Skip to main content

নারীর উপযুক্ত পোশাক কী?

ভারতীয় বাঙালি মডেল এবং অভিনেত্রী স্বস্তিকা। পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘শাহজাহান রিজেন্সি’ মুভি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নারীর সাহস ও উত্তরণের কথা বলেছেন। ভারতীয় জনপ্রিয় দৈনিক আনন্দবাজারের হয়ে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ¯্রবন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়। গত মঙ্গলবার আনন্দবাজারে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করা হয়েছে। স্বস্তিকা বলেছেন, ‘ব্লাউজ খুলে ব্রা দেখালেই নারী সাহসী হয় না। নারী সাহসী হয় পুরুষরা নারীকে যে রূপে অবগুণ্ঠিত, কোমল, মায়াবতী রূপে দেখেন সেই মাস্টারমাইন্ডকে আঘাত করলে।’ কথাটি সত্য বলেছেন স্বস্তিকা। নারীদের ক্ষমতায়ন এখন বহুল ব্যবহৃত শব্দ। এটি এনজিওদের উন্নয়নবাদী একটা টার্ম। কিন্তু আমরা বাস্তবে দেখেছি কী এঞ্জেলা মার্কেলের জার্মানিতে কী ইন্দিরা গান্ধীর বা মমতার বা জয়ললিতার ভারতে কী বাংলাদেশে খালেদা জিয়া বা শেখ হাসিনার আমলেই হোক নারীবর্গ অনেকখানি পিছিয়ে রয়েছেন প্রান্তিক হিসেবেই। যদিও বিভিন্ন ধরনের নারী সংগঠন, এনজিও তাদের নিয়ে কাজ করছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অতীত আমলে নারীরা বিশেষ বিশেষ উচ্চপদে স্থানও করে নিয়েছেন এটি সত্য। এখন আমাদের দেশে সেনাবাহিনীতে, বিমানবাহিনীতে, র‌্যাবে, রেলওয়েতে ও প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীরা রয়েছেন। কিন্তু উচ্চপদে থাকলেও সিস্টেম যদি হয় পুরুষতান্ত্রিক তবে নারী আর কতোটুকুই এগোতে পারবেন?  যেমন এবার ২০১৯ শিক্ষাবর্ষের জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ষষ্ঠ শ্রেণির গার্হস্থ্য বিজ্ঞান বইয়ের ‘কৈশোরকালীন পরিবর্তন ও নিজের নিরাপত্তা রক্ষা’ বিষয়ক সপ্তম অধ্যায়ে কিশোরীদের দৈহিক পরিবর্তন নিয়ে সংকোচ দূর করতে উপযুক্ত পোশাক পরিধানের সুপারিশ করা হয়েছে। বইতে দেখা যায়, সাদা-কালো সালোয়ার-কামিজ আর সাদা ওড়না গায়ে এক কিশোরীর ছবি। ছবির নিচে লেখা, ‘উপযুক্ত পোশাকে কিশোরী’। এই ছবির পাশেই লেখা, ‘মেয়েরা তাদের দৈহিক পরিবর্তন অন্যরা দেখে বিরূপ মন্তব্য করতে পারে বলে ভয়ে ভয়ে থাকে। দেহের পরিবর্তন বেশি চোখে পড়ে বলে মেয়েরা অনেক সময় সামনে ঝুঁকে হাঁটে। উপযুক্ত পোশাক পরিধান করলে এ সংকোচ দূর করা যায়।’ এর মানে নারীর উপযুক্ত পোশাক নিয়েও চিন্তিত শিক্ষা ব্যবস্থা। নারীর সংকোচ দূর করেত চিন্তিত তারা? ড. আহমদ শরীফ এক প্রবন্ধে বলেছিলেন, ‘আমি বেয়াদব সংস্কৃতি পছন্দ করি। কারণ বেয়াদব সংস্কৃতি স্থিতাবস্থার আদবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।’ (সর্বজনীন বিদিত, পৃ-৪৩)
