Skip to main content

শিক্ষা : বর্তমান সরকারের কাছে প্রত্যাশা

বর্তমান সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন দীপু মনি। উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য কাউকে পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব না দেয়া হলেও জাকির হোসেন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। নতুন দায়িত্বে তাদের সবাইকে আন্তরিক অভিনন্দন! প্রত্যাশা, তারা সবাই সুচারুভাবে মন্ত্রণালয়ের কাজ এগিয়ে নেবেন এবং দেশের সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আনয়নে সচেষ্ট থাকবেন।
ইতোমধ্যে নিশ্চয়ই তারা হোমওয়ার্ক সেরেছেন। হয়তো কিছু পরিকল্পনাও নিয়েছেন শিক্ষাকে কেন্দ্র করে। পূর্বতন মন্ত্রীদের কাজের বিষয় ও ধারা আশা করি তারা পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং সেগুলোর প্রভাব ও প্রতিক্রিয়াগুলোকে আমলে নেবেন। শিক্ষা বিষয়ে লেখাপড়া ও দীর্ঘদিন এ সেক্টরে কাজের সুবাদে বর্তমানে দায়িত্বরত মন্ত্রীদের কাছে কিছু প্রত্যাশা করতে চাই।
প্রথমত, শিক্ষা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে পশ্চাৎপদতাও। গত ১২-১৫ বছরে বাংলাদেশ শিক্ষা কোন কোন ক্ষেত্রে এগিয়েছে, কোথায় কোথায় অগ্রগতি থেমে আছে আর কোথায় প্রত্যাশামতো এগোতে পারেনি কিংবা পিছিয়েছে, সেগুলোর তালিকা করা প্রয়োজন। যেগুলোতে আমরা এগিয়েছি, যেমন- প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার, প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের বই প্রদান কিংবা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে জেন্ডার সমতা সেগুলো যেন ধরে রাখা যায়, তার জন্য এক ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার। যেখানে অগ্রগতি থেমে আছে, যেমন- শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন, সেখানে পূর্ণ উদ্যমে কাজের পরিকল্পনা নেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি, যেখানে আমরা একেবারেই পিছিয়ে আছি, যেমন- সাক্ষরতার হার, সেগুলোর জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কর্মযজ্ঞের ব্যবস্থা নেয়া খুবই জরুরি। আশা করি তারা এগুলোতে মনোযোগ দেবেন।
দ্বিতীয়ত, সংখ্যাগতভাবে আমাদের অর্জন বাড়লেও গুণগত পরিসরে কতোটুকু বাড়ছে তা এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। উদাহরণস্বরূপ, প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় যেভাবে জিপিএ ৫-এর সংখ্যা বেড়েছে, এই ফলের সঙ্গে একই শ্রেণির ঘধঃরড়হধষ ঝঃঁফবহঃ অংংবংংসবহঃ বা ঘঝঅ-এর ফলাফল বিপরীত। প্রায় একই চিত্র দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রেও যেখানে প্রচুর জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী ভর্তি দূরের কথা, পরীক্ষায় কৃতকার্য হতেও ব্যর্থ হচ্ছে। একে সম্ভবত পরীক্ষানির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার কুফল হিসেবে দেখা যায়। শিক্ষাবিদরা দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষানির্ভর শিক্ষার বদলে সত্যিকারের লেখাপড়া যাতে হয়, সেরকম ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলছেন। বর্তমান নেতৃত্বের কাছে প্রত্যাশা থাকবে যে, তারা এই দিকটিকে গুরুত্ব দেবেন।
তৃতীয়ত, শিক্ষার সব আয়োজনই থমকে যায় যদি সেখানে পর্যাপ্ত বাজেট না থাকে। শিক্ষা সেক্টরে প্রয়োজনীয় বাজেট দিতে অনীহা দেখা গেছে আগের বছরগুলোতে। শিক্ষা সম্পর্কিত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা যদি এখন থেকেই অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আলোচনা সম্পন্ন করেন, তাহলে হয়তো বর্তমান শিক্ষানীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বাজেট পাওয়া যেতে পারে। এই আলোচনায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অন্তর্ভুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় বাজেটের কতোটুকু শিক্ষার জন্য রাখা যেতে পারে, তার আন্তর্জাতিক মান রয়েছে এবং সেগুলো সবারই জানা। আমরা দুঃখজনকভাবে এই মান থেকে অনেক পিছিয়ে। এক বছরেই ওই মানে পৌঁছানোর চিন্তা বাস্তবসম্মত নয়, কিন্তু প্রতিবছর যেন একটু একটু করে আগাতে পারি, তার জন্য মাননীয় মন্ত্রীরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এই প্রত্যাশা করতে চাই।
চতুর্থত, শিক্ষার দুটো মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আরো কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের সম্পর্ক বেশ নিবিড় ও গভীর। এগুলো হলো: সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার অগ্রগতির পাশাপাশি সার্বিক বিকাশে এই মন্ত্রণালয়গুলোর অনেক দায়িত্ব রয়েছে এবং নানা ধরনের কাজ একাধিক মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে করা প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়সমূহে খেলাধুলার চর্চা ও সেখান থেকে জাতীয় পর্যায়ের জন্য খেলোয়াড় তৈরির কাজটি এখন প্রায় স্তিমিত। এ ধরনের কার্যক্রম একাধিক মন্ত্রণালয় মিলে গ্রহণ করলে তা ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। প্রত্যাশা থাকবে এ দিকটিকে গুরুত্ব দেয়ার।
পঞ্চমত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান বাড়ানো ও সেখানে গবেষণার পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ধারণে আন্তর্জাতিক সূচকের সবগুলোতেই আমরা শোচনীয়ভাবে পিছিয়ে। রাজনীতির প্রাবল্য, গবেষণার পরিবেশ ও বাজেটের অভাব, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভৌত অবকাঠামোগত সুবিধাতে পশ্চাৎপদতা এবং জবাবদিহিতার অস্বচ্ছতার পাশাপাশি আরো বেশকিছু কারণে দিনে দিনে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক মানে গ্রহণীয় করার পাশাপাশি ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে উচ্চ শিক্ষাকে মুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করাও প্রয়োজন। গবেষণার জন্য বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রয়োজন সরকারি প্রয়োজনে বিভিন্ন গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সরাসরি সম্পৃক্ত করা। এতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আরো অধিক অবদান রাখতে সক্ষম হবে, শিক্ষকদের গবেষণার দক্ষতা বাড়বে এবং সার্বিকভাবে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় উভয়ই লাভবান হবে। শিক্ষামন্ত্রী যদি এসব বিষয়ে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মত নেন, তাহলে উন্নয়নের এরকম আরো দিক, ক্ষেত্র ও উপায় বের করা সম্ভব। আশা করবো, তারা এই সেক্টরটিকে প্রয়োজনের খাতিরেই প্রয়োজনের চেয়ে অধিক গুরুত্ব দেবেন।
সরকার মাত্র কাজ শুরু করেছে। সঙ্গত কারণেই প্রত্যাশার চাপ প্রচুর। ওপরে যেসব প্রত্যাশা করা হলো সেগুলো আশা করি অসঙ্গত নয়, কারণ গত কয়েক বছরে বিভিন্নভাবে এসব প্রত্যাশা মিডিয়ায় উঠে এসেছে। দায়িত্বরত মন্ত্রীরা এসব উন্নয়ন কাজে শিক্ষক সমাজের পূর্ণ সহায়তা পাবেন, সেটিও প্রত্যাশা করা যায়। লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক

অন্যান্য সংবাদ