Skip to main content

গোমতী নদীতে প্রকৃতির মায়াবী হাতছানি

অপূর্ব মায়াভরা সৌন্দর্যের হাতছানি দিয়ে ডাকে গোমতী নদীর চর ও পাড়ের প্রকৃতি। ভারত বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী কটকবাজার থেকে নদীটি  কুমিল্লা জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মেঘনা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। গোমতী নদীর অববাহিকায় স্থানীয় পর্যটন শিল্প বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠার অপার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সরকারি-বেসরকারি কোন উদ্যোগ না থাকার কারণে পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনার গোমতী নদী অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।

জানা গেছে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যর উদয়পুরের সোনাইমুড়ি এলাকা থেকে উৎপত্তি গোমতী নদীটির ৮৩ কিলোমিটারের মূল অংশ কুমিল্লা জেলায়। নদীর উভয় তীরে এখন পিচ দিয়ে ঢালাই দেয়া পাকা সড়ক হয়েছে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার ফলে দেশের যেকোন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা এসে দেখতে পারেন গোমতী নদীর অপূর্ব সৌন্দর্য। 

ছবি: মাহফুজ নান্টু
ছবি: মাহফুজ নান্টু

গোমতী নদীটি জেলার সদর, বুড়িচং, দেবিদ্বার, মুরাদনগর, তিতাস ও দাউদকান্দি হয়ে মিলিত হয়েছে মেঘনা নদীর সাথে। দীর্ঘ ৮৩ কি:মি: প্রবাহিত হওয়া গোমতী নদীর দু’তীরে ব্যক্তি মালিকানায় গড়ে উঠা কাঁঠাল বাগান আর বিশাল চরে কৃষকদের ফলানো সবুজ সবজির ক্ষেত জুড়ে সতেজ সবুজের এক মোহনীয় দৃশ্যের অবতারণা ঘটায়। 

মাত্র দু’বছর আগে সদর উপজেলার টিক্কারচর এলাকায় নদীর উপর নির্মাণ করা ব্রীজটি এখন প্রতিদিন বিকেলে দর্শনার্থীদের দখলে চলে যায়। সরকারি ছুটির দিনগুলোতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের সাথে ভীড় জমায় স্থানীয়রাও। ছুটির দিনগুলোতে দর্শনার্থীদের পদচারণায় মূখর হয়ে উঠে গোমতী নদীর দু’পাড়। 

সম্প্রতি নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন স্থানে ব্যক্তি মালিকানায় গড়ে তোলা হচ্ছে ছোট ছোট কটেজ। এসব কটেজে কফি, চাসহ হালকা জলযোগের ব্যবস্থা করা হয়। চালা চাড়া কটেজে তৈরি করা বাশের বেঞ্চিতে বসে কফি কিংবা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে উপভোগ করা যায় নদীর দু’তীরের সৌন্দর্য । শেষ বিকেলের দর্শনার্থীদের ভীড়ে জমজমাট হয়ে উঠে কটেজগুলো। নদীর সদর উপজেলার অংশের বানাশুয়া রেলব্রিজের পূর্বপাশে প্রায় এক একর জমির উপর বাঁশ-বেত দিয়ে একটি কটেজের কাজ নির্মাণাধীন রয়েছে। অপূর্ব নকশার এ কটেজটিতে বেড়া হিসেবে বিভিন্ন ফুল গাছের চারা রোপন করা হয়েছে। বাঁশ, বেতের কারু কাজে গড়ে উঠার অপেক্ষায় নির্মাণাধীন কটেজটিতে প্রায় প্রতিদিন শতাধিক মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে ঘুরতে আসেন। 

ছবি: মাহফুজ নান্টু
ছবি: মাহফুজ নান্টু

আড়াইওড়া এলাকার যুবক হান্নান শখের বশে নির্মাণ করছেন কটেজটি। কটেজটির পাশে বিশাল চর। কটেজটির পাশে বসে যেন চরের নির্মল সবুজ ও নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় সে জন্য বাশ দিয়ে তৈরী করা হয়েছে বেঞ্চ। রেল ব্রিজের নীচে বড় বড় পাথর জমে নদীর গতিপথে সামান্য বাধা হয়ে ঘূর্নিপাক তৈরী হয়ে অপূর্ব সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে। বিকেল হলেই নদীর পানির স্রোতের ঘূর্নিপার্ক- ছোট বড় ঢেউয়ের সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে সব বয়সী মানুষদের ভীড় বেড়ে লেগে থাকে। অনেকেই নদীর পানিতে আধো ডুবে থাকা পাথরগুলোতে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সুমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্যের স্বাদ নেয়। মুঠোফোনের ক্যামেরায় বন্দি করে নিজের ও পরিবারের ছবি। এছাড়াও বিকেল হলেই ব্যাটারি ও প্যাডেল চালিত রিক্সা, মোটরবাইকে চড়ে দর্শনার্থীরা ভীড় জমায় নদীর দু’তীরে। 
কুমিল্লা মূল শহরের পাশ ঘেষে প্রবাহিত হওয়ার কারণে গোমতীর তীরে নগরজীবনের ব্যস্ততায়  ক্লান্ত শরীর ও মনকে সতেজ করতে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে বাড়াতে যাওয়া দর্শনার্থীর সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলছে। দর্শনার্থীদের তালিকায় শহর-গ্রামের উচ্ছল তরুণদের দলবদ্ধ হয়ে  ঘুরতে দেখা যায় গোমতীর তীরে।

বিশেষ করে ছুটির দিনে বুড়িচং উপজেলার আলেখারচর এলাকায় গোমতী নদীর উপর ব্রিজ ও তার আশ-পাশের এলাকায় ভীড় বাড়ে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, ভিক্টোরিয়া কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ভীড় জমায় গোমতী নদীর আলেখারচরের অংশটিতে। ব্রিজের উত্তর পার্শ্বে ব্যক্তি মালিকানায় গড়ে উঠা কফিসপে শেষ বিকেলে শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত আড্ডা জমে উঠে। নদীর পাড়ের গ্রাম  শিমাইলখাড়ার মো.শাহজাহান কফি সপটির মালিক। 

তিনি জানান, বর্তমান তরুণ-তরুণীদের রুচি ও অভ্যাসের ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। আধুনিক ও রুচিশীলভাবে কটেজে পরিবেশন করি তরুণ-তরুণীরদের পছন্দের খাবার। স্বল্পমূল্য স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের পাশাপাশি গোমতী নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করার চেষ্টা করেছি। দোকান বেশ ভালো চলছে বলে মো.শাহজাহানের মুখে তৃপ্তির হাসি লক্ষ্য করা যায়।

সম্প্রতি দর্শনার্থীদের ভীড় বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয়রা ছোট ছোট কফি সপ গড়ে তোলার প্রয়াস চালাচ্ছেন। ইতিমধ্যে নদীর দু’পাড়ে বেশ কিছু নতুন কফি সপ গড়ে উঠেছে । শেষ বিকেলে ওইসব কফি সপগুলোতে কফি, ফুচকা, বাদাম-বুট, চিপস নিয়ে ব্যস্ত থাকে তরুণ-তরুণীরা। 

তথ্য প্রযুক্তির কল্যানে পুরো পৃথিবীর মানুষের মধ্যে ঐতিহাসিক স্থান ও পর্যটন কেন্দ্র সর্ম্পকে প্রতিনিয়ত বিনিময় হচ্ছে তথ্য-উপাত্ত। বিশ্বায়নের এ যুগে দেশ ও দেশের বাইরের প্রকৃতি প্রেমীদের  নজর পড়ছে কুমিল্লার গোমতী নদীর সৌন্দর্যের উপর। গোমতী নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করার ইচ্ছে থাকলেও পর্যটন কেন্দ্রের মত আবাসিক স্থাপনা, পর্যাপ্ত যানবাহনের অভাবে দর্শনার্থীদের অনাগ্রহে পরিণত হচ্ছে পর্যটন শিল্প হিসেবে গড়ে উঠার  অপার সম্ভাবনার গোমতী নদী।

বিষয়টি নিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী আসিফ বলেন, আমি প্রায় বিকেলে বন্ধুদের সাথে ঘুরতে আসি গোমতীর তীরে। খুব ভাল লাগে। পৃথিবীর নানান দেশ শুধু পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটিয়ে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। অথচ আমাদের পর্যাপ্ত রির্সোস থাকা সত্বেও শুধু ব্যবহার না জানার কারনে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে সম্ভাবনার গোমতী নদী অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।  

শুক্রবার সরকারি ছুটির দিন থাকায় নগরীর হাউজিং স্টেটের বাসিন্দা মামুনুর রশিদ পরিবার পরিজন নিয়ে গোমতী পাড়ে বেড়াতে আসেন। একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা মামুনুর রশীদ  জানান, আমার বাড়ি কুমিল্লায়। আমি মনে করি টাকা খরচ করে দূরের সৌন্দর্য উপভোগ করার চেয়ে আমাদের গোমতী নদীর সৌন্দর্য ঢের ভালো। নিরেট সতেজ সবুজের এক অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বলয়ে গড়ে উঠা গোমতী নদীর সৌন্দর্য সত্যিই মনোমুগ্ধকর। তবে কিছুটা আপসোস নিয়ে মামুনুর রশিদ বলেন, পর্যাপ্ত যানবাহনের ব্যবস্থা থাকলে আরো অনেক মানুষ দেখতে পারতো গোমতীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। বিশ্বায়নের এ যুগে গোমতী নদীর সৌন্দর্য দেখার ব্যবস্থা করতে পারলে আমাদের জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি আরো বাড়ানো যেত। গোমতী নদীকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করার সঠিক সময় এখন বলে জানান তিনি।