Skip to main content

যেদিন ফিরলেন জনগণের নেতা   

এম নজরুল ইসলাম : আজ সেই অবিস্মরণীয় দিন, যেদিন নতুন সূর্যের আলো গায়ে মেখে বিজয়ী বীরের বেশে দেশে ফিরেছিলেন পিতা। সেদিন তিনি ফিরেছিলেন। নিজের দেশে ফিরলেন তিনি মানুষের ভালবাসায় সিক্ত হয়ে। বাঙালী জাতির হৃদয় ভরিয়ে দিয়ে নিজের দেশে ফিরলেন যে মহাপুরুষ, যাঁর জন্য অপেক্ষায় ছিল সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ। যাঁকে নিয়ে কবি শামসুর রাহমান লিখেছেন, ‘ধন্য সেই পুরুষ,.../ যার নামের ওপর/ কখনো ধুলো জমতে দেয় না হাওয়া/... ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর পতাকার মতো/ দুলতে থাকে স্বাধীনতা/ ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর ঝরে/ মুক্তিযোদ্ধাদের জয়ধ্বনী।’ তিনি তো আর কেউ নন, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী তিনি। এ জাতির দুঃখের দিনের কাণ্ডারি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭২ সালের এই দিনটিতে সত্যি রোমাঞ্চ লেগেছিল বাংলাদেশের ‘দিকে দিকে, ঘাসে ঘাসে।’ সে এক ‘মহাজন্রমের লগ্নই’ ছিল বাঙালীর জন্য। সেদিন ভেঙ্গে গিয়েছিল ‘অমারাত্রির দুর্গতোরণ’। বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রগতিশীল ধারার প্রবক্তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ভেতর দিয়ে চূর্ণ হয়ে যায় এই উপমহাদেশের যুগ-যুগান্তরের চিন্তার অস্থিরতা ও মানসিক অচলায়তন। তাঁর এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের মানুষ যেমন ফিরে পায় সামনে অগ্রসর হওয়ার প্রেরণা, তেমনি তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালীর আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক। কেমন ছিল সেই দিনটি? কেমন ছিল সেদিনের সেই নিকেল করা অপরাহ্ণ বেলা? বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ জনতার চোখে-মুখে অন্য রকম উত্তেজনা। নেতা আসছেন। আসছেন প্রিয় পিতা। পাকিস্তানের কারাগারের শৃঙ্খল ছিঁড়ে দেশের মাটিতে আসছেন সেই মহামানব, যিনি বাঙালী জাতিকে মুক্তির মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিলেন। এক সময় অপেক্ষার পালা শেষ হয়। পিতা দৃশ্যমান হন। বিমানের সিঁড়িতে দেখা যায় তাঁকে। কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতায় বলতে হয়, ‘অমনি পলকে দারুণ ঝলকে হƒদয়ে লাগিল দোলা।/ জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার সকল দুয়ার খোলা।’ একত্রিশবার তোপধ্বনি আর লাখো মানুষের উল্লাস। বঙ্গবন্ধুকে বরণ করল তাঁর প্রিয় স্বদেশভূমি। বুক ভরে নিশ্বাস নিলেন তিনি। প্রিয় দেশের বাতাস নিলেন বুক ভরে। স্পর্শ করলেন এই দেশের মাটি। প্রিয় আলো তাঁকে ছুঁয়ে দিল।

বিমানবন্দরে সমবেত লাখ লাখ জনতা আনন্দ-উল্লাসে ফেটে পড়ে। ওখানে বিমান থেকে অবতরণের সিঁড়ির মুখে কোন রকমে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যগণ, ছাত্র, যুব, রাজনীতিকরা। বিমানের দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, নূরে আলম সিদ্দিকী, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, আ স ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ প্রমুখ ছাত্রনেতা এক এক করে বিমানে উঠে বঙ্গবন্ধুকে জড়িয়ে ধরে তাঁকে মাল্যভূষিত করেন। ওই সময় বঙ্গবন্ধুসহ সবাই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলেন। সব সময় জনগণ তাঁর প্রথম চাওয়া ও পাওয়া। ৯ মাস ১৬ দিন কারাবাস শেষে যেদিন দেশে ফিরলেন তিনি সেদিন প্রথম গেলেন জনগণের কাছে। সোজা চলে গেলেন রেসকোর্স ময়দানে। মঞ্চে উঠে দাঁড়ালেন। পুরো রেসকোর্স ময়দান ভরা জনতা উত্তেজনায় নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না যে, সামনে তারা স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে দেখছেন। উত্তেজনায় উদ্বেল আনন্দধ্বনি ক্রমশই বেড়ে চলছিল। এই অবস্থায় বঙ্গবন্ধু বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘১৯৭১ সালের ৭ মার্চ এই ময়দানে আমি আপনাদের বলেছিলাম ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলুন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাস স্বাধীনতার সংগ্রাম। আপনারা বাংলাদেশের মানুষ সেই স্বাধীনতা জয় করে এনেছেন। আজ আবার বলছি, আপনারা সবাই এই ঐক্য বজায় রাখুন। ষড়যন্ত্র এখনও শেষ হয়নি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। একজন বাঙালীর প্রাণ থাকতে এই স্বাধীনতা নষ্ট হতে দেবে না। বাংলাদেশ ইতিহাসে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেই টিকে থাকবে।’


 

 
৯ মাস ১৬ দিন কারাবাস শেষে যেদিন দেশে ফিরে প্রিয়তমা স্ত্রীর মুখ কি তাঁর মনে পড়েনি? মনে পড়েনি সন্তানদের কথা? বাড়িতে বৃদ্ধ পিতা, বৃদ্ধা মা। কাউকে কি মনে পড়েনি তাঁর? পড়েছে নিশ্চয়ই। কিন্তু জনগণের নেতা জনগণের কাছেই আগে ফিরেছেন। পাকিস্তানী সামরিক জান্তার কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ফিরে এলেও এ দেশের কিছু মানুষের চক্রান্তে শেষ পর্যন্ত দেশের মাটিতেই জীবন দিতে হয়েছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদের এই মহান নেতাকে। বঙ্গবন্ধু আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর নীতি ও আদর্শ রয়ে গেছে। বাঙালী জাতি বহন করছে তাঁর উত্তরাধিকার। বহন করবে যতদিন বাংলাদেশ আছে, আছে বাঙালী জাতি, বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকারও ততদিন থাকবে।

আজ ১০ জানুয়ারি। ১৯৭২ সালের এই দিনে পূর্ণতা পেয়েছিল আমাদের স্বাধীনতা। ইতিহাসের এই স্মরণীয় দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলা। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, জাতির জনকের যোগ্য কন্যা, যিনি চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন, তাঁর নেতৃত্বেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বাংলাদেশ বিনির্মিাণ সম্ভব হবে। অসাম্প্রদায়িক মানবিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে অবিচল থাকবেন তিনি।

লেখক : অস্ট্রিয়া প্রবাসী মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক