০২২, ১০:৩২ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড়, বাসে মারামারি

বাস

মনজুর এ আজিজ: রেকর্ড পরিমাণ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ফলে রাজধানীসহ সারাদেশে মিছিলসহ প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। এর আগে একবারে জ্বালানির এমন মূল্যবৃদ্ধি দেখেনি বাংলাদেশ। একবারে এ পরিমাণ মূল্য বাড়ানোর ফলে রাজধানীর বাসে বাসে ভাড়া নিয়ে চলছে মারামারি।

আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৩৪ টাকা, অকটেন ৪৬ টাকা এবং পেট্রল ৪৪ টাকা বাড়ানোর ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে কয়েকগুণ। পাশাপাশি সরকারের প্রতি সাধারণ জনগণের মধ্যে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হতে পারে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।  

সরকার অবশ্য বলছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে চলছে অর্থনৈতিক মন্দা। দেশে দেশে দেখা দিচ্ছে মুদ্রাস্ফীতি, কমছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও।

পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ সরকার ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়, বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা ও তেলপাচার রোধে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। যার জেরে শুক্রবার মধ্যরাতে রেকর্ড পরিমাণে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। চলমান অস্থিরতা মোকাবিলায় এই সিদ্ধান্ত সহায়ক হবে বলেও মনে করছেন সরকার সংশ্লিষ্টরা।

বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম বেড়েছে ৩৪, অকটেন ৪৬ এবং পেট্রোল ৪৪ টাকা। শুক্রবার রাত ১২টার পর থেকে নতুন এই দাম কার্যকর হয়েছে। এতে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ৪২.৫ শতাংশ বেড়ে হয়েছে প্রতি লিটার ১১৪ টাকা। পেট্রোলের দাম ৫১.১৬ শতাংশ বেড়ে প্রতি লিটারের দাম হয়েছে ১৩০ টাকা। আর অকটেনের দাম ৫১.৬৮ শতাংশ বেড়ে হয়েছে প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা। যা এ যাবৎ কালের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড পরিমাণ দাম বৃদ্ধি।

সর্বশেষ ২০২১ সালের ৪ নভেম্বর ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ানো হয়। সেই সময় এই দুই জ্বালানির দাম লিটারপ্রতি ৬৫ টাকা থেকে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ৮০ টাকা করা হয়। ৮ মাসের ব্যবধানে আবার বাড়ানো হলো তেলের দাম। তবে ওই সময় পেট্রোল আর অকটেনের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। এবার সব ধরনের জ্বালানি তেলেরই দাম বাড়ানো হলো।

এদিকে জ্বালানি তেলের মৃল্য বৃদ্ধির খবরে শুক্রবার রাত থেকেই সড়কে গণপরিবহন শূন্য হতে থাকে।  হঠাৎ বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকটা বিপাকে পড়েন নগরবাসী। এরপরও যেসব বাস নগরিতে চলছে সেসব বাসে ভাড়া নিয়ে রাজধানীর বেশিরভাগ এলাকায় নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়েছে। ভাড়া নিয়ে বাসে বাসে মারামারি হয়েছে বলেও জানা গেছে।  

পরিবহন শ্রমিকরা জ্বালানির দাম বাড়ানোর এই হারকে অস্বাভাবিক বলছেন। কারণ এর প্রভাব দ্রব্যমূল্যের ওপরও পড়বে। এমনিতেই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নাভিশ্বাস উঠেছে  সাধারণ জনগণের মধ্যে। তার মধ্যে জ্বালানি তেলের এমন অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে ব্যয় বাড়বে সবকিছুতে।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মশাল হাতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনে করেছে ছাত্র অধিকার পরিষদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। এ সময় মিছিলে বিক্ষোভকারীরা তেলের দাম কমানোর দাবিতে স্লোগান দেন। মশাল হাতে মিছিলটি ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র টিএসসি এলাকা হয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে প্রদক্ষিণ করে।