তবে কী সিস্টেমের বিরুদ্ধে নারীদের যে দীর্ঘ লড়াই সেক্ষেত্রে বেয়াদব সংস্কৃতিকে (স্থিতাবস্থার সংস্কৃতি) ধারণ করতে হবে। এটি সত্য, আগের চাইতে নারীরা উৎপাদনমূলক কাজে অংশ নিচ্ছে, মতপ্রকাশ করছে, লেখাপড়া করছেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতিতে তারা কতোটুকু ভূমিকা রাখতে পারছেন? তা যে এখনো খুব হতাশার চিত্র বহন করছে, তা সদ্য নির্বাচিত মন্ত্রণালয়ের গঠন দেখেও বোঝা গেলো। মন্ত্রণালয়ে ৪৬ জনের মাঝে তিনজন মাত্র নারী স্থান করে নিতে পেরেছেন। বর্তমান কেবিনেটে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়া, একজন পূর্ণমন্ত্রী ডা. দীপু মনি (শিক্ষা), একজন শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান এবং একজন পরিবেশ উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার। অর্থাৎ কেবিনেটে মাত্র ৪ জন নারী রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় ভূমিকা রাখতে পারবেন। যা এক-পঞ্চমাংশও নয়। এক্ষেত্রে যোগ্যতা দক্ষতার চাইতেও রাজনীতিতে পুরুষতান্ত্রিকায়ন এখনো রয়েছে এর একটি প্রমাণ এটি। আরেকটি দিক যদি আমরা দেখি, যে, প্রতি নির্বাচনের পর পরই খ-চিত্রের ভয়াবহতার সাথে যুক্ত থাকে নারী ধর্ষণের ঘটনা। বিগত পূর্ণিমা, মহিমা থেকে বর্তমান পারুল বেগম একই কাঠামোতে বন্দি। ‘নারী হয়ে শক্তি দেখাবি, দেখা তোর কতো শক্তি’ ... ফলে এই শক্তির লড়াইয়ে একজন নারী যেন হাত-পা গুটিয়ে সিটিয়ে থাকে সেই পথই ধরে পেশিশক্তির সমাজ। আর এই ধর্ষণের মতাদর্শ বা নারীদের সতিত্বের সামাজিক ট্যাবু নিয়ে নারী অধস্তন হয়ে বেঁচে থাকে যুগের পর যুগ। পারুলের জায়গায় ফিরোজ নামের কেউ যদি অন্য কেউ বলার পরও নিজ পছন্দের মার্কায় ভোট দিতেন তবে তার ওপরও হয়তো হামলা হতো কিন্তু সেই হামলা নিশ্চয়ই যৌন নিগ্রহের হামলা হতো না। সেই পারুল সেই বেয়াদব (স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে) দাঁড়িয়েছিলো। এর জবাব দিয়েছে পুরুষতন্ত্র। এর মানেই পূর্ণিমা থেকে পারুল তাদের যৌনভাবে নিগৃহ করাটাই যে পুরুষতান্ত্রিক নোংরা মানসিকতার প্রকাশ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ক্ষমতায়নে আত্মনির্ভরশীলতা জরুরি। আত্মনির্ভরশীলতার জন্য দরকার নিজের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ। আর তা আসবে স্বাবলম্বীতার মাধ্যমে। অথচ নারীদের উচ্চ শিক্ষাহার এতোই কম যে নির্বাহী অংশের নারীদের সংখ্যা গুটিকয়েক। সংখ্যা স্বল্পতার জন্য তারা সমাজে অধিকার লড়াইয়েও তাই সফল হতে পারে না। একদিকে উচ্চ শিক্ষা যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন তাদের পুরনো সমাজের বেঁধে দেয়া ট্যাবুগুলো ভাঙা। লজ্জা, সম্মান, সতিত্ব, দেহ ঘিরে কুসংস্কার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মনোযোগী হওয়া কী করে নিজেকে সমাজের একজন মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা হওয়া যায়। সোজা কথায়, জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি সমাজের প্রচলিত বেয়াদব হিসেবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের লড়াই এ নামা। 
লেখক : প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, তেজগাঁও কলেজ,  ঢাকা

অন্যান্য সংবাদ