এসময় তারা ‘দাম বাড়ালে জ্বালানি, জনগণ দেবে কেলানি’, ‘দাম বাড়ানো সরকার, আর নাই দরকার’, ‘গরিব মারা সরকার, আর নাই দরকার’, ‘জ্বালানির দাম কমায় দে, নইলে গদি ছেড়ে দে’, ‘স্বৈরাচারের কালো হাত ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’ ইত্যাদি স্লোগান দেন।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেন, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম এখন নিম্নমুখী। তারপরও ৫১ শতাংশেরও বেশি পর্যন্ত জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নির্দয় ও নজীরবিহীন। জ্বালানি তেলের এমন মূল্য বৃদ্ধিতে জনজীবনে মহাবিপর্যয় সৃষ্টি হবে। প্রমাণ হলো দেশের মানুষের প্রতি সরকারের কোন দরদ নেই।

বিএনপি ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, হঠাৎ করেই জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এটা চরম গণবিরোধী পদক্ষেপ। এই তেলের সাথে সবকিছু সম্পর্ক যুক্ত। এখন নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দাম বেড়ে যাবে। অর্থাৎ একটি অরাজক পরিস্থিতির দিকে দেশকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের ৫০ বছরের ইতিহাসে এটি একটি ভয়ংকরতম ঘটনা।

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মির্জা আজিজুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, জ্বালানির এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে প্রথমেই ধাক্কা খাবে পরিবহন সেক্টর। পরিবহন সেক্টরের সঙ্গে সবই সম্পৃক্ত। পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে কয়েকগুণ। দেশের মূল্যস্ফীতি এমনিতেই নাগালের বাইরে। মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাবে।

তিনি বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষির ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে। এবার বৃষ্টি কম হচ্ছে। আমন মৌসুমেও দরকার হচ্ছে সেচের। সেচ দিতে না পারলে উৎপাদন ব্যাহত হবে। এ বিষয়গুলো একটি আরেকটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ডিজেলের এমন দাম বাড়ানোর আগে অবশ্যই কৃষির কথা ভাবা দরকার ছিল। কৃষির উৎপাদন না হলে খাদ্য আমদানি বাড়বে। আমদানি-রপ্তানির মধ্যে রেকর্ড পরিমাণ ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই ঘাটতি আরও বেসামাল হয়ে পড়বে। তাছাড়া এখন তো বিশ্ববাজারে দাম কমেছে। সময়ক্ষেপণ করে অস্থিরতা তৈরি করার কোনো মানে হয় না। এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, জ্বালানির এত মূল্যবৃদ্ধি কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়। এই মূল্যবৃদ্ধিকে কোনোভাবেই সমন্বয় বলে না। একে একতরফাভাবে চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত বলে। আমাদের সবচেয়ে দুঃখজনক কথা হচ্ছে, বিশ্ববাজারে দাম কমলে এখানে দাম কমানো হয় না। বিশ্ববাজারে দাম বাড়ানোর কথা বলে আপনি যদি দাম বাড়ান, তাহলে বিশ্ববাজারে দাম কমলে কমানোরও দাবি রাখে। এমন একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই গণশুনানি করা জরুরি ছিল। আগে অন্তত গণশুনানি হতো। মধ্যরাতে এমন সিদ্ধান্তকে জনবান্ধব সিদ্ধান্ত বলা যায় না।  

তিনি বলেন, সরকার ভর্তুকির কথা বলছে। ভর্তুকি তো দিতেই হবে। অর্থনীতি ঠিক রাখতে গেলে আপনাকে কোথাও না কোথাও ভর্তুকি দিতেই হবে। তিনি বলেন, এই সরকার ক্ষমতায় এসেই বিদ্যুতের জোগান দিতে গিয়ে একের পর এক ভ্রান্ত নীতি প্রণয়ন করেছে। রেন্টাল-কুইকরেন্টাল নিয়ে সরকার যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিল তা এখন বুমেরাং হয়েছে। 

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ভোক্তার অধিকারের কথা বিবেচনা করলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর আগে অবশ্যই গণশুনানির আয়োজন করতো। জ্বালানির এমন মূল্যবৃদ্ধি একেবারেই অপ্রত্যাশিত। সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে অর্থনীতি, রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে। জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে।

এ প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, যতদিন সম্ভব ছিল ততদিন সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির চিন্তা করেনি। কিন্তু অবস্থার প্রেক্ষিতে অনেকটা নিরূপায় হয়েই কিছুটা এডজাস্টমেন্টে যেতে হচ্ছে। ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য কমিয়ে দিয়েছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সে অনুযায়ী জ্বালানি তেলের মূল্য পুনঃবিবেচনা করা হবে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়